আবাসিক পাখি

লড়াকু পাখি কালিম

বিজ্ঞাপন
default-image

১৫ জুলাই নরসিংদীর সরওয়ার পাঠান মুঠোফোনে জানালেন, চার–পাঁচটি বুনো কালিম চরে বেড়াচ্ছে ডুমরি ঝিলে। চমৎকার ওই ঝিলে বেশ আমি কয়েকবারই গিয়েছি। ঝিলটা পড়েছে নরসিংদীর পলাশ ইউনিয়নের একটি গ্রামে। সরওয়ার বাংলাদেশ ওয়াইল্ড লাইফ ক্লাবের একজন সদস্য। এককালে ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার ছিলেন। তাঁর তোলা বহু ছবি আমার বিভিন্ন বইয়ে ছেপেছি। তাঁর সঙ্গে শিবপুরে গিয়ে গৃহপালিত কালিমও দেখেছি। ছানাপোনাসমেত কালিম। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি ছানাদের নিয়ে দিব্যি চরে বেড়াচ্ছে। দেশের আরও ১০–১২টি জেলায় আমার চোখে পড়েছে গৃহপালিত কালিম। আশ্চর্য! এমন দাপুটে লড়াকু পাখি পোষ মেনে গেল!

কালিম মূলত জলাভূমি, বিলঝিল আর হাওরের পাখি। দলে চলে, দলে চরে। বিপদের গন্ধ পেলে জলজ আগাছা, নলখাগড়া আর ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে যায়। প্রয়োজনে ঊর্ধ্বলাফে ৯–১০ ফুট পর্যন্ত উঁচুতে উঠে যেতে পারে। অল্প পানিতে দাপটের সঙ্গে হাঁটে। বুকভরা সাহস এদের, চোখভরা রোষ। কোয়াক কোয়াক শব্দে ডাকাডাকি করে। লড়াইয়ের সময় এদের হাঁকাহাঁকি প্রবল।

ডাহুক-ঘুঘুর মতো পোষা পুরুষ কালিম পাখি দিয়ে বুনো কালিম শিকার করতে দেখেছি বাল্য ও কৈশোরে। হেমন্ত আর শীতে দেশের বিল ও হাওরাঞ্চলে জাল-ফাঁদে আটকানো প্রচুর কালিম হাটবাজারে বিক্রি হতো সে সময়ে।

শক্তপোক্ত আর মোটা ও ধারালো ঠোঁট দিয়ে কামড়ে এরা মানুষের হাতের চামড়া তুলে ফেলতে পারে। পাখিশিকারিরা তাই এদের একটি পালক ছিঁড়ে নাকের একপাশ দিয়ে ঢুকিয়ে অন্যপাশ দিয়ে বের করে দুটি ঠোঁট কষে বেঁধে দিত। বন্দুকের গুলিতে এদের একটি পা আহত বা অকেজো হয়ে পড়লে জলপিপির মতো অচল পা ঠোঁটে চেপে অদ্ভুত হাস্যকর ভঙ্গিতে এরা উড়ে পালায়।

পূর্ণবয়স্ক কালিমের মাথায় চমৎকার আলতা–লাল রঙের শক্ত বর্ম। লড়াইয়ের সময় লড়াকু ছাগলের মতো এদের বর্মে বর্মে ঠোকাঠুকি করতেও দেখেছি। পোষা মোরগের মতো এরা পা চালাতেও পটু। পরস্পরের পা লড়াইয়ের সময় আঁকড়ে ধরে।

কালিমের ঠোঁট ও পা লাল। বাকি পুরো শরীর নীলচে বেগুনি। লেজের তলার পালক কার্পাস তুলার মতো সাদা। অতি চতুর, সাবধানী ও আত্মগোপনে পারদর্শী কালিমরা দ্রুতবেগে উড়তে পারে না। মূল খাদ্য জলজ পোকামাকড়, নানা ধরনের বীজ, কচি পাতা ও মূল, খুদে শামুক, ছোট মাছ, ব্যাঙ ইত্যাদি। বাসা বাঁধার ভরা মৌসুম গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু। জলজ উদ্ভিদ, গুল্ম বা ঝোপের ভেতর লতাপাতা, শেকড় ইত্যাদি দিয়ে বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে তিন থেকে সাতটি। ডিম ফুটে ছানা হয় ১৮ থেকে ২৩ দিনে।

কালিমের ইংরেজি নাম পার্পল সোয়ামফেন, বৈজ্ঞানিক নাম Porphyrio porphyrio। বুরি, কায়েম ইত্যাদি নামেও এরা ব্যাপক পরিচিত। দৈর্ঘ্যে ৪৫ সেন্টিমিটার। ওজন ৬৫০ গ্রাম। সারা বাংলাদেশেই কালিমের দেখা পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন