default-image

একটু আগেই ঝুম বৃষ্টি হয়েছে। পথের দুই পাশের গাছপালা সজীব, মায়াময়। রাজধানীর শাহবাগ থেকে ছবিরহাট অবধি বীথিবদ্ধ সুবিশাল অশ্বত্থগাছগুলোর লম্বা লেজঅলা পাতার ডগা বেয়ে দু–এক ফোঁটা বৃষ্টিকণা তখনো গড়িয়ে পড়ছে ধীরলয়ে। চারুকলা প্রাঙ্গণের সুলতানচাঁপাগাছে সুদৃশ্য তরুণ ফলগুলো আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে ঝুলে আছে। যদি একটু ছুঁয়ে দেখতে পারতাম! গ্রীষ্মের শেষভাগেই এবার গাছটিতে ফুল ফুটেছিল। বছর কয়েক আগে কার্টুনিস্ট ও অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্যকে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে গাছটি লাগিয়েছিলাম। এরপর শুধুই অপেক্ষা। প্রতি বর্ষায় শিশির ভট্টাচার্য্যের ফোন, ফুল যে ফুটল না! আমি সান্ত্বনার সুরে বলি, আগামী বছর ঠিকই ফুটবে।

সেই প্রতীক্ষার অবসান অবশেষে হলো। ফুল ফুটল গত বছর। টিএসসিকে পাশ কাটিয়ে রিকশা ছুটছে দোয়েল চত্বরের দিকে। টিএসসি প্রাঙ্গণে সপ্তাহ দুয়েক আগে ফোটা বেরিয়াগাছের ফুলগুলো এখন অনেকটাই বিবর্ণ। ৩০ বছরের ঢাকা-জীবনে এমন নির্জন–নিষ্প্রাণ টিএসসি কখনো দেখিনি। করোনা আমাদের জীবনে ঝড়তোলা এক প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন যেনবা। সবকিছু দুমড়েমুচড়ে এলোমেলো করে দিতে চাইছে।

বাংলা একাডেমির মূল ফটক পেরিয়ে খানিকটা ভেতরে যেতেই একগুচ্ছ কুরচি ফুল স্বাগত জানাল। মাত্র তিন বছর আগে লাগানো গাছটিতে দিব্যি ফুল ফুটছে। অনতিদূরেই বিস্তীর্ণ পথে ঝরে পড়া অজস্র মালতী ফুল জানান দিচ্ছে আষাঢ়ের উপস্থিতি। গাছটি অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার লাগানো। এখানে তাঁর লাগানো আরও বহু গাছ আছে।

প্রায় জনশূন্য অফিস–প্রাঙ্গণ। কিন্তু আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের ছাদবাগানের গাছগুলো চুম্বকের মতো টানছে। মাত্র ছয় মাস বয়সী গাছগুলোর সঙ্গে ইতিমধ্যেই দারুণ সখ্য গড়ে উঠেছে। মূলত এই বাগানের রূপকার একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। বিচিত্র ফুল, ফল আর আলংকারিক উদ্ভিদের সমারোহ চোখে পড়ার মতো। বৃষ্টিস্নাত গাছগুলো পত্রপল্লবে বেশ সুশোভিত হয়ে উঠেছে। এত কম বয়সী গাছে ফুল–ফলের উপস্থিতি রীতিমতো আনন্দদায়ক। সবচেয়ে বেশি অভিভূত হতে হলো মৌমাছি দেখে। বুনো চেরিগাছের ফুলে ফুলে ঘুরছে কয়েকটি। ওদের অনুসরণ করেই স্নিগ্ধ এই ফুলগুলো আবিষ্কার করি। গাছভর্তি ফুল আর ফল। আসলে পাখিদের খাবারের কথা বিবেচনা করেই গাছটি লাগানো হয়েছে। এত দ্রুত ফুল–ফল হবে ভাবতে পারিনি।

জন্মস্থান দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এ গাছ ছায়াবৃক্ষ হিসেবে কাজে লাগে। পরিপক্ব ফল স্থানীয়ভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে উপকারী বলে মনে করা হয়। লোকবিশ্বাস মতে, গাছটি সমৃদ্ধির প্রতীকও। ইংরেজি নাম ‘কটন ক্যান্ডি বেরি’ বা ‘জ্যামাইকা চেরি’ হলেও কোনো বাংলা নাম নেই। অগত্যা বুনো চেরি নামই থাকুক।

এরা চিরসবুজ উদ্ভিদ। ৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ঘনবদ্ধ ছড়ানো মুকুট যুক্ত, শাখা–প্রশাখা ঝুলন্ত। বাকল মসৃণ, ফিকে বাদামি-ধূসর ও শক্ত তন্তুময়। পাতা ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা, একান্তর, আয়তাকার বা সরু ডিম্বাকার। শীর্ষ দীর্ঘাগ্র। ফুলের রং সাদা, পাপড়ি পাঁচটি। পুংকেশর অনেক, প্রায় এক সেন্টিমিটার লম্বা এবং পরাগধানী উপবৃত্তাকার। ফল খুদে জাম আকৃতির, অর্ধগোলাকার, এক থেকে দেড় সেন্টিমিটার চওড়া। পরিণত রং লালচে। প্রায় সারা বছরই পর্যায়ক্রমে ফুল ও ফল থাকে। পাকা ফল খাওয়া যায়। বাকলে দড়ি হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজে পাতার সেদ্ধ ক্বাথ চায়ের বিকল্প হিসেবে খাওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0