যন্ত্রটি বসানোর পর পাখিটি ৩১ দিনে ৩ হাজার ৭৩২ কিলোমিটার ভ্রমণ করে ওই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর টাঙ্গুয়ার হাওরে এসে পৌঁছায়। আরাঙ্গা জোড় বেঁধে বাংলাদেশের তাহিরপুর উপজেলায় শ্রীপুর গ্রামে বসবাস শুরু করে। বাসাও বানায় একটি শিমুলগাছে। কিন্তু ওই বছর আরাঙ্গা সফলভাবে বাচ্চা দিতে পারেনি। এরপর পাখিটি ২০২১ সালের ৬ এপ্রিল হিমালয় পাড়ি দিয়ে ৮ দিনে উত্তর চীনের হেইহেই নদীর পাদদেশ হয়ে বুনটসাগান লেকে ফিরে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, আরাঙ্গা বছরের ২০১ দিন কাটিয়েছে বাংলাদেশে আর ১২৫ দিন কাটিয়েছে মঙ্গোলিয়া, চীন আর তিব্বতের বিভিন্ন লেকে। বাকি ৩৯ দিন সে পরিযায়ন করেছে। এক বছরে সে প্রায় ৯ হাজার মাইল ভ্রমণ করেছে। ২০২০-২১ সালে প্রজনন মৌসুমে আরাঙ্গার বাচ্চা না পেলেও সেটির পুরো পরিযায়ন রহস্য বের করতে সক্ষম হই আমরা। অপেক্ষায় থাকি পরের মৌসুমের জন্য।

আরাঙ্গা মঙ্গোলিয়ার বুনটসাগান লেক থেকে ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট আবার বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ২৫ সেপ্টেম্বর ফিরে আসে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার জোতিনদ্রাপুর গ্রামে। বাসা তৈরি করে একটি ছোট্ট বরুনগাছে। ওই এলাকার মাস্টারমশাই প্রাণনাথ চৌধুরীসহ আমরা এলাকাবাসীকে নিয়ে সভা করি। আরাঙ্গা পরিবারকে কেউ বিরক্ত করবেন না বলে গ্রামের সবাই সহযোগিতার হাত বাড়ান। এরপর থেকে প্রতিদিনই সেটির জীবনচক্রের ওপর নজর রাখি।

default-image

আরাঙ্গা এবং তার সঙ্গী বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তারা ডিমে তা দেওয়া শেষে দুটি বাচ্চা ফোটায়। আমাদের প্রায় দুই বছর অপেক্ষার অবসান হয়। আরাঙ্গা পরিবারের প্রথম বাচ্চা এগুলো। আরাঙ্গাকে দেখেও বেশ সুখী মনে হলো। আমাদের প্রার্থনা ছিল, এই বাচ্চাগুলো যেন বড় হয়ে ফিরে যায় মঙ্গোলিয়ায়।

ঝড়ের খবরে ১১ এপ্রিল খুব ভোরে জোতিনদ্রাপুরে পৌঁছালাম। বরুনগাছের দিকে তাকিয়ে খুব কষ্ট পেলাম। আরাঙ্গার বাসার একটি ডালও অবশিষ্ট নেই। পাশের একটি ঝোপের মধ্যে পাখিটির আহত একটি বাচ্চা খুঁজে পেলাম। অন্য বাচ্চাটি পেলাম মৃত অবস্থায়। মনটা ভীষণ খারাপ হলো। একটি অস্থায়ী উদ্ধারকেন্দ্র গঠন করে চলল তার সেবা–শুশ্রূষা। আরাঙ্গার স্যাটেলাইট যন্ত্রের সিগন্যাল ধরে পরের দিন একটি ধানখেত থেকে পাখিটি উদ্ধার করলাম। একেবারেই মৃতপ্রায় একটি আরাঙ্গা আমরা হাতে পেলাম।

উদ্ধারকেন্দ্রে আরাঙ্গা ও সেটির বাচ্চাকে রাখা হলো। নিয়মিত চিকিৎসা ও খাবার দেওয়া হলো। দেখে মনে হলো, পাখি দুটি সুস্থ হয়ে উঠছে। আরাঙ্গা বাচ্চাটিকে মাছ মুখে তুলে খাওয়াল। আমরা বরুনগাছে আরাঙ্গার জন্য একটি কৃত্রিম বাসা বানালাম। আরাঙ্গাটি ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও করলাম। ১৫ এপ্রিল সকাল ১০টায় সহকর্মী সমীর ফোনে খবর দিল আরাঙ্গাটি মারা গেছে। থেমে গেল আরাঙ্গার ৬০৪ দিনের যাত্রা। গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এল। একটি পাখির প্রতি মানুষের এত ভালোবাসা আগে কখনো দেখিনি।

আরাঙ্গার মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বন অধিদপ্তরের সহায়তায় তাহিরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে আনা হলো। মৃত্যুর কারণ হিসেবে জানানো হলো, ঝড়ে আঘাত। এরপর আরাঙ্গার বাচ্চাকে বাঁচানোর মিশন শুরু হলো। বাচ্চাটি উদ্ধারকেন্দ্রে সুস্থ হয়ে গেল। তবে ২৫ এপ্রিল আবারও এক প্রচণ্ড ঝড়ে আমাদের অস্থায়ী উদ্ধারকেন্দ্রটি ভেঙে গেল। সেখান থেকে উড়ে গেল বাচ্চাটি। এখন বাচ্চাটি হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরাঙ্গার বংশধরের এই প্রতিনিধি পরের বছর আবার জোতিনদ্রাপুরে ফিরে আসবে এই আশা সবার।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন