বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
কোপেনহেগেন থেকে প্যারিস, সেখান থেকে গ্লাসগো- একের পর এক জলবায়ু সম্মেলন হয়েছে। বিশ্বনেতারা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলোও। কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ খুব একটা দেখা যায়নি।

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় জাতিসংঘের আয়োজনে জলবায়ু বিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলন (কপ-২৬) চলছে। বছরের পর বছর ধরে জলবায়ু নিয়ে এসব বৈশ্বিক আসরে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বারবার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের লাগাম টানতে ধনীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। নিজেরা যে কৃতকর্মের জন্য দায়ী নয়, সেটার ফল ভোগ করায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে আসছে।
কিন্তু এসবের ফল কতটা পাওয়া গেছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশ্বজুড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নানা মহলে সতর্কতা, একের পর এক বৈশ্বিক আয়োজনের পরও ভাগ্য বদলায়নি গাবুরাবাসীর। আজ থেকে এক যুগ আগে ২০০৯ সালেও জলবায়ু নিয়ে এমন একটি বৈশ্বিক আসর বসেছিল। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছিল জলবায়ু বিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলন, কপ-১৫।

আমরা আসলে জানি না কী করা প্রয়োজন। যদি সবাই আমাদের সহায়তা করে তবে হয়তো পরিবর্তন আসবে। আমাদের অর্থ নেই। আমরা গরিব। অন্য কোথাও চলে যাওয়ার উপায় নেই আমাদের। আমরা অনেক ভুগেছি। আমি চাই না, আমার সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিরাও এই সমস্যায় পড়ুক।-
শরবানু খাতুন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত।

কোপেনহেগেনের ওই আয়োজনে বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন শরবানু খাতুন। শরবানুর বাড়ি সাতক্ষীরার গাবুরায়। জলবায়ু পরিবর্তনের জের ধরে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার ঝুঁকিতে পড়া মানুষ শরবানু। জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিনিধি হিসেবে ধনী দেশগুলোর কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে কোপেনহেগেনে উড়ে গিয়েছিলেন শরবানু। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম তাঁকে কপ-১৫-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল।

শরবানু শুধু গাবুরার বাসিন্দা নন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ব্যক্তিগতভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত একজন নারী। পরপর দুটো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় বাড়িঘর হারিয়ে চার সন্তানকে নিয়ে বেড়িবাঁধে বসবাস করতেন শরবানু। ঘূর্ণিঝড়ে নিজেও কোনো রকমে প্রাণে বেঁচেছেন। কোপেনহেগেনে গিয়ে ভয়ংকর সেসব অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন বিশ্ববাসীকে। চেয়েছেন ন্যায্য ক্ষতিপূরণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শরবানুর মতো চরম ক্ষতিগ্রস্তদের আরজি শুনে কোপেনহেগেন সম্মেলন শেষে শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে গরিব ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ১০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই অর্থ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ও অভিযোজনে ব্যয় করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতির শতভাগ পূরণ করতে পারেনি। এ জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে শরবানুর মতো ক্ষতিগ্রস্তদের।
জলবায়ু তহবিলের অর্থ শরবানুদের কতটা প্রয়োজন? বিগত এক যুগে তাঁদের ভাগ্য কতটা বদলেছে? এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায় সংশ্লিষ্টদের মনে। কেননা, কোপেনহেগেন থেকে প্যারিস, সেখান থেকে গ্লাসগো- একের পর এক জলবায়ু সম্মেলন হয়েছে। বিশ্বনেতারা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলোও। কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ খুব একটা দেখা যায়নি।

সিডর-আইলার পর শরবানুসহ গাবুরা গ্রামের অনেকেই বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখনো অনেকে স্থায়ী আবাসে ফিরতে পারেননি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার ঝুঁকি। বালুর বস্তা ফেলে বেড়িবাঁধের সাময়িক আবাস রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা স্কুলঘর। দুর্যোগের সময় সেটা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছেই। ডুবছে উপকূলের নানা প্রান্ত। ৪৪ বছর বয়সী শরবানু বলছিলেন, ‘আমরা আসলে জানি না কী করা প্রয়োজন। যদি সবাই আমাদের সহায়তা করে তবে হয়তো পরিবর্তন আসবে। আমাদের অর্থ নেই। আমরা গরিব। অন্য কোথাও চলে যাওয়ার উপায় নেই আমাদের। আমরা অনেক ভুগেছি। আমি চাই না, আমার সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিরাও একই সমস্যায় পড়ুক।’

প্রতিবেদনটির সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন অনিন্দ্য সাইমুম ইমন

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন