বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গত ২০ নভেম্বর খুব ভোরে নিঝুম দ্বীপের অদূরে নোঙর করা জাহাজ থেকে নামানো জীবনতরিতে চেপে আমরা সাত-আটজন যখন চরের কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন সেখানকার আকাশে-বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল হাটবাজারে ছড়িয়ে পড়া মানুষের গুঞ্জনের মতো হাজারো পাখির কলরব। সামান্য যে কুয়াশা, তাতে ৫০ মিটার দূরের কিছু দেখা যাচ্ছিল না। তবে পাখির কূজন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছিল।

আমাদের সফরসঙ্গী ছিলেন বাংলাদেশে নবনিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত এনে’জেরারড ভ্যান লিউয়েন। তিনি কৈশোর থেকেই পাখিপ্রেমিক। রাষ্ট্রদূতই প্রথম বললেন, দূরে যে পাখির কলরব, তার মাঝে সবচেয়ে বেশি শুনতে পাচ্ছেন লালশির বা উইজিয়ন নামের হাঁসের ডাক। এই ডাকের সঙ্গে আমার আসলেই পরিচয় ছিল না। রাষ্ট্রদূত এটাও জানালেন, লালশির তাঁদের শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিচরণ করে।

default-image

দিগন্তরেখা বরাবর সূর্য দেখা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখির কলরব বাড়তে থাকল। আমরা একটা নির্দিষ্ট সীমানায় স্পিডবোট থামিয়ে পাখির সংখ্যা কত হতে পারে, তার একটা আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম। এতে যোগ দিলেন বন বিভাগের বন্য প্রাণী গবেষক রাজিব রাশেদুল কবির এবং ইসাবেলার ফাউন্ডেশনের পাখি গবেষক সাবিত হাসান। ওখানে আমরা সবাই গিয়েছিলাম ইসাবেলার ডাকে আর রাষ্ট্রদূত ছিলেন তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে নিজ দেশের অর্থায়নে উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত প্রকল্প দেখার জন্য। পাখি দেখা ছিল দুই পক্ষের জন্যই বোনাস, যদিও ইসাবেলার জন্য এটা একটা পাখিশুমারিরও অংশ।

লালশির ও পিয়ং হাঁসের দল

বলা চলে, লালশিরের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ হাজার। সঙ্গে আরও দেখলাম শ পাঁচেক পিয়ং হাঁস বা গ্যাডওয়াল, সমপরিমাণ ভূঁতি হাঁস বা ফেরুজিনাস ডাক, কিছু পাতিহাঁস বা ম্যালারড, পান্তামুখী বা খুন্তে-ঠোঁটি হাঁস বা শোভেলার এবং পাতারি হাঁস বা ইউরেশিয়ান টিল। তবে টাঙ্গুয়ার হাওরে দেখা রাঙ্গামুড়ি বা রেড-ক্রেস্টেড পোর্চাড এবং কালো কুট বা জলকুক্কুট একদমই ছিল না।

লালশির আসে শীতের শুরুতে এবং ফেব্রুয়ারির মধ্যেই চলে যায়। এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের একেবারে উত্তরাংশে তাদের বসবাস গ্রীষ্ম-বর্ষা ও শরতকালজুড়ে। সেখানে বাসা বানানো, বাচ্চা তোলা ও সেগুলো বড় করে তারা প্রায় সবাই যাত্রা করে দক্ষিণের দিকে।

হেমন্ত ও শীতের শুরুতে যখন উত্তরের দেশগুলোতে বরফ পড়তে ও জমতে শুরু করে, তখনই লালশিরের সঙ্গে ওখানে বসবাস করা সব পাখির যাত্রা শুরু হয় দক্ষিণের কম শীতের দেশগুলোর দিকে। কারণ, দক্ষিণের দেশে ঠান্ডা পড়ে, কিন্তু সচরাচর বরফ জমে না।

লালশির ইউরোপ, এশিয়াসহ আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশে এদের একটি দল আসে প্রতিবছর। বাংলাদেশে আইইউসিএন এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব পরিযায়ী পাখির পায়ে আংটি পরায় এবং লালশিরসহ আরও কয়েকটি প্রজাতির পাখির পিঠে সৌরশক্তিচালিত রেডিও-ট্রান্সমিটার মজবুত আঠা ও বিশেষ ফিতার সাহায্যে আটকে দেয়। ওসব পাখি কোন কোন দেশের ওপর কখন উড়ে গেছে এবং কোন দেশে কত লম্বা সময় কাটিয়েছে, তা এর মাধ্যমে জানা যায়।

যত দূর জানা গেছে, উত্তর-পশ্চিম রাশিয়া ও ইউরোপের লালশিরের যে দল, তারা পরিযায়ন করে দক্ষিণ ইউরোপ হয়ে মধ্য এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে। আর রাশিয়ার অন্তর্গত এশিয়ার উত্তরাংশ থেকে লালশির যাত্রা করে দক্ষিণের দিকে, যার একটা বড় দল আসে বাংলাদেশে, দুই ভাগে। এর এক ভাগ থাকে দেশের দক্ষিণের মোহনাঞ্চলে। অন্য দল থাকে মূলত সিলেট বিভাগের হাওরে, বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওরে ও বড় বড় নদীর চরাঞ্চলে। আমাদের দেখা পাখির ঝাঁক মোহনায় আসা দলটির একাংশ মাত্র।

default-image

পিয়ং হাঁস বা গ্যাডওয়াল লালশিরের মতো দেখতে তেমন সুন্দর নয়। এদের দুটো দল আছে। একটির বাস উত্তর আমেরিকায়। অন্যটির বাস ইউরোপ, এশিয়া এবং উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকায়। দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশ হয়ে চীনের পূর্ব দিকে বসবাস করে শীতকালে। মধ্য ইউরোপ থেকে মধ্য এশিয়া হয়ে পূর্ব এশিয়া এদের প্রজননক্ষেত্র।

জাহাজমারা থেকে চর কুকরিমুকরি

নিঝুম দ্বীপের পর আমরা হাজির হই মোক্তারিয়া খাল নামে জাহাজমারার কাছের একটি পুরোনো চরের নদী অংশে যোগ হওয়া নতুন চরের পলিময় অংশে, যা ভাটার সময় কেবল চোখে পড়ে। সেখানে হঠাৎ দেখা মিলল প্রায় ঘুমিয়ে পড়া বা ঝিমুতে থাকা এক ঝাঁকে, একদম গাদাগাদি করে এক পায়ে বা দুই পায়ে ভর করে দাঁড়ানো হাজারখানেক কালোলেজ জৌরালি বা ব্ল্যাক-টেইল্ড গডউইট। সে দৃশ্য ছিল অভিনব। দৃশ্যটা দেখে ডাচ রাষ্ট্রদূত বললেন, সম্ভবত ওরা সারা রাত লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে উড়ে এসে ভোরে কাদাভূমিতে আশ্রয় নিয়েছে। তাই ওরা ক্লান্তিতে চোখের ঘুম ঠেকাতে পারছে না। তিনি জানালেন, কালোলেজ জৌরালি ওনার দেশের জাতীয় পাখি। ওদের থেকে সামান্য দূরে কয়েক শ ছিল সোনা বাটান বা সোনালি বাটান বা প্যাসিফিক গোল্ডেন প্লোভার। এরাও খুব দূরপাল্লার যাত্রী। ধারের কাছে যাঠুয়া বা বড় সাদা বক, মাঝারি বক, ছোট বক এবং কিছু ধূসর বক তো ছিলই।

চর কুকরিমুকরির পাশের ডমার চরে দেখা গেল এ মৌসুমের প্রথম বৃহৎ চিত্রা ইগলের। দুরবিন ব্যবহার না করেই খালি চোখে দেখে এবং পাখির আদল থেকে বুঝতে পারি, পলিমাটিতে ঢেকে যাওয়া পুরোনো চরে রাত কাটিয়ে ভোরবেলা সামান্য কাটিকুটির ওপর আশ্রয় নিয়ে ইগল পাখিটি চারপাশে দেখছিল, কোন পাখিটিকে শিকার করতে পারবে। ইগলটিকে ভালো করে দেখার জন্য আমরা পিচ্ছিল কাদাময় পথে এগোতে থাকলাম। রাষ্ট্রদূত এনে, আমি, রাজিব ও সাবিত ইগলের প্রায় ১০০ মিটারের মধ্যে পৌঁছে দেখলাম, সে একটা ছোট মরা ডালের ওপর আশ্রয় নিয়েছিল। সে চোখ রাখছিল, দূরে বিচরণ করা বক, গুলিন্দা ও হাঁসের ওপর। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সে উড়ে গিয়ে অদূরের একটি ঢিবির ওপর গিয়ে বসল। আমরা তাকে আর বিরক্ত না করে বাকি পাখি গণনায় মন দিলাম।

নানা প্রজাতির পাখি

পরে যখন ছোট স্পিডবোট নিয়ে পাখি দেখতে বের হই, তখন কেওড়া বনের পাশে এবং নদীর তীরেও কিছু পরিযায়ী পাখি দেখি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল একটি শিকারি বাজ বা শাহিন বা পেরেগ্রিন ফ্যালকন। সে নদীপারের একটি উঁচু গাছের ডালে প্রায় খাড়াখাড়িভাবে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা খুব কৌশলে ওর ৩০ মিটারের মধ্যে নৌকা নিয়ে পৌঁছাতে পারি।

ডমার চরে আরও নজরে এল সোনা বাটান, চা পাখি, লাল-পা পিউ, সবুজ-পা পিউ, মাছরাঙা, খঞ্জনি, তুলিকা বা পিপিট, কানিবক, শালিক, হলদে পাখি, দোয়েল, সুইচোরা প্রভৃতি। চরে বিশ্রামে ব্যস্ত ছিল ডজন তিনেক চখাচখি, চকাচকি বা রুডি শেলডাক। রাজহাঁস ছাড়া দেশে পরিযায়ী হাঁসের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড়। চমৎকার রঙের একহারা কমলা-পিঙ্গল বর্ণ। কেবল পুরুষের ঘাড়ে একটা আধা কালচে বলয় থাকে, যা মাদি হাঁসে নেই।

ডমার চরের দূরের এক অংশে আধমরা নদীর অংশজুড়ে জাল পেতে রেখেছিলেন জেলেরা। সেখানে চোখে পড়ল সবচেয়ে বেশি যাঠুয়া বক, মাঝারি বক, ছোট বক, গোবক, কানি বক, কয়েক শ জল কবুতর, অর্ধশত শঙ্খচিল, বড় গুলিন্দা, ছোট গুলিন্দা, কালোলেজ জৌরালি, সোনা বাটান, কেন্টিসের জিরিয়া, ছোট জিরিয়া, লাল-পা পিউ ও সবুজাভ পিউ।

পরদিন চর কুকরিমুকরি দ্বীপের চারপাশের নদীর পারে পারে পাখির শুমার করা শুরু করলাম ভোর থেকে। আগে ভাবিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাভূমিতে শীতে পরিযায়ন করতে আসা ছোট সরালির বড় বড় দল কুকরিমুকরির আশপাশে দেখতে পাব। সব মিলিয়ে হাজারের বেশি সরালি, প্রায় ততোধিক সোনালি বাটান ও অন্যান্য বাটান বা প্লোভারস, ডজন কয়েক খোঁয়াজ বা খোঁয়াজ-খিজির, উল্টোঠোঁটি বা অ্যাভোছেট, শ খানেক কাস্তেচরা বা আইবিস, চখাচখি, লালশির, পিয়ং হাঁস, মাছরাঙা, পানকৌড়ি ইত্যাদি। মোহনার চরে চরে পরিযায়ী পাখি দেখা শেষে ২২ নভেম্বর আমরা ঢাকায় ফিরি।

অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে

রাজশাহী-রংপুর বিভাগের নদীর চরে এবং দেশের হাওরে বিষ প্রয়োগ বা ফাঁদ পেতে চখাচখি ও কিছু হাঁস ও অন্য সব পরিযায়ী পাখি ধরে শিকারিরা খায় বা বাজারে বিক্রি করে। চোরা শিকারিরা গুলি করেও এদের মেরে থাকে।

আমার কাছে মনে হয় দেশে কেবল বন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি ও সংরক্ষণ সুব্যবস্থাপনা না থাকার ফলে পাখিসহ বন্য প্রাণী ও এদের পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে এবং বন্য প্রাণীরা মারা যাচ্ছে। অনেক প্রজাতি এখন বিলুপ্তির মুখে।

আমি মনে করি, বাংলাদেশ সরকারের এখনই উচিত বন্য প্রাণী বিভাগ নামে বন্য প্রাণীতে নিবেদিত একটি নতুন বিভাগ সৃষ্টি করা। যার প্রধান কাজ হবে দেশের বন, কৃষিভূমি, পাড়াগাঁয়ের ও সব ধরনের পানির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে পাশের ছোট দেশ নেপাল, ভুটান ও মালয়েশিয়ার উদাহরণ গ্রহণ করে দেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণব্যবস্থা জোরদার এবং বিশ্বমানের করা সম্ভব।

লেখক: দুবাই সাফারির প্রধান বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন