default-image

দেশে ৪ এপ্রিল যে ঝড় হয়, তাতে মারা যান কমপক্ষে ১৮ জন মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ওই দিনের ঝড়ের গতি ছিল ঘণ্টায় ৬৫ কিলোমিটারের আশপাশে। কোথাও হাওয়া দমকার বেগে বড়জোর ৬৮ কিলোমিটারে উঠেছিল। বৈশাখের আগে ও পরে, মানে বর্ষার আগে এ রকম আগমনী ঝড় ঋতু পরিবর্তনের প্রাকৃতিক আলামত হিসেবে স্বাভাবিক ঘটনা। দেশের উত্তর, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের কমবেশি ১৩টি জেলার ওপর দিয়ে বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে এই ঝড় বা বৃষ্টিসহ ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যায়।

এককভাবে মৃতের সংখ্যা গাইবান্ধায় বেশি। ঝড়ের পরপরই গাইবান্ধার প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। বলা হয় জেলা সদরে চার, পলাশবাড়ীতে তিন, ফুলছড়িতে দুই ও সুন্দরগঞ্জে একজন মারা গেছেন। এ ছাড়া ফরিদপুরে দুজন, কুষ্টিয়ায় একজন ও ঢাকায় দুজন নিহত হন। ঢাকায় ঝড়ের ঝাপটায় নির্মাণাধীন ইমারত থেকে পড়া ইটের আঘাতে মারা যান এক রিকশাচালক ও পাঁচ বছরের একটি মেয়েশিশু।

এর বাইরে নৌযানডুবিতে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায়। সেখানে মেঘনা নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে জেলেদের নৌকা। নিখোঁজ হওয়া পাঁচ জেলের মধ্যে তিনজনের মরদেহ (৮ এপ্রিল এখন পর্যন্ত) পাওয়া গেছে। এ তথ্য সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদ শাহনাজ।

গাইবান্ধার তুলনায় রাজশাহীতে ওই দিনের ঝড়টা ছিল একেবারেই সামান্য। বলা চলে দমকা বাতাস। সেদিন বৃষ্টির বালাই ছিল না। কিন্তু এই সামান্য ঝড়েই নগরের বিলশিমলা-কাশিয়াডাঙ্গা সড়কের ৫৯টি সড়কবাতি খুঁটিসহ পুরোপুরি উপড়ে পড়ে। ৫ কোটি ২২ লাখ টাকা খরচে লাগানো এসব সড়ক ঝাড়বাতির নাম দেওয়া হয়েছিল প্রজাপতি। গত ১১ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাতি উদ্বোধন করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান। এরপর থেকে সড়কটি প্রজাপতি সড়ক নামে পরিচিতি পায়।

সড়কটিতে দৃষ্টিনন্দন বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বাতিগুলো ‘অটোলজিক কন্ট্রোলারের’ মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্বলে ওঠা ও বন্ধ হওয়ার কথা। চীন থেকে আনা বাতিগুলো সরবরাহ করে হ্যারো ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তবে নাগরিকদের কপাল ভালো যে সড়কবাতির খুঁটিগুলো সড়ক বিভাজকের ওপরে পড়েছে। তাই কেউ হতাহত হননি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণত্রুটি ও অনিয়মের কারণেই এ বিপর্যয়।

বিজ্ঞাপন

কাদের মৃত্যু, কেন মৃত্যু

নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে প্রাণ গেছে মূলত নারী ও শিশুদের, এটা নিহতদের নামের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়। নিহত ও আহতের বেশির ভাগ ঘটনা ঘটে গাছচাপা পড়ে, উড়ে আসা টিনের আঘাতে ও নির্মাণাধীন ইমারত থেকে ইট পড়ে। নগরের ফ্ল্যাটবাড়ির খোলা বারান্দা বা ব্যালকনিতে ঝুলিয়ে রাখা ছোট–বড় ফুলের টব ঝড়ে নিচে পড়ে গিয়েও দুর্ঘটনা ঘটে।

এবারের মৌসুমে ঝড়ে মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর জন্য গত ২৫ মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক লেখায় কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বহুতল ভবনে ঝুলন্ত ফুলের টবগুলো সরিয়ে রাখলে এবং নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের চেতনার তারে হালকা–পাতলা বাড়ি দিতে পারলে অন্তত তিনটি প্রাণ এ যাত্রায় রক্ষা পেতে পারত।

যাঁরা গাছচাপা পড়ে মারা গেছেন, তাঁদের তত্ত্বতালাশ করে জানা গেছে, এ সর্বনাশ ডেকে আনা হয়েছে ভুল জায়গায় ভুল গাছ লাগিয়ে। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার বেতকাপা ইউনিয়নের বাকেরপাড়া ও মোস্তফাপুর গ্রাম, সদর উপজেলার মালিবাড়ী ইউনিয়নের ঢনঢনিপাড়া, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাডাঙ্গা ইউনিয়নের কিশামত হলদিয়া, ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের কাতলামারী গ্রাম—সব জায়গায় একই ছবি। এসব এলাকায় যেসব গাছ ঝড়ে ভেঙে পড়েছে বা উপড়ে গেছে, তার কোনোটিই স্থানীয় প্রজাতির নয়। আম, জাম, ছাতিম, কদম, গাব প্রভৃতি গাছের কোনোটাই উপড়ে পড়েনি। ভেঙেছে বা উপড়েছে রেন্ডি নামে পরিচিত রেইনট্রি, ইউক্যালিপটাস, ইপিল ইপিল, চাম্বল ইত্যাদি গাছ।

খোদ ঢাকার রাস্তায় ইপিল ইপিল উপড়ে পড়ে ঝড়ের শুরুতেই। বলা বাহুল্য, এগুলো আমাদের দেশের গাছ নয়। দ্রুত বাড়ে কিন্তু ঝড় বা ঝোড়ো বাতাসে টেকে না। তাদের রক্ষায় স্থানীয় গাছেরাও এগিয়ে আসে না। কারণ তারা তাদের চেনে না।

গাছেদের মধ্যে ভাববিনিময় আর পারস্পরিক সহযোগিতার যে হদিস আচার্য জগদীশচন্দ্র দিয়েছিলেন, সেই সখ্যের শৃঙ্খল অচেনা গাছের জঙ্গলে ক্রমে ছিঁড়ে যাচ্ছে। চেনা গাছেদের নিজেদের মধ্যে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের কথা আর পরস্পরকে রক্ষার প্রাকৃতিক বন্ধুত্বের ইশারা নানা ধর্ম গ্রন্থে রয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরাও নতুন করে তার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন। আগ্রহী পাঠকেরা ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল নিউসায়েন্টিস্টডটকম নামের একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘ট্রিজ শেয়ার ভাইটাল গুডিস থ্রু এ সিক্রেট আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক’ শীর্ষক একটি লেখা পড়ে দেখতে পারেন। এটি লিখেছেন ব্রায়ান ওয়েনস।

default-image

কেন যায় নারীর প্রাণ গন্ডায় গন্ডায়

গাইবান্ধায় মৃতের হিসাব দেখে একজন জ্যেষ্ঠ সমাজ গবেষকের ফেসবুকে করা কাতর প্রশ্ন, ‘কিন্তু মেয়েরাই কেন বেশি বেশি মরে?’ নারীর মৃত্যুর চেয়ে এ ধরনের প্রশ্ন হয়তো আমাদের হতাশ করে বেশি। কিন্তু নারীর কাঁধের বোঝা যে এতটুকু কমেনি, কমছে না; সেটাই সবচেয়ে সত্যি।

১৮৫০ সালে ব্রিটেনের কবি চার্লস কিংসলে লিখেছিলেন ‘দ্য স্যান্ডস অব ডি’ শিরোনামের একটি কবিতা। জোয়ার আসার আগে মেয়ে মেরিকে চটজলদি গরু নিয়ে আসার তাড়া দিয়েছিলেন তার অভিভাবক। আমাদের কবি হুমায়ুন কবির সেই কবিতার অনুসরণে লিখেছিলেন—

শোন মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ ত্বরা করি মাঠে চল,/ এল মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনই নামিবে ঢল।/ নদীর কিনার ঘন ঘাসে ভরা/ মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা/ করিস না দেরি-আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল/ মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা মেঘনায় নামে ঢল…।

আসন্ন ঝড়ে সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার হকদার হলেও নারীকে আগে তাঁর চাল, চুলা, খড়ি, বকরি, হাঁস, মুরগি, গরু সামলাতে হয়। এসব সামলাতে গিয়েই নারী পানিতে ভাসেন অথবা গাছের নিচে চাপা পড়েন। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনেক কাঠামোগত উন্নতি হয়েছে, হচ্ছে, আরও হবে। তবে সমাজের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া মানবজীবন রক্ষার কাজটি সহজ হবে না। গাছ লাগানো ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে। বাইরের গাছ বাইরে থাকুক, দেশের গাছের ওপর গবেষণা বাড়ুক।

বিজ্ঞাপন

বুঝব কেমনে

এবারের ঘটনায় একজন মারা গেছেন ঝড়ে উড়ে আসা টিনের ধারালো আঘাতে। ’৯১–এর ঘূর্ণিঝড়ের পর সিদ্ধান্ত হয়েছিল টিনের ঘর আর নয়। সেই ঝড়ে আহত-নিহতদের অনেকের দেহে ছিল টিনের আঘাতের ক্ষত। ঝড়ে ঘরের টিনের চালা উড়ে যায়। সেই টিন সে রাতে হয়ে উঠেছিল উড়ন্ত তরবারি। সেসব বিভীষিকার স্মৃতি যাঁদের ছিল, তাঁদেরপ্রস্তাব এক সভায় গৃহীত হলেও আরেক সভা বসার আগেই বাতিল হয়ে যায়। টিন কোম্পানিগুলোর চাপ বলে কথা!

অবশ্য ঘরের ছাউনি হিসেবে টিনের একটা অন্য আকর্ষণ আছে। এগুলো দিতে সুবিধা, গুদামে রাখতে সুবিধা, বেচাকেনায় সুবিধা, নিতে সুবিধা—সুবিধায় সুবিধা। এত সুবিধার সঙ্গে বৈরিতা করলে টেকা কঠিন। তাই বিশেষজ্ঞরা বসে না থেকে একটা আপসরফা খুঁজতে থাকেন। গৃহনির্মাণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ নানা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিষয়টি ভেবেছে। বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের প্রকৌশলীরা টিনের টেকসই ব্যবহারের কিছু দিশা দেখিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্ভাবিত কৌশল অনুযায়ী ছাউনির টিনগুলো এমনভাবে লাগানো সম্ভব যে বড়সড় ঝড়েও তা উড়ে যাবে না। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা বিল্ডিং কোডের মাধ্যমে বিষয়গুলো জনপ্রিয় করে তোলার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

নির্মাণাধীন ভবন থেকে বা অভিজাত ফ্ল্যাটের খোলা বারান্দা থেকে ঝড়ের সময় নির্মাণসামগ্রী বা ফুলের টব পড়ে পথচারীর মৃত্যু কোনো নতুন ঘটনা নয়। এবারও তা ঘটেছে। এসব ক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের মালিক আর নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হওয়া উচিত। সেটা না পারলে অন্তত উচ্চ হারে জরিমানা করার ব্যবস্থা তো চালু করা যায়।

মাছ ধরতে গিয়ে কালবৈশাখীর কবলে পড়ে জেলেদের নিখোঁজ বা নিহত হওয়ার খবর ঝড়ের মৌসুমের নিত্য ঘটনা। সতর্কীকরণ ছাড়াও নৌকা নিয়ে যাওয়ার আগে ঘাটে নাম নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। জীবন রক্ষাকারী বা লাইফ জ্যাকেটের সহজলভ্যতা ও ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত।

আমাদের উন্নয়ন আর সাজসজ্জার খরচের সময়ও দেশের আবহাওয়া ও ঝড়-বৃষ্টির গতি–প্রকৃতির কথা আমলে নিতে হবে। এসব মনে না রাখলে, মেনে না চললে কী হতে পারে, তা রাজশাহী সিটি করপোরেশনকে ৪ এপ্রিলের সামান্য ঝড় দেখিয়ে দিয়েছে। খুঁটি পোঁতারও একটা বিজ্ঞান আছে। আমাদের বিজ্ঞান বুঝতে হবে, বিজ্ঞানীদের কথা শুনতে হবে।

লেখক গবেষক

[email protected]

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন