পরিচয়ের বছরখানেক পরেই তাঁর ছাদবাগানটি দেখার সুযোগ হলো। এরপর আরও কয়েকবার বাগানটির রূপ-মাধুরী উপভোগ করেছি। একদিকে বিচিত্র উদ্ভিদের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, অন্যদিকে বিশেষ কিছু উদ্ভিদকে ছাঁচে ফেলে বনসাই তৈরির আয়োজন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, তিনি বাগানে দেশীয় প্রজাতির উদ্ভিদগুলোই প্রাধান্য দিয়েছেন। আরও বিস্মিত হয়েছি কিছু বড় আকৃতির গাছকে বশ মানিয়ে ফুল ফোটাতে দেখে। এর মধ্যে আছে উদাল, কুরচি, কনকচাঁপাও। তাঁর বৈচিত্র্যময় অন্যান্য সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে বট পরিবারের নানান রকমফের, নীলমণি মালতী ও মাধবীলতা, ছাতিম, কনকচূড়া, তমাল, রসুন্দি, কাঁকামুমুট, বাগানবিলাস, জবা, মিষ্টি জলপাই, আম, আতাফল, শরিফা, কামরাঙা, ডালিম, খেজুর, হিজল, সাইকাস, রঙ্গন, তেঁতুল ইত্যাদি।

বনসাই তিনবার একক প্রদর্শনীও করেছেন লায়লা আহমেদ। মনে পড়ে, কয়েক বছর আগে ঢাকায় চারুকলার একটি গ্যালারিতে তাঁর বনসাই প্রদর্শনী চলছিল। সম্ভবত জুন মাস। এই অসময়ে তিনি বাগান থেকে নিয়ে এলেন টক-মিষ্টি স্বাদের কুল। দেখেই অবাক আমরা। এই মৌসুমে তিনি কোথায় পেলেন সুস্বাদু কুল! বাগানে তিনি এমন অনেক বিচিত্র ফল-ফুলের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। পরিসরের দিক থেকে ততটা বড় না হলেও সংগ্রহের দিক থেকে সমৃদ্ধ তাঁর বাগান।

জন্মস্থান টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী বিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় প্রথম বাগান করার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন লায়লা। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা হানিফ উদ্দিন আহমেদ তাঁর জন্য নিয়ে আসেন গোলাপগাছ। মেয়ের এই শখের প্রতি বাবার পূর্ণ সমর্থন ছিল।

মাধ্যমিকের পাট না চুকাতেই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। কিন্তু থেমে যান না তিনি। স্বামী আইনজীবী শফিক আহমেদ তাঁর ভালোবাসার এই উদ্ভিদ–জগৎ নির্মাণে বন্ধুর মতোই পাশে দাঁড়ান। একদিন শুধু শখের বশেই বৃক্ষচর্চার এ কাজ শুরু করেছিলেন লায়লা।

অথচ এখন সন্তানসম এই উদ্ভিদরাজি দেখে বিস্ময় মানেন! কতটা শ্রম তাঁকে দিতে হয়েছে। চার সন্তানের সব দায়িত্ব আর সংসারের সবকিছু সামলে তবেই না তিনি বাগানের কাজটুকু করার ফুরসত পেতেন। চারা, টব, মাটি, সার, কীটনাশক কেনা—এসব আবার ছাদে ওঠানো। নিয়ম করে পানি দেওয়া, পরিচর্যা করা—সে এক মহাযজ্ঞ। তবে আলাপচারিতায় বোঝা গেল, বাগানের এসব কাজে তিনি ক্লান্তি অনুভব করেন না। গাছের পেছনে ছুটতে ছুটতে এই জগতের অনেক খুঁটিনাটি শিখে নিয়েছেন তিনি। কীভাবে গাছের পরিচর্যা করতে হয়, কোন পোকার কী ওষুধ, কোন গাছের কী পদ্ধতিতে চারা-কলম করতে হয়।

লায়লা আহমেদ জানালেন, মালিবাগের ‘স্বপ্নিল ভিলা’ নামের ছয়তলা এই বাড়ির বাসিন্দারা বিকেলটা কাটানোর জন্য গাছগাছালি ঘেরা এই ছাদটিই বেছে নিয়েছেন। এই ছোট্ট বাগানের সামনে বসার জন্য রয়েছে কয়েকটি বেঞ্চ। সবুজে ঘেরা ছাদে বিকেলের সময়টুকু সবার ভালোই কাটে।

আমাদের শহরগুলোয় হয়তো উৎসাহী এমন অনেক উদ্যানীরই খোঁজ মিলবে, কিন্তু লায়লা আহমেদের মতো একাগ্রতা আর সাধনা দিয়ে বাড়ির প্রস্তরকঠিন অনুর্বর ছাদকে রীতিমতো সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাগানে পরিণত করা অকৃত্রিম মানুষ হাতে গোনা যাবে।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন