বনে দেখা বিপন্ন বৈলাম

ফুলসহ বৈলাম (বাঁয়ে)। বৈলামগাছের প্রধান কাণ্ড, সাঙ্গু সংরক্ষিত অরণ্যে।
ছবি: লেখক

বান্দরবান থেকে থানচি। সেখান থেকে লম্বা ও সরু নাও ভাসিয়ে রেমাক্রি। সেখানে নেই কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল সব বন্ধু থেকে বিচ্ছিন্নতা! তখন বন্ধু কেবলই বন, বনের পাখি, বনের গাছ ও সাঙ্গুর পানি। প্রায় ১০ দিন থাকতে হবে বনে ও জলে। পাহাড়ি বনের পশুপাখি ও গাছপালা গবেষণার কাজ।

আদতে আমাদের পাহাড়ি বন প্রায় পুরোটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। পাহাড়ি বন থেকে কেটে ফেলা হয়েছে শত বছরের শত শত মহিরুহ বৃক্ষ। জুমের আগুনে জ্বলে গেছে শত শত একর বনভূমি। এখন আদি বনের দেখা পাওয়া কঠিন। কেবলই সাঙ্গু-মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনের কিছু অংশ আদি বনের ছাপ ও শত বছরের কিছু গাছ নিয়ে টিকে আছে। তবে সেখানকার বনের মধ্যেও দেখেছি স্বয়ংক্রিয় করাতে কাটা হয়েছে বিশাল বিশাল গাছ। এ গাছগুলো কাটার সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত। কয়েকটি ধাপে কাটা হয় বয়সী গাছগুলো। মালিঙ্গাপাড়ায় যেখানে বিশাল আকারের কাটা গাছ পেয়েছি, সেখান থেকে বিজিবি ক্যাম্প খুবই কাছে। ইলেকট্রিক করাত দিয়ে কাটার পর অনেক দিন গাছটি বনে পড়ে থাকে। তারপর সময় বুঝে ডালপালা কাটা হয়। এরপর বাকি কাজ। কখনো নদীর পানিতে ভাসিয়ে নেওয়ার উপযোগী গুঁড়ি, আবার কখনো একদম কাঠে পরিণত করে পাচার করা হয়। এভাবেই কিছু চক্র পাহাড়ের বন কেটে সাফ করে দিচ্ছে। জুমচাষের কারণেও বনের বিশাল অংশের সব গাছ পুড়িয়ে ফেলা হয়। বৈলামও বাদ পড়ে না সে আগুনের শিখায়!

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি। রেমাক্রি থেকে এক দিনের নদীপথ পাড়ি দিয়ে নদীর তীরেই সন্ধ্যায় ক্যাম্প করি। পরদিন সেই ক্যাম্পের আশপাশের বন এলাকায় গাছপালা ও পাখি পর্যবেক্ষণ করব। পরদিন সকালেই দেখা হয় কয়েকটি অতি উঁচু ও বিশাল কাণ্ডের কয়েকটি গাছের সঙ্গে। এত লম্বা গাছ আগে কোথাও দেখিনি। কয়েকজন মিলে হাত দিয়ে কাণ্ডের প্রস্থ বা বেড় মেপেছি। হ্যাঁ, এটাই বৈলামগাছ। বনের এখানে কয়েকটি আদি বৈলামকে পেলাম। গাছে তখন ফুল ছিল। কিন্তু এত উঁচু গাছের ফুলের স্পষ্ট ছবি টেলি লেন্স দিয়েও তোলা সম্ভব হচ্ছিল না! শাখাহীন খাড়া লম্বা কাণ্ড। এক রাজকীয় ও বলিষ্ঠ গড়ন।

বৈলাম বেশ উঁচু গাছ। ৩০-৪৫ মিটার লম্বা হয়। পত্র সরল, দীর্ঘায়িত। পুষ্পমঞ্জরি রেসিম। বৃতি পেয়ালাকার, ধূসর ও রোমশ। পাপড়ি প্রশস্ত, ডিম্বাকার ও দীর্ঘায়িত। ফুল মসৃণ, রং হলুদাভ সাদা। ফুলের পুংকেশর ১৫-২০টি। ফুল ধরে শীত থেকে বসন্তে। এটি মূলত অতিরিক্ত আর্দ্র ও প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়, এমন উষ্ণমণ্ডলীয় চিরহরিৎ অরণ্যে জন্মে। বৈলামের কাঠ শক্ত। কাঠ নির্মাণকাজে, যেমন ঘরের দরজা-জানালার কাঠামো ও ভিম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

পার্বত্য রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির প্রান্তিক বনে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু বৈলামগাছ আছে। বর্তমানে এটি অতি দুর্লভ। বৈলামের বৈজ্ঞানিক নাম Anisoptera scaphula। পরিবার ডিপটারোকারপেসি। আইইউসিএন বাংলাদেশ বর্তমানে দেশের বিপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতির লাল তালিকা তৈরি করছে। বৈলাম সেখানে স্থান পাবে মনে করি। তবে শুধু গাছের লাল তালিকায় নয়, আমাদের বনভূমির লাল তালিকাও করা দরকার। বন রক্ষা করতে না পারলে কোনো গাছই টিকবে না।