স্থানীয়ভাবে আরশল, বরুনা, আওয়াল ও আশওয়াল নামেও পরিচিত। এ ছাড়া মগ ও গারোদের ভাষায় ক্রাওরু ও শিলাংগ্রি নামে পরিচিত। আশপাশে আরও প্রায় ১২টি হরিনাগাছ আছে বলে জানালেন তাঁরা।

হরিনা আমাদের বিপন্ন প্রজাতির বৃক্ষ। ২০১২ সালের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে গাছটিকে রক্ষিত উদ্ভিদ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত বন উজাড় ও অতিরিক্ত পরিমাণে কাঠ আহরণের ফলে গাছটি নিজ আবাসে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। একসময় চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেটের পাহাড়ি বনাঞ্চল এবং গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের শালবনে বিক্ষিপ্তভাবে এ গাছ দেখা যেত। এখন সংখ্যায় খুবই নগণ্য। ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে কয়েকটি গাছ আছে। ব্রিটিশ ভারতের অরণ্যতরু সন্ধানী জে ডি হুকার ১৮৮৫ সালে চট্টগ্রাম জেলা থেকে গাছটি রেকর্ড করেন।

হরিনা (Vitex peduncularis) ছোট বা মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা বৃক্ষ। সাধারণত ৫ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কচি ডালপালা চারকোনাবিশিষ্ট। বাকল অমসৃণ, হলুদাভ ধূসর বর্ণের। পাতা যৌগিক, লম্বা বোঁটার আগায় তিন থেকে চারটি পত্রক সজ্জিত। পত্রকগুলো আয়তাকার, লম্বায় ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার, কিনারা মসৃণ ও আগা সুচালো। এপ্রিল-মে মাসের দিকে পাতার কক্ষে লম্বাটে মঞ্জরিদণ্ডে হলুদাভ ফুল ফোটে। ঝুলন্ত ফুলগুলো দেখতে অনেকটা গোলমরিচের মতো গোলাকার ও স্থায়ী বৃতিযুক্ত। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের দিকে ফলগুলো পরিপক্ব হয়। তখন দেখতে কালো রঙের। বীজ সাধারণ তাপমাত্রায় বায়ুরোধক পাত্রে এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।

বীজ থেকে ১৫-২০ দিনের মধ্যে চারা গজায়। হরিনার কেটে ফেলা গাছের গোড়া বা মোথা থেকে প্রাকৃতিকভাবে একাধিক কুশি বা চারা জন্মায় এবং পর্যায়ক্রমে তা পূর্ণ গাছে পরিণত হয়।

এ গাছের কাঠ হলদে বাদামি বর্ণের, বেশ শক্ত, ভারী ও মজবুত। ঘরবাড়ির খুঁটি, বিম ও কৃষি সরঞ্জামাদি তৈরিতে ব্যবহার্য। মূলের থেঁতলানো রস মেঘালয়ের গারো জাতিগোষ্ঠীর মানুষ কালাজ্বরে ব্যবহার করে। আমাদের দেশেও মূল, বাকল ও পাতার নির্যাস কালাজ্বর নিরাময়ে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

এ ছাড়া পাতা ও বাকল বুকের ব্যথা, জন্ডিস, ডায়াবেটিস ও ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোথাও কোথাও পাতা সবজি হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয়।

মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন