বিজ্ঞাপন

ঘটনাটি গেল বছরের ১৪ জুলাইয়ের। ঘটনাস্থল সাতক্ষীরার তালা উপজেলার আগোলঝাড়া গ্রাম। রাশেদ জানালেন, ওই গ্রামের প্রান্তে আছে পাল আমলের বিখ্যাত একটি দিঘি ‘বিশকরম দিঘি’। ওই দিঘির পাড়গুলোর গাছ-ডাল ও জলে পোঁতা বাঁশ-খুঁটিতে দু-চার জোড়া এই পাখি বারো মাসই দেখা যায়। দিঘির খাড়া পাড়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বাসাও করে। ও রকমই কোনো সুড়ঙ্গে জন্ম এই ছানার। সুড়ঙ্গ-বাসা থেকে বেরিয়ে হয়তোবা অন্যান্য ভাইবোনের সঙ্গেই ছিল, খাবারও খাচ্ছিল মা-বাবার মুখ থেকে, তখন যেকোনো কারণেই হোক ছানাটি দলছুট হয়ে পথ হারিয়েছে। হতে পারে দুষ্টু ছেলেমেয়েরা ছানাগুলোকে ধরতে চেয়েছিল। বাজ-চিলে ছোঁ মেরেছিল কোনো একটিকে তুলে নেওয়ার জন্য। যেকোনো কারণই হতে পারে। রাশেদ ওটিকে সাত-আট দিন বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিয়মিত কুঁচো চিংড়ি-পুঁটি-কেঁচো খাওয়াতে লাগলেন। তারপর উড়িয়ে দেবেন।

সদ্য উড়তে শেখা আনাড়ি ছানাটি ছিল ‘পাকড়া মাছরাঙা’র। বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর এই মাছরাঙা সাদা মাছরাঙা, ছিটে মাছরাঙা ও ফোঁটা মাছরাঙা নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Pied Kingfisher. বৈজ্ঞানিক নাম Ceryle rudis. দৈর্ঘ্য ৩১ সেন্টিমিটার। ওজন ৬৮-১১০ গ্রাম। সাদা-কালো রঙের এই মাছরাঙারা জোড়ায় জোড়ায় চলে। মূল চারণক্ষেত্র বিল-ঝিল, নদী তীর-লেক-হাওর-পুকুর-জলাভূমি। মূল খাদ্য মাছ। তবে সুযোগ পেলে কেঁচো গিলে নুডলসের কায়দায়। ব্যাঙাচি-পোকামাকড়ও খায়। প্রায়ই এরা দুটিতে মিলে মুখোমুখি বা পাশাপাশি যখন শূন্যে স্থির থেকে দ্রুত ডানা নাড়ায়, তখন টলটলে জলে ওদের ছায়া অপরূপ নান্দনিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।

তীক্ষ্ণèদৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন এই পাখিরা নদী-খাল-দিঘি-লেকের খাড়া পাড়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বাসা করে। সুড়ঙ্গ কমপক্ষে দুই ফুট গভীর হয়, তারপরও আরও ফুটখানেক ডানে বা বাঁয়ে বাঁকা পথে এগিয়ে ডিমের চেম্বার বানায়। ডিম পাড়ে পাঁচ-সাতটি। ডিম ফোটে ১৯-২২ দিনে। মা-বাবাসহ পাঁচ-সাতটি ছানা যখন এক জায়গায় পাশাপাশি বসে থাকে, তখন দেখলে চোখ যায় জুড়িয়ে, মন ভরে যায় অনাবিল আনন্দে। এদের সুরেলা-ধাতব ‘চিরি রিক, চিরি-রিক’ ডাক শুনেও মনপ্রাণ জুড়ায়, তেমনি মাথার দর্শনীয় ঝুঁটি ও সাদাটে পিঠের ওপরের অসংখ্য সাদা-কালো ছিট-ছোপের কম্বিনেশন দেখলেও চোখ যায় জুড়িয়ে। জলে ডাইভ মারার কৌশলটাও চোখ চেয়ে দেখার মতো।

রাশেদের সেই ছানাটি এখন বড় হয়ে গেছে হয়তো, হয়তোবা সেই বিশকরম দিঘিতেই থাকে, রাশেদ কি আর চিনতে পারবে তাকে! ছেড়ে দেওয়ার আগে যদি পাখিটির শরীরে মেহেদির রং লাগিয়ে দিতেন আচ্ছামতো!

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন