বিজ্ঞাপন

পেরেগ্রিন নিয়ে প্রাণিজগতে মজার সব কাহিনি আছে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের গল্প। উত্তর আমেরিকায় ফসলের খেতে ব্যবহার শুরু হলো একধরনের কীটনাশক ডিডিটি। মূলত ফসলের পোকামাকড় দমন করাই ছিল লক্ষ্য। ডিডিটি ব্যবহারের ফলে ফসলের উৎপাদন বাড়তে থাকল। তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব অজানা ছিল। পাখিবিজ্ঞানীরা দেখলেন, এর প্রভাবে পেরেগ্রিন শাহিন নামের এক জাতের পাখি কমে যাচ্ছে। পেরেগ্রিনের প্রধান খাবার ছোট পাখি। শস্যখেতের পোকাখেকো পাখির ওপর ডিডিটির প্রভাব কম হলেও পাখিখেকো পেরেগ্রিনের ওপর তীব্র প্রভাব পড়ে। এর ফলে পাখির ডিমের আবরণ পাতলা হয়ে যায় এবং ডিমে তা দেওয়ার সময় ডিম ভেঙে যায়। ফলে উত্তর আমেরিকাসহ পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে এই পাখির সংখ্যা কমতে থাকে। পাখিটিকে একসময় বিপন্ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বিজ্ঞানীরা পাখিটিকে সংরক্ষণে নেমে পড়েন। পেরেগ্রিন ফান্ড নামের একটি সংগঠন গঠিত হয় ১৯৭০ সালে। তারা বড় ধরনের ক্যাম্পেইন শুরু করে। ডিডিটি বন্ধের জন্য জোরালো ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া পাখিটি সংরক্ষণে কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার পাখিটির গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৭২ সালে ডিডিটি নিষিদ্ধ করে। আর সংগঠনটির সহায়তায় প্রকৃতিতে ছাড়া হয় প্রায় চার হাজার পাখি। আস্তে আস্তে পেরেগ্রিন প্রকৃতিতে বাড়তে শুরু করে। বিপন্ন পাখি থেকে ১৯৯৯ সালে এটি ‘সংকটাপন্ন নয়’ তালিকায় স্থান পায়।

পেরেগ্রিন শাহিনের টিকে থাকার গল্প খুব সুন্দর। অনেকেই শুনে অবাক হবেন, এটিই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে দ্রুততম প্রাণী। অন্য কোনো প্রাণী এর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে না। এমনকি একটি রেসিং গাড়িও। স্থলজ পরিবেশের দ্রুততম প্রাণী চিতা ঘণ্টায় ১১২ কিলোমিটার বেগে চলে। আর এই পাখি চলে প্রায় তার চার গুণ বেশি, ঘণ্টায় প্রায় ৩৮৯ কিলোমিটার বেগে। পৃথিবীর দ্রুততম মানুষ উসাইন বোল্ট। দৌড়ের গতির জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছিলেন তিনি। বোল্টের গতি ঘণ্টায় ৪৪ দশমিক ৭২ কিলোমিটার। পেরেগ্রিন বোল্টের চেয়ে ৯ গুণ বেশি গতিতে উড়তে পারে।

অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশেই দেখা মেলে পেরেগ্রিন শাহিনের। পরিযায়নের সময় এরা বছরে প্রায় ২০ হাজার মাইল পরিভ্রমণ করে। বাংলাদেশে ফ্যালকনিডি পরিবারের সদস্যসংখ্যা ১০। এর মধ্যে তিন জাতের ফ্যালকন আবাসিক, তিনটি প্রজাতি শীতের পরিযায়ী, তিন জাতের পাখি ইতস্তত ভ্রমণকারী পাখি ও এক জাতের ফ্যালকন হলো চলার পথের পাখি। এর মধ্যে পেরেগ্রিন শাহিন বা ফ্যালকন শীতে দেশের সব প্রান্তেই দেখা যায়। খুব সহজেই দেখা মেলে ঢাকা শহরে। আমাদের দেশের উপকূলীয় এলাকায় এর অবস্থান আরও বেশি। এসব এলাকায় সৈকত পাখির বিচরণ। আর শাহিনের প্রিয় খাবার সৈকত পাখি।

পৃথিবীর প্রায় সব ফ্যালকনারিতে এই পাখির খেলা দেখানো হয়। আরব শেখদের কাছে ফ্যালকনের কদর সবচেয়ে বেশি। ফ্যালকন দিয়ে তারা রাজকীয় শিকারে বের হয় প্রতি মৌসুমেই।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন