বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই সমুদয় জীবসমষ্টি পুরো সুন্দরবনে বা এর কোনো অংশে যথাযথ সংখ্যায় বা পরিমাণে থাকলে তার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে সেখানে কতগুলো বাঘ বেঁচে থাকতে পারবে। কোনো এলাকায় নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রাণী থাকাকে বলে ওই ‘বহনক্ষমতা’ বা ‘ক্যারিইং ক্যাপাসিটি’। কোনো পরিবেশের বহনক্ষমতা হলো খাদ্য, পানি, বাসস্থান ও উপলব্ধ অন্যান্য সংস্থানের মাধ্যমে সর্বাধিক সংখ্যায় কোনো জৈবিক প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা। বহনক্ষমতাকে পরিবেশের সর্বোচ্চ সংখ্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা প্রাণিসংখ্যার বাস্তুশাস্ত্রে প্রাণিসংখ্যার ভারসাম্যের সঙ্গে মিলে যায়। প্রাণিসংখ্যার মোট মৃত্যুসংখ্যা তখন মোট জন্ম নেওয়া প্রাণীর সঙ্গে মিলে যায়। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয় অভিবাসন এবং এলাকা ত্যাগের সংখ্যার সাম্য।

সুন্দরবনের বাঘ

আমাদের সুন্দরবনের মোট আয়তন ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। এর ৪ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার স্থল, ১ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটার পানি বলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। সরকারি হিসাবে বর্তমানে এ বনে বাঘের সংখ্যা ১১৪। অর্থাৎ প্রতি ৩৭ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটারে একটি করে বাঘের বাস। এর মধ্যে বাঘ-বাঘিনী-শাবকের সঠিক অনুপাত বের করা বেশ কঠিন।

তবে বিজ্ঞানী বারলো ও তাঁর সঙ্গীরা ২০১১ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধে বলেছেন, নেপালের চিতোয়ান বনে অন্য বিজ্ঞানীরা একটি বাঘিনীর চারণভূমি বা হোম রেঞ্জ দেখিয়েছেন ১৬ থেকে ২০ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার। আর ভারতের পান্না বাঘ রিজার্ভ এবং নাগরহোলে জাতীয় উদ্যানে বাঘিনীর চারণভূমি দেখানো হয়েছে যথাক্রমে ২৭ ও ১৬ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার। বিজ্ঞানীরা রেডিও টেলিমেট্রি পদ্ধতিতে এটা বের করেছেন। বাঘ বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম বারলো ও তাঁর সঙ্গীরা দেখিয়েছেন, সুন্দরবনে বাঘিনীর চারণভূমি গড়ে ১২ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার। এসব দেশের সমস্ত ফলাফলের গড় করলে একটি বাঘিনীর চারণভূমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার।

ওপরের যেকোনো হিসাবেই সুন্দরবনের বাঘিনীর চারণভূমির পরিমাণ সবচেয়ে কম, তিন দেশের গড়ের চেয়ে ৬ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার করে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে গড়ে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে সবচেয়ে বেশি বাঘ বসবাস করছে। অর্থাৎ বাঘের ঘনত্ব এখানে অতিরিক্ত মাত্রায় বেশি।

আমার জানামতে, ভারত, নেপাল বা মিয়ানমার থেকে সুদূর ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ পর্যন্ত গত ৫০ বছরেও বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব হয়নি। সেটা করতে পারলে বাঘের সংখ্যা এখন দাঁড়াত ৮ হাজারে, কিন্তু এ সংখ্যা এখন কেবলই ৩ হাজার ৯০০ (worldwildlife.org/species/tiger)।

কোনো দেশে কখনো বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করা গেলেও সে সংখ্যাটিকে এক দশকের মধ্যেও ধরে রাখা যায়নি। এর প্রধান কারণ, সেই সমুদয় জীবসমষ্টি বা বায়োমাস সীমাবদ্ধতা। গত প্রায় সোয়া শ বছরে ভারতে বাঘের সংখ্যা কীভাবে ওঠানামা করেছে, তা থেকে এটা স্পষ্ট যে কোনো দেশে বাঘের সংখ্যা কখনো স্থিতিস্থাপক অবস্থায় থাকতে পারে না। চাইলেই আমাদের সুন্দরবনে প্রতিবছর ২০০ বা ৩০০ বাঘকে বাঁচিয়ে রাখা একেবারে অসম্ভব।

ভারত, নেপাল বা ভুটানে বাঘের সংখ্যা মাঝেমধ্যে অনেক বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো দেশগুলো বাঘের বিচরণকারী বনভূমির পরিমাণ ১০ থেকে ২০ গুণ বৃদ্ধি করেছে, বাঘের চোরা শিকার বা অহেতুক মৃত্যু রোধ করেছে এবং মড়ক ঠেকিয়েছে। আরও লক্ষণীয়, সুন্দরবন বাদে ভারত, নেপাল বা ভুটানে কেবল একটি বনভূমিতেই দেশের সব বাঘ আটকে নেই, যেমনটা আছে সুন্দরবনে। ওই দেশগুলোর মতো সুন্দরবনে বনভূমি প্রসারিত করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, দুই দেশের ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার বনের বাইরের সর্বত্র মানুষের নিবিড় বসতি।

বন্য প্রাণিবিষয়ক নীতিমালা নেই

অবশ্য বৃহত্তর ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯৪০-৫০ দশকের আমাদের সেই শাল এবং মিশ্র চিরসবুজ বন বেঁচে থাকলে সেখানে বনজ সম্পদ এবং বাঘ, বনগরু, বুনো মোষ, সাম্বার, বনছাগল, শূকর, মায়াহরিণ, বানর, হনুমান ইত্যাদি প্রাণীর সংখ্যা টেকসই এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাড়ানো সম্ভব ছিল। এসব বনে এখন অস্থায়ীভাবে ডজনের নিচে বাঘ, চিতাবাঘ, বনগরু ও কয়েক শ হাতি বসবাস করে। সাম্বার, মায়াহরিণ, বনছাগল, শূকর, বানর ও হনুমানের সংখ্যা দারুণভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এর বড় একটা কারণ বাংলাদেশ সরকারের কখনো কোনো বন্য প্রাণিবিষয়ক নীতিমালা ছিল না, এখনো নেই। যে বন বিভাগের হাতে বন্য প্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব ন্যস্ত, তাদের অন্যতম কাজ হলো গাছ লাগিয়ে ও কেটে সরকারকে অর্থ জোগান দেওয়া অথবা বন–সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে লভ্যাংশ ভাগাভাগি করা। এ পর্যন্ত দেশে অন্তত অর্ধশত সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নানা সাংঘর্ষিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। অথচ স্বতন্ত্র ও সক্ষম একটি বন্য প্রাণী বিভাগ না থাকায় দেশে বিশ্বমানের কোনো বৈজ্ঞানিক বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে দেশের সংরক্ষিত বন বা বন্য প্রাণী এলাকায়ও বন্য প্রাণীর সংখ্যা বাড়ার বদলে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ২০২১ সালের একটি মাসেই আটটি হাতি, ডজনখানেক ডলফিন এবং কাছিমের অপমৃত্যুর খবর এসেছে। সরকারি চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে বৃহদাকার প্রাণীর অপমৃত্যুর খবর ধামচাপা দেওয়ার বিষয় বিশ্বব্যাপী সংবাদ হয়েছে।

বাংলাদেশে বন্য প্রাণীর ক্ষয়ের চিহ্ন ভয়াবহ। ১৯৪০-৫০–এর দশকে ঢাকার কাছের শালবন থেকে ভালুকা পর্যন্ত মধুপুরের গড় বা শালবন এলাকায় হাতি, বাঘ, চিতাবাঘ, বনগরু, সাম্বার, মায়াহরিণ, বানর, হনুমান, অজগর প্রভৃতি প্রাণী বসবাস করত। এখন ভারতের সঙ্গে সীমান্তে আটকে পড়া কয়েক ডজন হাতি ছাড়া অন্য কোনো বন্য প্রাণী নেই বললেই চলে। সারা বনে বানর ও হনুমানের সংখ্যা কয়েক শ হতে পারে। আদি শালবন কোথাও নেই। ১০ মিটারের চেয়ে উঁচু আর ১ মিটার ব্যাসের কোনো শালগাছের বন অন্তত আমজনতার দৃশ্যসীমার মধ্যে দেশের কোথাও নেই।

ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকা, যেমন ধানুয়া কামালপুর, তাওয়াকুচা, লাওচাপড়া, গজনি প্রভৃতি এলাকায় বনগরু কি বানর-হনুমানের দল ছেড়ে দিলে তারা নিজেদের খাবার না পেয়ে মানুষের বসতির দিকে ছুটবে। শুরু হবে মানুষে-বন্য প্রাণীতে অবিরাম সংঘাত।

১৯৮০–এর দশকের পর বাংলাদেশের পদ্মা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা নদীগুলোতে ঘড়িয়াল বা ঘটকুমিরের স্থায়ী বসবাস বলতে গেলে আর নেই। আজ পর্যন্ত দেশে কেউ এর প্রজননস্থল বের করতে পারেনি। রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের পদ্মা-যমুনা নদীতে কখনোসখনো এগুলোর বাচ্চা ধরা পড়ে। বোঝা যায়, এরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামের নদ–নদীর স্রোতের তোড়ে বাংলাদেশের নদীতে ঢুকে পড়েছে।

এসব ঘড়িয়াল আমাদের দেশের কোনো নদীতে ছাড়া হলে তারা প্রাকৃতিক খাবার পাবে, জেলেদের জালে আটকা পড়লে তাদের মেরে ফেলা হবে না অর্থাৎ যেসব জলাভূমি বা বনভূমি আমরা ধ্বংস করেছি, সেগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে না পারলে সেখানে কোনো বন্য প্রাণী প্রতিস্থাপিত করা সম্ভব নয়।

করণীয়

সুন্দরবনসহ সারা দেশে যে ধরনের বন আজ আছে সেখানে আজকের মতো করেও কিছু না কিছু প্রাণীও সেসব বনে আছে। যেমন ধরুন ১৯৭০–এর দশকের ২০০-৩০০ লালচে হনুমান বা ৫০০-৬০০ বানরের জায়গায় কেবল মধুপুরের বনে কয়েক ডজন করে হনুমান বা বানর বেঁচে আছে। এসব বন থেকে শেষ পর্যন্ত সব বানর-হনুমানই হারিয়ে যাবে কেবল কয়েকটি বাদে, যারা মানুষের আশপাশে বসবাস করতে পারবে। যেমন বানর আছে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া, চাঁদপুরের মতলব, বরিশালের উজিরপুর বা মাদারীপুরের চর মুগুরিয়া বাজার ও এর সংলগ্ন এলাকায়।

জনতুষ্টিমূলক চটজলদি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চাপের মুখে হুটহাট প্রাণীর সংখ্যা কখনোই বাড়ানো সম্ভব নয়। সরকারি গণনা সুন্দরবনে এখনো যে কয়টি বাঘ বেঁচে আছে বলে জানাচ্ছে, তার ১০ শতাংশ পরিমাণ কমবেশি বাঁচিয়ে রাখতে পারলেই সরকারের পরিকল্পনা কৃতকার্য হয়েছে বলে আমরা ধরে নেব।

সরকারের যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, তা হলো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নভাবনার মধ্যে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে সমন্বিত করা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে যেন আর বন ধ্বংস না হয়, পরিবেশদূষণের শিকার না হয়, বন্য প্রাণীর ক্রমাগত বিলুপ্তি না ঘটে। দেশের বন ও বন্য প্রাণীর সার্বিক বিপর্যয় রোধ করতে এবং বন্য প্রাণী সংরক্ষণে বিশ্ব–অনুসৃত ব্যবস্থা মেনে চলতে অবিলম্বে আমাদের একটি স্বনির্ভর বন্য প্রাণী বিভাগ গড়ে তোলা জরুরি।

রেজা খান, দুবাই সাফারির প্রধান বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন