default-image

বর্ষা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু বর্ষার রেখে যাওয়া বিপদ থেকে এখনো মুক্ত হননি দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের ছয়টি উপজেলা। সেখানকার প্রায় ১০ লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দী। জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের পানিতে তাদের বসতভিটা, ফসলের জমি—সব মিলিয়ে জীবনটাই যেন ভাসছে। প্রশ্ন হচ্ছে, উপকূলের ওই জনপদে মানুষ টিকতে পারবে, নাকি সর্বস্বান্ত হয়ে এলাকা ছাড়বে?

স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান, সরকারি সংস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ, দেশের শীর্ষস্থানীয় পানি বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বলছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানের পথ হিসেবে টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং নদীতে অবাধ জোয়ার–ভাটার ব্যবস্থাকে (টিআরএম) কার্যকর পন্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সরকার সে পথে হাঁটছে না, তারা জোর দিচ্ছে নদী খননের দিকে।

যশোরের অভয়নগরের ডুমুরতলা গ্রামের শিবপদ বিশ্বাস। তাঁর পৈতৃক বাড়ি আর ফসলের জমি পানির নিচে। তিনি বলছিলেন, টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) করায় ২০১২ সাল পর্যন্ত এখানে পানি ওঠেনি। পাশে থাকা মুক্তেশ্বরী নদীও গভীর হয়েছিল, পানি নেমে গিয়ে এলাকায় যাতায়াত, কৃষিকাজ ও ব্যবসা–বাণিজ্য বেড়েছিল। কিন্তু পাঁচ–ছয় বছর ধরে টিআরএম বন্ধ থাকায় এই এলাকার প্রায় ১০০ গ্রাম থেকে আর পানি নামছে না। তাঁর অভিযোগ, ‘সরকার শত শত কোটি টাকা শুধু নদীর মইধ্যে ঢালতেছে (নদী খনন), কিন্তু তাতে কোনো উপকার হচ্ছে না, উল্টো নদী আরও মরতেছে।’

খুলনার কয়রার বাঁধ ভেঙেছে সেই এপ্রিলে, কিন্তু এখনো তা মেরামত হয়নি। আর জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য টিআরএম করতে হবে, এটাই সবচেয়ে সফল উপায়। সেটা তো সবাই বলে, কিন্তু সরকারের জলাবদ্ধতা দূর করার নতুন প্রকল্পে টিআরএম নেই। ভবদহ জলাবদ্ধতা দূর করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যে ৫৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে, তার বড় অংশজুড়ে রয়েছে শুধু নদী খনন আর নানা অবকাঠামো নির্মাণ। সাতক্ষীরা সদর, আশাশুনি আর তালার জন্য নেওয়া প্রকল্পেও টিআরএম নেই। যদিও সেখানে এর বাস্তবায়ন কতটা হবে, তা নিয়ে স্থানীয় ব্যক্তিদের সন্দেহ আছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, টিআরএম ছাড়া দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর হবে না। একসময় ওই এলাকায় যে অষ্টমাসি বাঁধের মাধ্যমে পলি ও পানি ব্যবস্থাপনা করা হতো, তার বৈজ্ঞানিক ও পরিকল্পিত রূপ হচ্ছে এই টিআরএম। এটি না করে শুধু নদী খননের কাজ করলে খনন কোম্পানি ও ঠিকাদারদের লাভ হবে, কিন্তু এই জনপদের মানুষ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হবে না।

বিজ্ঞাপন

জলাবদ্ধতা কেন

দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক ও ভূতাত্তিক গঠনকে আমলে না নিয়ে সেখানকার নদীগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণ করার ফলেই মূলত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি। ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের জন্য, অর্থাৎ জোয়ার–ভাটার জমিতে বাঁধ দিয়ে সেখানে ধান ফলাতে গিয়ে তৈরি করা হয় স্থায়ী বাঁধ। কিন্তু এখানকার নদ–নদীগুলো মূলত জোয়ার–ভাটা দ্বারা প্রভাবিত; অর্থাৎ সমুদ্রের মতো জোয়ারে পানি বাড়ে, ভাটায় কমে। স্থায়ী বাঁধ দেওয়ায় ওই জোয়ার–ভাটা থেকে নদীগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে পানির সঙ্গে আসা পলি মূল ভূখণ্ডে বা বিলের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। সেগুলো জমা হতে থাকে নদীর বুকে।

অন্যদিকে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের ভূমি দেশের অন্য এলাকাগুলো থেকে এমতেই নতুন। ফলে সেটি দ্রুত সংকুচিত হয়ে নিচের দিকে চলে যাচ্ছে। আর নদীর বুকে পলি জমা হওয়ায় এটি উঁচু হয়ে উঠছে। যে কারণে যশোরের মনিরামপুর, অভয়নগর, চৌগাছা, ঝিকরগাছা, কেশবপুর; খুলনার ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, কয়রা এবং সাতক্ষীরা সদর, তালা, আশাশুনি ও শ্যামনগরের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ পর্যায়ক্রমে জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

টিআরএম কীভাবে জলাবদ্ধতা দূর করে

আশির দশকে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করতে স্থানীয় ব্যক্তিরা বিল ডাকাতিয়ায় বেড়িবাঁধ কেটে দেয়। ওই বাঁধ কেটে দেওয়ার পর জমে থাকা পানি বেরিয়ে যায়। প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর আয়তনের দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ওই বিলের পাশের কৃষিজমি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়। একই সঙ্গে সোলমারি, হামকুড়া ও হরি নদীর নাব্যতা বেড়ে যায়। জমে থাকা পানি নামার সময় প্রাকৃতিক স্রোতের শক্তিতেই এর বুকে জমে থাকা পলি সরে যায়।

বিল ডাকাতিয়ার ওই অভিজ্ঞতা থেকে দেশ–বিদেশের গবেষকেরা জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য কার্যকর উপায় হিসেবে বাঁধের নির্দিষ্ট কিছু এলাকা কেটে দিয়ে পানি ও পলি ঢুকতে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে বিলের মধ্যে পলি পড়ে জমি উঁচু হয়, জলাবদ্ধতা দূর হয় এবং নদীর গভীরতা বাড়তে থাকে। একই উপায়ে যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা, মনিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগরের জলাবদ্ধতা দূর করা হয়।

২০০৭ সাল থেকে যশোর ও সাতক্ষীরার কপোতাক্ষ অববাহিকাতেও জলাবদ্ধতা শুরু হয়। সেখানেও বিল ভায়না, পাখিমারা বিল, বিল কেদারিয়াসহ বেশ কয়েকটি স্থানে টিআরএম শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এতে সফলতাও পাওয়া যায়। সাতক্ষীরার তালা ও আশাশুনি এবং খুলনার পাইকগাছার বড় অংশ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়।

দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি সংস্থা উত্তরণের পরিচালক শহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে টিআরএম বহুভাবে পরীক্ষিত। এর আগে যতবারই টিআরএম বন্ধ করা হয়েছে, জলাবদ্ধতা ততবারই বেড়েছে।

পানিসম্পদবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) হিসাবে পুরো দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে এ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ হেক্টর জমি টিআরএমের মাধ্যমে জলাবদ্ধতামুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে পলি পড়ে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি দুই থেকে তিন ফুট উঁচু হয়েছে। ওই অঞ্চলের মুক্তেশ্বরী, ভদ্রা, মরিচ্ছাপি, কপোতাক্ষ, ভৈরবসহ অন্তত আটটি নদীর বিভিন্ন অংশে গভীরতা বেড়েছে।

এ বছর জলাবদ্ধতা কেন বাড়ল

আগের দুই বছরের তুলনায় এ বছর (২০২০) দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা তুলনামূলক বেশি। অন্য বছরগুলোতে জুনে মনিরামপুর ও অভয়নগরের ৪০–৫০টি গ্রামে জলাবদ্ধ থাকে। এ বছর তা বেড়ে ১৫০টি গ্রাম হয়েছে। শুধু তা–ই নয়, সাতক্ষীরা সদর, আশাশুনি ও খুলনার পাইকগাছার বড় অংশজুড়ে গত চার মাস জলাবদ্ধতা ছিল। সম্প্রতি সাতক্ষীরার বেশির ভাগ এলাকা থেকে পানি নেমে গেলেও তা আগামী বছরের এপ্রিল–মে মাসের দিকে তা আবার শুরু হতে পারে বলে স্থানীয় ব্যক্তিদের আশঙ্কা।

স্থানীয় পানি বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি সংস্থাগুলো টিআরএম চালু না থাকাকে দায়ী করছেন। তবে একই সঙ্গে এ বছর স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টি বেশি হওয়া এবং ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করাকে দায়ী করা হয়েছে। টিআরএম চালু না থাকায় পানি যেমন একদিকে নামতে পারেনি, আবার বৃষ্টি বেশি হওয়ায় বেশি এলাকাজুড়ে তা জমে ছিল।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছর সারা দেশে ৪৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। আর বরিশাল ও খুলনা বিভাগে বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে ২০০ শতাংশ বেশি। গত অক্টোবরেই বরিশালে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৩৯ ও খুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এই বৃষ্টির কারণেও এবার জলাবদ্ধতা বেশি হয়েছে।

এ ব্যাপারে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পুরো উপকূলীয় এলাকাকে সামগ্রিকভাবে রক্ষায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও টিআরএম—সবই করছি।’ কোথাও কোনো ঘাটতি হলে বা সমস্যা বাধলে তা শুধরে নিয়ে কাজ করা হবে বলে তিনি জানান।

default-image

পানি উন্নয়ন বোর্ড কী করছে

জলাবদ্ধতা দূর করতে ২০২০ সাল থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড মোট দুটি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। একটি সাতক্ষীরার জন্য ৫৬৫ কোটি টাকার
এবং যশোরের ভবদহ এলাকার জন্য ৪৩০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প নিয়েছে। এ ছাড়া ৬৬৫ কোটি টাকার অন্য একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এর মধ্যে কোনো প্রকল্পে টিআরএমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। কিন্তু অন্য দুটিতে টিআরএম নেই।

ওই তিন প্রকল্পের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মূলত নদী–খাল খনন, বাঁধ নির্মাণ, জলকপাট নির্মাণ ও মেরামতেই বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। বিশেষ করে নদী খননে প্রকল্পের সবচেয়ে বেশি অর্থের বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কী করা উচিত

সরকারের বদ্বীপ মহাপরিকল্পনাতেও বলা হয়েছে, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে টিআরএম। এটি বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলে জলাবদ্ধতা দূর হয়ে বিনিয়োগ বাড়বে। বর্তমানে সেখানে বছরে একটি ফসল হয়, পানি সরে গেলে কমপক্ষে দুটি ফসল করা যাবে।

বৈরী আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার কারণে সেখানে তেমন কোনো বিনিয়োগও নেই। বাগেরহাটের দিকে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু শিল্পকারখানা গড়ে উঠলেও যশোর–সাতক্ষীরা প্রায় শিল্পশূন্য হয়ে পড়েছে। অথচ জলাবদ্ধতা না থাকায় যশোরের নোয়াপাড়া রীতিমতো শিল্প ও বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

বেসরকারি সংস্থা উত্তরণ ও পানি কমিটি থেকে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি নিয়ে গত অক্টোবরে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংস প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সেখানে জলাবদ্ধতা দূর করতে বিল কাপালিয়ায় টিআরএম বাস্তবায়ন করা, আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করা হলে জলাবদ্ধতা দূর হবে। এ ছাড়া টেকা ও মুক্তেশ্বরী নদীর সঙ্গে হরি নদীর অবাধ সংযোগ স্থাপনের দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পোল্ডারের ভেতরের আবদ্ধ নদীগুলো উন্মুক্ত করে ভৈরব, কপোতাক্ষ ও বিল ডাকাতিয়ার সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

জানতে চাইলে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক অনিল বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলকে বিরান হওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে টেকসই বাঁধ ও টিআরএম বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা না করে বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, নদী খননের নামে অর্থ লুটপাটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জনগণের দাবি মেনে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ না করলে এই এলাকা জলাবদ্ধতামুক্ত এবং বিরান হওয়া থেকে রক্ষা পাবে না।

মন্তব্য পড়ুন 0