default-image

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’–এর আঘাতে সুন্দরবনে নানা প্রজাতির প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ ভেঙে গেছে। এসব গাছের বেশির ভাগই বনের পশ্চিম অংশে সাতক্ষীরা জেলায় পড়েছে। সে তুলনায় বনের পূর্ব অংশে বাগেরহাটের দিকে ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম। তা ছাড়া এখন পর্যন্ত কোনো বন্য প্রাণীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বন বিভাগের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বন বিভাগের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ঝড়ে ভেঙে পড়া সুন্দরবনের গাছ কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন। ভেঙে যাওয়া গাছ কেটে বন থেকে নিয়ে আসার পক্ষে যুক্তি হিসেবে তাঁরা বলছেন, এসব গাছ রাষ্ট্রীয় সম্পদ। ভেঙে যাওয়া গাছের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এসব গাছ কেটে এনে বিক্রি করলে বন বিভাগের রাজস্ব বাড়বে।

এ বিষয়ে বন বিভাগের প্রধান বন সংরক্ষক সফিউল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ভেঙে যাওয়া গাছ কেটে বন থেকে বের করে আনার ব্যাপারে অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে সিডর ও আইলার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, ভেঙে যাওয়া গাছ কেটে না ফেলে তা বনের মধ্যেই রেখে দেওয়া উচিত। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সুন্দরবনের গাছের আরও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হলেও তা প্রাকৃতিকভাবে ঠিক হয়ে যাবে। এ জন্য আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটকদের যাতায়াত সীমিত করে দিয়েছে বন বিভাগ।

ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানার সময় বন্য প্রাণী গবেষকদের একটি দল সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় অবস্থান করছিল। ওই দলের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য সায়েম ইউ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভোরে সুন্দরবন থেকে ফেরার পথে অনেক গাছ এবং গাছের ডালপালা ভাঙা অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন তাঁরা।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতের প্রাথমিক ধাক্কাটি দুই দেশের সুন্দরবনের ওপর পড়ে। এতে ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে যায়। সুন্দরবনে আঘাত হানার পর প্রায় ১০০ কিলোমিটার গতি নিয়ে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বুলবুল। অর্থাৎ ঝড়ের প্রাথমিক ধাক্কাটা লেগেছে সাতক্ষীরা অংশে।

>

বন বিভাগের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুন্দরবনে নানা প্রজাতির প্রায় সাড়ে চার হাজার গাছ ভেঙে গেছে

অন্যদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বন বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে ৪০ হেক্টর বনভূমি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। আর সেখানকার চার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাতেই কম–বেশি ঝড়ের প্রভাব পড়েছে। এতে কী পরিমাণ গাছ ভেঙেছে, সেই হিসাব চূড়ান্ত করতে পারেনি দেশটির বন বিভাগ। তবে সেখানেও কোনো বন্য প্রাণীর মৃতদেহ পায়নি তারা।

 ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য বন কর্মকর্তা রবিকান্ত সিনহা গত বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ৪০ হেক্টর বনভূমি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হওয়া ছাড়াও বনের বিভিন্ন স্থানে গাছপালার ক্ষতি হয়েছে।

পাখিদের ক্ষতির আশঙ্কা

বন বিভাগ থেকে সুন্দরবনের বন্য প্রাণীদের কোনো ক্ষতির তথ্য পাওয়া না গেলেও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন কথা বলছেন। তাঁরা মনে করছেন, সুন্দরবনের বঙ্গোপসাগর–সংলগ্ন অংশে এবং বনের ভেতরে নদীগুলোতে পাখিরা বেশি থাকে। আর ওই এলাকাতেই ঝড়ের তীব্রতা বেশি ছিল। ফলে পাখিদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আর পাখি ও অন্যান্য ছোট প্রাণী মারা গেলে তাদের মৃতদেহ জোয়ার–ভাটায় ভেসে চলে যাওয়ার কথা।

সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ঝড়ের যে তীব্রতা ছিল, তাতে সুন্দরবনের বাঘ বা অন্য বড় প্রাণীদের ক্ষতির তেমন আশঙ্কা নেই। তবে নিশ্চিতভাবে ঝড়ে প্রচুর বিপুলসংখ্যক পাখির মৃত্যু হওয়ার কথা। সুন্দরবনের গাছপালার ক্ষতির হিসাবের পাশাপাশি বন্য প্রাণীদের ক্ষতির হিসাব আলাদাভাবে করা উচিত বলে মত দেন তিনি।

পূর্ব সুন্দরবনে বেশি ক্ষতি

বন বিভাগের হিসাবে, সুন্দরবনের পশ্চিম অংশে (সাতক্ষীরা) চার হাজার গাছ ভেঙে গেছে। আর বনের পূর্ব অংশে (বাগেরহাট) ভেঙে পড়া গাছের সংখ্যা ৪৮০টি। এসব গাছের বেশির ভাগই বন বিভাগের উদ্যোগে রোপণ করা হয়। মূলত ঝাউ, শিশু, মেহগনি ও ফলের গাছ ভেঙেছে।

অন্যদিকে সুন্দরবনের পূর্ব অংশে ভেঙে যাওয়া গাছের মধ্যে বেশির ভাগই কেওড়া, বাইন ও সুন্দরী। তা ছাড়া এই সময়টাতে সুন্দরবনের মধুর চাকগুলো পরিণত হওয়া শুরু করেছে। ঝড়ে এসব মধুর চাকের ক্ষতি হতে পারে।

ঝড়ে সুন্দরবনের ক্ষতির বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি একটি সমৃদ্ধ প্রতিবেশব্যবস্থা। এই বনে গাছ কাটার জন্য প্রবেশ করা এবং গাছ কেটে নিয়ে গেলে এর প্রতিবেশব্যবস্থার অপূরণীয় ক্ষতি হবে। প্রাকৃতিকভাবেই ঝড়ের ক্ষতি পোষানোর ক্ষমতা আছে সুন্দরবনের। এটি আগেও তা প্রমাণিত হয়েছে। এই বনে হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন