প্রথম আলো: চট্টগ্রাম নগরে এখন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এর কারণ কী?

আয়শা আখতার: ঢাকার মতো চট্টগ্রাম নগরেও মানুষের চাপ বাড়ছে। এখানে ভবন তৈরির হিড়িক পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে বাড়ি করা হচ্ছে। আবার ভবনের নকশা অনুমোদনে নালা-নর্দমার অবস্থান ও আয়তনকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া খাল-নালা সংকুচিত হয়েছে। এতে পর্যাপ্ত পানি অপসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা এখন উঁচু-নিচু সব এলাকাতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রথম আলো: আগে কোনো কারণে পানি উঠলে তা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার মধ্যে নেমে যেত। কিন্তু এখন দিনের পর দিন পানি জমে থাকছে। এ অবস্থার সৃষ্টি হলো কেন?

আয়শা আখতার: চট্টগ্রাম পাহাড়ি এলাকা। এখানে পাহাড় কাটা হোক বা না হোক, বৃষ্টির সময় পাহাড় থেকে বালু ও মাটি নালা-নর্দমা-খালে নেমে আসে। আবার এখানে খাল-নালা-নর্দমা দখল করে বিপণিবিতান, দোকানপাট ও ঘরবাড়ি করা হয়েছে। এ ছাড়া খাল-নালা-নর্দমায় নিয়মিত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব কারণে খাল-নালা-নর্দমা বালি, কাদা, ময়লা, আবর্জনায় ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। পানি যাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছে।

প্রথম আলো: চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্পের কাজ চলছে চার বছর ধরে। তারপরও কেন জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ কমছে না?

আয়শা আখতার: চাক্তাই খালের উন্নয়নকাজের মাধ্যমে এ সমস্যা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়া যেতে পারে। চাক্তাই খালকে এখন ‘চট্টগ্রামের দুঃখ’ বলা যায়। উন্নয়ন প্রকল্পে শুধু রাস্তার পাশের নালা কিছুটা বড় করে পানির ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। পানি অপসারণে চাক্তাই খালের যে রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, তা হচ্ছে না। যেমন এ খালের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ভেতর জমে থাকা বালু-কাদা-ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কিন্তু তা করা হয়নি।

আবার এখন রাস্তার পাশে নালার পানির স্তর বিবেচনায় না নিয়েই খালের দুই পাশের দেয়াল উঁচু করে দেওয়া হচ্ছে। এতে নালার পানি খালে যাওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উল্টো খালের পানি নালার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আশপাশের এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। আর অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনার কারণে নালা ভরাট হয়ে গেছে। এতে পানি অপসারিত হতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগছে।

প্রথম আলো: এবার চট্টগ্রাম নগরের কিছু কিছু এলাকায় ছয় থেকে সাত দিন ধরে পানি জমে আছে। আগে এ রকম হয়নি। কেন এই ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করল বলে মনে করেন?

আয়শা আখতার: চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার সমস্যা এই অবস্থায় আসার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেয়ে যেনতেনভাবে প্রকল্প প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের আগ্রহ বেশি। প্রকল্প পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগে গণশুনানির মাধ্যমে প্রকল্পের অবস্থান, পরিবেশ, অর্থনৈতিক-কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি বিবেচনায় নেওয়া হয় না। জলাবদ্ধতা নিরসনে অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তা অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।
পানি নিষ্কাশনের জন্য খালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা থাকার পরও পর্যাপ্ত ও যুগোপযোগী পদ্ধতিতে খাল রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নালা-নর্দমার অবস্থান ও আয়তনকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এগুলো আবার অবৈধ দখল ও ত্রুটিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর বাইরে জনসচেতনতার অভাব তো রয়েছেই।

প্রথম আলো: এই দুঃসহ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কি নেই?

আয়শা আখতার: অবশ্যই উত্তরণের উপায় আছে। এ জন্য প্রকল্পের কারিগরি ও বাস্তবায়নের দিকগুলোর উৎকর্ষ সাধন করতে হবে। খাল-নালা-নর্দমার ওপর থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। খাল-নালা-নর্দমাগুলোর পুনঃখনন ও সংস্কারের বিকল্প নেই। বিভিন্ন খালের মধ্যে সংযোগ দিতে হবে। নালাগুলোর ধারণক্ষমতা বাড়ানো দরকার। নগরের নালা-নর্দমায় পলি, বালু ও ময়লা-আবর্জনার পরিমাণ কমাতে ফাঁদ বা ট্র্যাপের ব্যবহার করা যায়। আর চট্টগ্রাম নগরের জন্য পরিকল্পিত পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এ কার্যক্রমগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এ কাজে প্রয়োজনে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া যায়। এভাবে অগ্রসর হলে এ দুঃসহ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব।

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন