বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বন্য প্রাণী অপরাধ দমনের জন্য ২০১২ সালের জুলাই মাসে স্ট্রেনদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ড লাইফ প্রোটেকশন প্রকল্পের আওতায় ইউনিটটি কাগজে-কলমে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও আবাসস্থল উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৫ সালে ইউনিটের কার্যক্রম মহাখালীর বন ভবন থেকে আগারগাঁওয়ে বন ভবনের সপ্তম তলায় স্থানান্তর করা হয়।
ইউনিট ও ল্যাবে কর্মরত ব্যক্তিরা জানালেন, ইউনিটের উদ্ধার বা জব্দ করা বন্য প্রাণী পরিবহনের জন্য গাড়ি ও গাড়ির চালক নেই। নেই পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম। উদ্ধার বা জব্দ করা বন্য প্রাণীকে সাময়িকভাবে রেখে পরিচর্যা ও চিকিৎসা করার জন্য রেসকিউ সেন্টার নেই। ইউনিটের জন্য এখন পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট হটলাইন নম্বর নেই। কর্মকর্তা, কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। উদ্ধার করা আহত বা অসুস্থ বন্য প্রাণীর চিকিৎসায় পশু চিকিৎসকও নেই। ফরেনসিক ল্যাবেও আছে যন্ত্রপাতির সংকট।

default-image

২০১২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইউনিটের হিসাব বলছে, এ পর্যন্ত বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে ৩৬ হাজারের বেশি। তবে সবই পাচার বা অপরাধীর হাত থেকে উদ্ধার নয়, এর মধ্যে বাড়ি থেকে সাপ উদ্ধারসহ লোকালয়ে চলে আসা বন্য প্রাণী রয়েছে। এ সময়ে পাখি উদ্ধার করা হয় ২৭ হাজারের বেশি। স্তন্যপায়ী প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে ৭০০টি।

বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের অধীনে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে মোট মামলা হয়েছে ১৪টি। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে নয়টি। বছরটিতে মোট অপরাধীর সংখ্যা ছিল ২৮ জন। বন্য প্রাণীসংক্রান্ত মোট অপরাধ ঘটেছে ৫৪৯টি। জব্দ করা মোট প্রাণী ছিল ৩ হাজার ৭৮৫টি। জব্দ করা মোট ট্রফি ছিল ১৬৯টি। দুটি বিনোদনমূলক পার্ক ও মিনি চিড়িয়াখানায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এ ইউনিটের অধীনে ২০১৬ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে বন্য প্রাণী ফরেনসিক ল্যাব। বন্য প্রাণীর ডিএনএ প্রোফাইল, ডিএনএর মাধ্যমে সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে ফৌজদারি অপরাধ শনাক্ত করে ফৌজদারি প্রমাণ হেফাজতে রাখার পাশাপাশি আদালতে সাক্ষ্য–প্রমাণ উপস্থাপন করা হচ্ছে এ ল্যাবের মাধ্যমে।

ইউনিটের পরিচালক এ এস এম জহির উদ্দিন আকন জানালেন, ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৯টি মামলার বিভিন্ন আলামত ফরেনসিক ল্যাবে এসেছে। ১২টি আলামতের কাজ নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ছাড়া নয়টি আলামতের ক্ষেত্রে বন্য প্রাণীসংক্রান্ত অপরাধ হয়নি। এর পাশাপাশি সারা দেশের বন্য প্রাণীর ডেটাবেইস বা জেনেটিক ডেটাব্যাংক তৈরির কাজ চলছে ফরেনসিক ল্যাবে। বর্তমানে দুজন কর্মকর্তা ল্যাব সামলাচ্ছেন।

ফরেনসিক ল্যাবে পাওয়া ফলাফল মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে সহায়তা করছে। তবে ল্যাবের কাজে কোনোটির ফলাফল পেতে তিন মাস, আবার ছয় মাসও লেগে যেতে পারে উল্লেখ করে এ এস এম জহির উদ্দিন আকন বলেন, বন্য প্রাণী বা সহজ করে বললে বলা যায়, হরিণের মাংস জব্দ করা হয়েছে, তবে তা আসলেই হরিণের মাংস কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্যই ল্যাবের ফলাফল জরুরি ভূমিকা রাখছে। মৃগনাভি জব্দ করা হলো, তবে পরীক্ষায় দেখা যায় তা মৃগনাভি নয়, কৃত্রিম কিছু একটা পাচারের জন্য নেওয়া হচ্ছিল। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীরা সাজা পাচ্ছে দ্রুত, অপরাধীদের মনে ভয়ও কাজ করছে।

default-image

দেশের সংবিধানে ১৮(ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় অঙ্গীকার করা হয়েছে। গত প্রায় ১০০ বছরের মধ্যে ৩১টি বন্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা জানালেন, বন্য প্রাণী সংরক্ষণে সরকারের জনবলের স্বল্পতা আছে। তাই সারা দেশের তথ্য প্রদানকারীকে (পরিচয় গোপন রেখে) গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে কাজ চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান, ইউএনও—সবার সহায়তা নেওয়া হচ্ছে যেকোনো অভিযানে। ঢাকার বাইরের বন বিভাগের অফিসের কর্মীরাও সহায়তা করছেন।

পরিচালক এ এস এম জহির উদ্দিন আকন বলেন, আইন অনুযায়ী বন্য প্রাণী ধরা, মারা, খাওয়া, ক্রয়-বিক্রয়, পাচার, দখলে রাখা বা শিকার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অপরাধী চক্র শক্তিশালী এবং স্মার্ট বেশি। বন্য প্রাণীসংক্রান্ত অপরাধ কমছে তা বলা যাবে না। অপরাধীরা পথ পরিবর্তন করছে। তবে আইনের পাশাপাশি মানুষের নিজের স্বার্থেই বন্য প্রাণীকে সংরক্ষণ এবং তার নিজের পরিবেশে থাকা নিশ্চিত করতে হবে। বন্য প্রাণী বিভিন্ন ভাইরাস বহন করে, যা ওদের ক্ষতি করে না, তবে পাচার করা, শিকার বা খাওয়ার মাধ্যমে তা মানুষের মধ্যে চলে আসে। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট এবং ল্যাব যত শক্তিশালী হবে, বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ তত জোরালো হবে।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন