শেষ সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে

বিজ্ঞাপন
default-image

রীনা আক্তার (২০) তাঁর এক মাসের শিশুকন্যা তাইমাকে বুকে নিয়ে এক কিলোমিটার হেঁটে এসেছেন একটি স্কুলে। সঙ্গে তাঁর স্বামী সোহাগ খান (৩০)। রীনাদের বাড়ি পটুয়াখালীর চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে।

রীনা আক্তার বলেন, ‘বইন্যার কথা শুইন্যা মাইয়ারে লইয়া এইহানে আইছি। স্বামী ঘর ছাইড়া আসতে চাইছিল না।’ তাঁদের বাড়ির পাশে আশ্রয়কেন্দ্র আগুনমুখা নদীতে বিলীন হয়েছে। তাই আগেভাগেই কোলের সন্তানকে বুকে নিয়ে তিনি চালিতাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।

গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ৩টার মধ্যে রীনা আক্তারের মতো অন্তত ৩০০ জন নারী, শিশু, বয়স্ক পুরুষ চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের এ বিদ্যালয়ে এসে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন। কারণ, এ ওয়ার্ডের ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রটি ইতিমধ্যে আগুনমুখা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এলাকার লোকজনও নদীভাঙনের শিকার। তাই আগেভাগেই তাঁরা নিরাপদে এসে আশ্রয় নিয়েছেন।

ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাকলি বেগম (৪৫) আশ্রয় নিয়েছেন চালিতাবুনিয়া ইউপি কার্যালয় ভবনে। তাঁর সঙ্গে তাঁর তিন ছেলেমেয়েও আছে। কাকলি বেগম বলেন, স্বামী কালাম মীর এখন বাড়ি পাহারা দিচ্ছেন। তাই বিকেলেই তাঁদের পাঠিয়েছেন। কাকলি বেগম জানান, সিডরের সময় তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে আসেননি। কিন্তু পরে জলোচ্ছ্বাস হলে গাছ ধরে বেঁচেছিলেন তিনি।

চালিতাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জাহিদুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসনের নির্দেশে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবকেরা মাইকিং করলেও লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা যাচ্ছিল না। পরে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের কথা শুনে মানুষজন নিজেরাই নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে আসছেন।

এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাশফাকুর রহমান জানান, যেহেতু এ উপজেলায় আটটি চরে বেড়িবাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্র নেই, তাই চরের মানুষজনকে সেখান থেকে সরিয়ে আনতে ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসন কাজ শুরু করেছে। বিভিন্ন চরে নৌযান পাঠিয়ে মানুষজন সরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় চার হাজার মানুষ ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি জরুরি সভা করেছে। জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ সভায় জরুরি প্রস্তুতি হিসেবে দুর্যোগকালে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়সহ সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সভায় জানানো হয়, জেলার ৪০৩টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রসহ মোট ৬৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আট লাখের বেশি মানুষ নিরাপদ আশ্রয় নিতে পারবেন। আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষের জন্য দুই হাজার কার্টন শুকনা খাবার রয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগ–পরবর্তী চিকিৎসাসেবার জন্য জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ৭৪টি চিকিৎসা দল গঠন করা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’–এর প্রভাবে গতকাল পটুয়াখালীতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। দিনভর মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রশাসন, রেড ক্রিসেন্ট, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কমিটির স্বেচ্ছাসেবকেরা উপকূলের মানুষদের নিকটবর্তী আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির সহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, জেলার কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী, গলাচিপা ও দশমিনা—এ চারটি উপজেলার ৬ হাজার ৫২৫ জন স্বেচ্ছাসেবক স্থানীয় লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী উপকূলীয় এলাকায় প্রায় সাড়ে চার লাখ নারী, পুরুষ ও শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে এসেছেন।

পটুয়াখালী নদীবন্দরের পরিবহন পরিদর্শক জহিরুল ইসলাম জানান, জেলার সব নদীপথে নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিরোজপুরে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন। জেলার ২২৮টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য প্রচার–প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

গতকাল বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে দুর্যোগ প্রস্তুতির বিষয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাতে আবার সভা হবে। ইতিমধ্যে জেলার ৩৫ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৭টি উপজেলার ২২৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ লাখ ৭৩ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবেন। মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির স্বেচ্ছাসেবক, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের পক্ষ থেকে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মসজিদগুলো থেকে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির ১ হাজার ২৭৫ জন স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (এনজিও) ৭৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। জেলায় ১৬৯টি চিকিৎসা দল গঠন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন