কুয়াশার কারণে পুরো সকালটাই নষ্ট হয়ে গেল। তেমন কোনো পাখি না আসায় অলস সময় কাটল। যদিও-বা কিছু পাখি এল, কিন্তু ছবি ভালো হলো না। বিরল ও দুর্লভ যে পাখিগুলোর খোঁজে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চা-বাগানে এসেছিলাম, সেগুলোর টিকিটিরও দেখা পেলাম না।
দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ অটোরিকশা এলে আধঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে চা-বাগানের ভেতরের বাঘাছড়া লেকের সামনে নামলাম। ছোট্ট লেকটির পুরোটাই যেন লাল শাপলায় ছেয়ে আছে! চমৎকার লাগছে। লেকের পাড়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে জুতসই একটা জায়গায় সঙ্গে আনা ফোল্ডিং চেয়ার খুলে বসলাম। দুপুর খাবার প্রস্তুত হতে ঘণ্টাখানেক দেরি। তাই এ সময়টা লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করে কাটাতে চাই। চেয়ারে বসে সুন্দর সুন্দর লাল শাপলার ওপর ফোকাস করছিলাম। হঠাৎই ক্যামেরার ফ্রেমে শাপলার পাশে হলদে-সাদা-ধূসর-কালচে একটি পাখির অবয়ব ভেসে উঠল। শাপলাপাতার ওপর চঞ্চল পাখিটির লেজ নাচানো ও দৌড়াদৌড়িতে মুহূর্তেই মনটা আনন্দে ভরে উঠল! সকালের কুয়াশায় মনে যে বিষাদ জমে ছিল, রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে লেকের টলটলে পানিতে লাল শাপলায় ছোট্ট পাখিটির চঞ্চলতায় তা চাঙা হয়ে উঠল। এবার চেয়ারে টান টান হয়ে বসে লাল শাপলায় চঞ্চল পাখিটির কিছু সুন্দর ছবি তুললাম। লেকের প্রাকৃতিক শাপলাবাগানে পোকামাকড় খেতে এসে পাখিটি আমাদের উপহার দিয়ে গেল কিছু ভালো লাগার মুহূর্ত।
লাল শাপলায় চঞ্চল লেজ নাচানো এই পাখিটি এ দেশে সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী পাখি হলদেমাথা খঞ্জন। ইংরেজি নাম সিট্রিন ওয়াগটেইল বা ইয়েলো হেডেড ওয়াগটেইল। পশ্চিমবঙ্গে বলে হলদেমাথা খঞ্চনা। মোটাসিলিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Motacilla citreola। রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, চীন, মঙ্গোলিয়া প্রভৃতি দেশের আবাসিক পাখিটি শীতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিযায়ী হয়।
চঞ্চুর আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত হলদেমাথা খঞ্জনের গড় দৈর্ঘ্য ১৭ সেমি। প্রসারিত ডানা ২৪-২৭ সেমি ও ওজন ১৮-২৫ গ্রাম। প্রজননকালে পুরুষের পুরো মাথার রং হলুদ। ডানা ও পিঠের পালক কালচে বা ধূসর। ঘাড়ের পেছন, কাঁধঢাকনি, কোমর ও ডানার মধ্য ও বড় ঢাকনির প্রান্ত সাদা। কালচে বাদামি লেজের দুই পাশের পালক সাদা। দেহতল লেবুর মতো হলুদ। কিন্তু প্রজননকাল শেষ হলে পালকের রং পাল্টে যায়। মাথার চাঁদিসহ দেহের ওপরের অংশ, কানঢাকনি ইত্যাদি ধূসর হয়ে যায়। মুখমণ্ডল ও ভ্রুর রং হলদে থাকে। দেহতল হয় ফ্যাকাশে হলদে থেকে সাদাটে। বুকে কিছু কালচে দাগ দেখা যায়। স্ত্রী দেখতে প্রজননহীন পুরুষের মতো হলেও মুখমণ্ডল ও ভ্রু হয় সাদাটে। স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে চোখ কালচে বাদামি এবং চঞ্চু, পা, পায়ের পাতা ও নখ কালো।
শীতে দেশের সব ধরনের জলাভূমি, যেমন হাওর, লেক, আর্দ্র ঘাসবন, ধানি জমি ইত্যাদি এবং উন্মুক্ত এলাকায় পাখিটির দেখা মেলে। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। জলাশয়ের কিনারায় বা জলজ আগাছা ও শাপলা-শালুক-পদ্মপাতায় হেঁটে হেঁটে নানা রকম কীটপতঙ্গ, শূককীট ও ছোট ছোট শামুক খায়। অত্যন্ত চঞ্চল পাখিটি অনবরত লেজ নাড়াতে থাকে। ঢেউয়ের মতো চমৎকার ভঙ্গিমায় উড়ে। ‘চিপ-চিপ...’ বা ‘দজিপ-দজিপ...’ শব্দে ডাকে।
এপ্রিল থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় নিজ আবাস এলাকার জলাশয়ের পাশে ভেজা মাটির ঝোপঝাড়, পাথরের আড়াল বা ঘাসের গোড়ায় ছোট্ট কাপ বা বাটির মতো বাসা বানায়। বাসা তৈরিতে ঘাস, শিকড়, চুল, পশম, শেওলা ইত্যাদি ব্যবহার করে। স্ত্রী ৩-৫টি হলুদাভ ধূসর বা হালকা সবুজাভ ডিম পাড়ে, যার ওপর লালচে বাদামি ঘন দাগ-ছোপ থাকে। ডিম ফোটে ১১-১২ দিনে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ১০-১৩ দিনে ছানারা উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল প্রায় পাঁচ বছর।