default-image

বরগুনায় ১০০টি ইটভাটায় প্রতিদিন কমপক্ষে ৩৫ হাজার মণ জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। সে হিসাবে প্রতি মাসে ভাটায় পুড়ছে প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার মণ কাঠ। এসব ভাটার এক-তৃতীয়াংশই অবৈধভাবে লোকালয় ও ফসলি জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো ও ৮ ধারা অনুযায়ী লোকালয়ে ও কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন দণ্ডনীয় অপরাধ।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিন আ ক ম মোস্তফা জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিডর-আইলাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব বৃক্ষ জানমালের সুরক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করেছে। ব্যাপকহারে বৃক্ষনিধনের কারণে কার্বণ নিঃসরণের পরিমাণ বাড়বে। ফলে উষ্ণতা বাড়ার পাশাপাশি পরিবেশ হুমকিতে পড়বে।’
বরগুনা জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলায় অনুমোদিত ইটভাটা রয়েছে ২৫টি। কিন্তু কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের বরগুনা সার্কেল-২-এর কর্মকর্তারা জানান, জেলায় মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দেয় এমন নিবন্ধিত ভাটা রয়েছে ৩৫টি। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ভাটার সংখ্যা ৫৪। এর মধ্যে ৩০টির পরিবেশ ছাড়পত্র আছে। এ ছাড়া অনুমোদনহীন ড্রাম চিমনির ইটভাটা আছে ১৬টি, ১২০ ফুট উচ্চতার স্থায়ী চিমনির ভাটা আছে সাতটি। তবে স্থানীয় হিসাবে জেলায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে কমপক্ষে ১০০টি ভাটা আছে।
ইটভাটার শ্রমিক ও মালিকেরা জানান, নিয়মানুযায়ী কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোর কথা থাকলেও এসব ভাটায় কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ভাটায় দৈনিক ৩৫০-৪০০ মণ জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন হয়। ৩৫০ মণ হিসাবে একেকটি ভাটায় মাসে কাঠ ব্যবহার হয় ১০ হাজার ৫০০ মণ। সে হিসাবে ১০০টি ভাটায় প্রতি মাসে ১০ লাখ ৫০ হাজার মণ কাঠ ব্যবহৃত হচ্ছে।
বরগুনা জেলা ভাটা মালিক সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় তাঁদের সমিতির আওতায় ৩০টি ভাটা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৯টি ভাটায় পরিবেশবান্ধব জিগজ্যাগ চিমনি আছে। বাকি সব কটি ভাটায় স্থায়ী (ফিক্সড) ও ড্রাম চিমনি ব্যবহার করা হয়। সমিতির বাইরে রয়েছে আরও ৪০টির মতো ভাটা।

default-image

পাথরঘাটার বিষখালী নদীতীরের কূপদোন এলাকায় দেখা যায়, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঘেঁষে প্রায় ১৩ একর ফসলি জমিতে ‘আরএসএফ এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বাঁধের ঢালে ৮-১০টি পুকুর খনন করে মাটি তুলে ইট তৈরি হচ্ছে। কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, পুকুর খনন করে মাটি তোলা ও ভাটার নির্গত ধোঁয়ায় আশপাশের জমির ফলন অর্ধেকে নেমে গেছে। বর্তমানে ভাঙনকবলিত ওই এলাকায় বাঁধের বাইরের ঢাল থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। এতে বাঁধটি হুমকির মুখে পড়েছে। ভাটামালিক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘বাঁধের বাইরের মাটি জমির মালিকদের কাছ থেকে কিনেছি।’
আমতলী উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় সাত একর জমির ওপর ‘আরএফএমএস’ ব্রিকস নামে একটি ইটভাটায় ড্রাম চিমনি বসিয়ে কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে। এসব কাঠ কাটা হচ্ছে ভাটার মধ্যে স্থাপিত একটি করাতকলে। ভাটার চারপাশে ২০০-২৫০ একর ফসলি জমি ও ৩০০-৪০০ বসতবাড়ি রয়েছে। নাচনাপাড়া আরএবি ও মহিষডাঙ্গার এমসিকে ব্রিকস নামের অপর দুটি ভাটাতেও কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।
একই উপজেলার তালুকদার বাজার এলাকায় ‘এইচআরটি ব্রিকস’ ও চন্দ্রা এলাকায় ‘এইচবিএম ব্রিকস’ নামের ইটভাটায় ড্রাম চিমনির ভাটাটিও স্থাপন করা হয়েছে ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও লোকালয়ের পাশে।
আমতলী উপজেলার মহিষডাঙ্গায় এমসিকে ব্রিকস নামের অপর একটি ভাটার পাশে করাতকল বসিয়ে কাঠ চেরাই করে তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভাটার মালিক সোবাহান কাজী পরিবেশ ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই ইটভাটা চালানোর কথা স্বীকার করে বলেন, ‘জিগজ্যাগ চিমনি করতে অনেক অর্থের প্রয়োজন বলে করতে পারছি না।’
একইভাবে বরগুনা সদরের কুমড়াখালী, ভুতমারা, নিশানবাড়িয়া; পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া, বাদুরতলা, কালমেঘা, বাইনচটকি; আমতলী উপজেলার চাউলা বাজার, ছুরিকাটা, মহিষডাঙ্গা, তালতলা, শাখারিয়া বাজারসহ কয়েকটি এলাকায় ড্রাম চিমনিতে কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক সুকুমার বিশ্বাস বলেন, পরিবেশ ছাড়পত্র নেই, এমন ভাটা সম্পূর্ণ অবৈধ। অচিরেই এসব ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মীর জহুরুল ইসলাম বলেন, কোনো ভাটা আইন লঙ্ঘন করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন