ধেয়ে আসছে 'সুপার ঘূর্ণিঝড়' আম্পান, সিডরের চেয়েও শক্তিশালী

বিজ্ঞাপন
default-image

বাংলাদেশের উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এটি ইতিমধ্যে ‘সুপার ঘূর্ণিঝড়ে’ পরিণত হয়েছে। চলতি শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এটিই প্রথম সুপার ঘূর্ণিঝড়। এর আগে ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরও সুপার ঘূর্ণিঝড় ছিল না।

গতকাল সোমবার রাত নয়টায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান গতি-প্রকৃতি বজায় থাকলে ঘূর্ণিঝড়টি আজ মঙ্গলবার রাতের শেষ ভাগ থেকে আগামীকাল বুধবার বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২০ কিলোমিটারের বেশি হলে তাকে সুপার সাইক্লোন হিসেবে ঘোষণা দেয় ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি)। বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরও একে সুপার ঘূর্ণিঝড় হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটি গতকাল রাত নয়টা পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, সুপার ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২২৫ থেকে ২৪৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হচ্ছে।

গতকাল বিকেল পাঁচটায় এই ঘূর্ণিঝড় নিয়ে ফেসবুকে সরাসরি বক্তব্য দেন আইএমডির মহাপরিচালক মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র। তিনি বলেন, এই শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে এটিই প্রথম সুপার ঘূর্ণিঝড়। ভারত ও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আঘাতের সময় এর গতিবেগ কমতে পারে। তারপরও এর গতি ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার চেয়ে বেশি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশের হাতিয়াসহ পার্শ্ববর্তী দ্বীপগুলো উঁচু জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। একই সঙ্গে মূল আঘাতটি সুন্দরবনসংলগ্ন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের খুলনা-সাতক্ষীরা এলাকায় হতে পারে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, গতকাল রাত নয়টায় ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ–পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হতে পারে এবং পরে দিক পরিবর্তন করে উত্তর-উত্তর পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে খুলনা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিসত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এ কে এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পান প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বঙ্গোপসাগরে শক্তি অর্জন করছে। এখন পর্যন্ত তার গতি–প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, এটি সিডরের মতোই প্রবল শক্তিশালী ঝড় হিসেবে বাংলাদেশে আঘাত করতে পারে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) বলছে, ঘূর্ণিঝড়ের গতি বাড়ুক কিংবা কমুক, এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও আবহাওয়া অধিদপ্তরের আম্পান–সংক্রান্ত যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৫১টি জেলায় আম্পানের প্রভাব পড়তে পরে। তবে উপকূলের ২৪ জেলায় ঝড়ের প্রভাবে ফসল ও জনজীবনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের সাতক্ষীরার শ্যামনগর দিয়ে বাংলাদেশ অতিক্রম করতে পারে। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৮০-২৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। সাতক্ষীরা হয়ে এটি খুলনার ভেতর দিয়ে যশোর, পাবনা হয়ে রংপুরের ওপর দিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ড অতিক্রম করতে পারে। তবে এই পথ দিয়েই যে ঘূর্ণিঝড়টি যাবে, তা শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। সাধারণত এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় খুব দ্রুত গতিপথ বদলাতে পারে। তবে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা নাগাদ নিশ্চিত হওয়া যাবে ঘূর্ণিঝড়টি কোথায় কোথায় আঘাত হানতে পারে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়টি প্রবল শক্তি নিয়ে বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের দিকে মুখ করে এগোচ্ছে। গত এক যুগে বাংলাদেশে যে কয়টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে। ফলে আমাদের সর্বোচ্চ সাবধানতা ও প্রস্তুতি নিতে হবে।’

default-image

আম্পান নিয়ে সতর্কতার অংশ হিসেবে গতকাল দুপুরে সরকারের কৃষি আবহাওয়া প্রতিবেদনে বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ৮০ শতাংশ পেকে যাওয়া বোরো ধান কেটে ফেলতে হবে। পরিপক্ব হয়ে ওঠা সবজি, ফল তুলে নিরাপদ স্থানে রাখতে হবে। মাছের পুকুর ও ঘেরের চারপাশে জাল দিয়ে ঘিরে ফেলতে হবে, যাতে জলোচ্ছ্বাসে মাছ ভেসে না যায়। আর যেসব ফসল কেটে নিরাপদ স্থানে নেওয়া যাবে না, সেগুলো মাঠের এক কোনায় উঁচু স্থানে পলিথিন দিয়ে বেঁধে রাখতে হবে, যাতে ভারী বর্ষণে নষ্ট না হয়। আর জমিতে কীটনাশক, সার প্রয়োগ আপাতত বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার ২ কোটি ৪ লাখ টন বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ কাটা হয়েছে। এ ছাড়া মাঠে প্রায় ৮ লাখ টন আম, ১০ লাখ টন কাঁঠাল রয়েছে। প্রচুর পরিমাণে তরমুজ, বাঙ্গি, লিচুসহ অন্যান্য মৌসুমি ফলও রয়েছে। এর সবই পরিপক্ব অবস্থায় রয়েছে। ফলে সেগুলো দ্রুত গাছ থেকে সংরক্ষণ না করলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আছে বলে মনে করছেন কৃষিবিদেরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্যার আগে আগেই আমরা হাওরের ফসল সফলভাবে কেটে ফেলতে পেরেছি। আম্পান আঘাত হানার আগেই বেশির ভাগ বোরো ধান ও অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতে পারব বলে আশা করছি।’

বন্দর ও উপকূলে সতর্কতা
ঘূর্ণিঝড় আম্পানের গতি–প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর বিপৎসংকেত এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপৎসংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং এসব জেলার আশপাশের দ্বীপ ও চর ৭ নম্বর বিপৎসংকেতের আওতায় থাকবে। অন্যদিকে উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং এসব জেলার কাছের দ্বীপ ও চর ৬ নম্বর বিপৎসংকেতের আওতায় থাকবে।

১৪ জেলায় জলোচ্ছ্বাসের শঙ্কা
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, ঘূর্ণিঝড় এবং অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং এসব জেলার কাছের দ্বীপ ও চরের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪-৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড়টি অতিক্রমকালে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম জেলায় অতিভারী বৃষ্টিসহ ঘণ্টায় ১৪০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

যেভাবে নামকরণ
আম্পান অর্থ শক্তিমান বা শক্তিশালী। এটি থাই শব্দ। থাইল্যান্ডের আবহাওয়াবিদেরা এই নামটি দিয়েছেন। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশের আবহাওয়াবিদেরা মিলে ৬৪টি ঘূর্ণিঝড়ের নামের একটি তালিকা করেছিলেন। ওই তালিকার সর্বশেষটি ছিল আম্পান। এরপর সাগরে যে ঝড় তৈরি হবে, সেটি নতুন তালিকা থেকে ঠিক করা হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন