default-image

পাখিটিকে প্রথম দেখেছিলাম ১৯৬৩ সালে। ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন। পৌষের ভোরবেলায় বাবার সঙ্গে ‘উত্তরের হাওরে’ গিয়েছিলাম বুনো হাঁস শিকারে। হাওরটি তখন ছিল শীতের পাখিদের স্বর্গরাজ্য। দুর্গম-দুর্ভেদ্য হাওরে ছিল হিজল-করচ ও বরুণের সারি। দেশি পাখিদেরও অভয়াশ্রম ছিল। বিভিন্ন প্রজাতির লাখ লাখ বুনো হাঁসসহ শীতে কত প্রজাতির যে পরিযায়ী পাখি দেখা যেত!

নৌকায় চেপে মোট চারজন একটি হোগলাবন পাড়ি দিয়ে হিজলের ছায়ে থামলাম। পাশেই নলখাগড়ার বন। হাজার হাজার পাখি চরছে চারদিকে। কোলাহল-কলরবে কান ঝালাপালা। নিকট পাল্লায় বাবা বন্দুক তাক করলেন এক লাইনে থাকা চারটি ধূসর রাজহাঁস টার্গেট করে। গুলি করতেই চারটি রাজহাঁস তো বটেই, লাইনে পড়ে যাওয়ায় আরও কিছু পাখি নিহত-আহত হলো। আর গুলির শব্দে জলে বসা পাখিরা সব উড়াল দিল। মনে হলো প্রচণ্ড ঝড় উঠেছে, ভীত-উড়ন্ত পাখিদের ডাকাডাকিতেও কান ঝালাপালা। পাখিরা ঢেকে দিয়েছে আকাশ, আমাদের দৃষ্টিসীমাজুড়ে শুধু পাখি আর পাখি। টের পাচ্ছি, ‘পাখিবৃষ্টিতে’ ভিজে যাচ্ছি আমরা, উড়ন্ত-ঘুরন্ত পাখিদের ভেজা শরীর-ডানা থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি জল ঝরছে। হায় রে পাখির গন্ধমেশানো সেই শীতল বৃষ্টি! বাবা কিন্তু উড়ন্ত ঝাঁকে আরও চারবার গুলি করলেন। টুপটাপ ঝরল আরও কিছু পাখি।

পরিস্থিতি একটু শান্ত হলেই নৌকা চলল এবার পাখি কুড়াতে। গুলিতে আহত একটি বালিহাঁস দারুণ তড়পাচ্ছে। হঠাৎ দেখলাম একটি বাজপাখি ওপর থেকে বোমারু বিমানের মতো নেমে আসছে। আন্দাজ, আমার থেকে সাত ফুট দূরের বালিহাঁসটি দুই নখরে গাঁথার আগে বিমানের চাকা নামানোর কৌশলে দুখানা পা দিল নামিয়ে, আমাকে থোড়াই কেয়ার করে, দু-পাঁচটি প্রচণ্ড ধমক-ধামক মেরে হয় আমাকে, নাহয় শিকারটিকে ভয় দেখাল। আমি তো থ। বাবা বললেন, মগ দস্যু এই বাজেরা। ভয়ডর-দয়ামায়া নেই।

বিজ্ঞাপন

৫৮ বছর আগের সেই ভয়ংকর সুন্দর দৃশ্যটি আজও আমার মনে দাগ কেটে আছে। খুলনা-বাগেরহাট জোড়া সেই উত্তরের হাওরে এখন চিংড়িঘেরের রাজত্ব। হাইওয়ে বয়ে গেছে হাওরের বুক চিরে। তবু আজও খোলা জায়গাগুলোতে শীতে কিছু পাখি আসে। ১৯৬৩-২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি শীতে ওই হাওরে যাতায়াত আমার নিয়মিত চালু আছে। গত ১৩ জানুয়ারিতে ‘বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ ক্লাবের’ পাঁচ সদস্যসহ হাওরের ‘বিল কেন্দুয়া’ ও ‘বিল কোদালিয়ায়’ ঘুরি দিনভর। শীতের পরিযায়ী এই দুঃসাহসী বাজটি ঘেরমালিকদের কাছে ‘দারোগা বাজ’ বা ‘দারোগা ইগল’ নামে পরিচিত। অন্যান্য মাছখেকো বাজ-ইগলদের এরা দুচোখে দেখতে পারে না। ধাওয়া করে তাড়িয়ে দেয়। তাই বলে এরা যে কখনো-সখনো দু-একটা মাছ চেখে দেখে না, তা কিন্তু নয়!

অসমসাহসী ও দুর্দান্ত ডাইভার ও কুশলী শিকারি এই পাখিরা দস্যু বাজ, ঝোড়ো বাজ, মগ বাজ, দারোগা ইগল, দস্যুরাজ ও বড় চিত্রা ইগল নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম গ্রেটার স্পটেড ইগল। বৈজ্ঞানিক নাম Clanga clanga। দৈর্ঘ্য ৬৭ সেমি। মূল খাদ্য পাখি। ব্যাঙ-কাঁকড়া, মাছও খায়।

জলচর পাখির ঝাঁককে এরা পানি ছুঁই ছুঁই করে উড়ে কৌশলে ধাওয়া করে, ধমক-ধামক মারে আর নানান রকম ভীতিকর অঙ্গভঙ্গি করে। পাখিরা পালাতে চায়। ভেড়া-ছাগলের পালে নেকড়ের ধাওয়া খাওয়ার মতো। ভীত পাখিরা ডুব দেয়, পালায়। পিলে চমকানো ডাকে ভড়কে গিয়ে দু-পাঁচটি পাখি দেয় উড়াল (উড়লে শিকারির সুবিধা বেশি, ধেয়ে এসে নখরে গাঁথতে কষ্ট তেমন করতে হয় না), অমনি তিরবেগে এসে বাছাই শিকারটিকে নখরে গাঁথে। বন্দুকের গুলিতে আহত শিকারকেও এরা শিকারির নাকের ডগা থেকে তুলে নেয় অবলীলায়। ৬০ ডিগ্রি থেকে ৯০ ডিগ্রি কোণে যখন ওপর থেকে নিচে ঝড়ের গতিতে ধায় এই পাখিরা, তখন দারুণ এক শিল্পিত নান্দনিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়। ডুবুরি-কালিমছানা-কোড়াছানাসহ অন্যান্য পাখিই এদের প্রধান টার্গেট। শ্যেন দৃষ্টি, শিকার বাছাইয়ে মহা ওস্তাদ, একনজরে কালচে বাদামি রঙের ঝোড়ো বাজটিকে গেল ১৩ জানুয়ারি আমরা দেখতে পাই বটে, তবে দুর্দান্ত ডাইভ দেখতে পাইনি।

বিজ্ঞাপন
পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন