ভারতের ৩৮ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন রবার্ট সি টিটলার ১৬৯ বছর আগে ঢাকার বিভিন্ন বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যা ১৮৫৪ সালে একটি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ‘ঢাকায় ছিল ময়ূরের অবাধ বিচরণ। ময়ূরের বসবাসের জন্য ঢাকা ছিল একটি আদর্শ জায়গা।’ ব্রিটিশ লেখক এফ বি সিম্পসন ১৮৮৬ সালে লিখেছিলেন, ‘ঢাকার সাভার এলাকায় বনমোরগ ও ময়ূর ছিল মানুষের সহজলভ্য শিকারের পাখি।’

একদা দেশের শালবনজুড়ে জলার ধারে ময়ূরের ছিল অবাধ বিচরণ। অথচ বর্তমানে এগুলো এ দেশে বিলুপ্ত। আমার কর্মস্থল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি) ভাওয়ালের গড়েই অবস্থিত, যেখানে একদা ওরা বিচরণ করত। এখনো ক্যাম্পাসের ভেতরের শালবনে ঢুকে চোখ বন্ধ করে ওদের কল্পনা করি। কিন্তু চোখ খুললেই আর খুঁজে পাই না।

কারণ, গত ১০০ বছরের মধ্যে একবার মাত্র ওদের দেখা মিলেছিল ঢাকার কাছে টাঙ্গাইলের মধুপুর জাতীয় উদ্যানে ১৯৮২ সালে। মানুষের ক্রমবর্ধমান শিকারের নেশা, পোষার জন্য ময়ূর ধরা, কৃষি ও আবাসনের সীমাহীন সম্প্রসারণে বনভূমি উজাড়ের কারণে ওরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তবে ময়ূর এ দেশে বিলুপ্ত হলেও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে ভারতে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে ১৯৬৩ সালে ময়ূরকে ভারতের জাতীয় পাখি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণেই।

ময়ূরের (পুরুষ) দর্শনীয় চেহারা, বিশেষ করে লেজের পেখমের বাহারের জন্য বিশ্বজুড়ে ওরা সুপরিচিত। হিন্দু ও গ্রিক পুরানে ময়ূর এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ময়ূর এ দেশে নীল বা দেশি ময়ূর নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম কমন, ব্লু বা ইন্ডিয়ান পিফাউল। মুরগি গোত্র Phasianidae-এর অন্তর্গত পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Pavo cristatus। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের পক্ষীর তালিকায় বিশ্বব্যাপী ময়ূর স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এ দেশে স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত। সূত্রমতে, পুরো বিশ্বের প্রকৃতিতে বর্তমানে কমবেশি এক লাখ ময়ূর বেঁচে আছে।

এ দেশের বিভিন্ন চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে ময়ূর বেশ সহজেই বংশবৃদ্ধি করছে। আমি এখনো এ দেশের প্রকৃতিতে অনিন্দ্যসুন্দর শিখী বা ময়ূরের প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখি। আর সে লক্ষ্য সামনে রেখেই বশেমুরকৃবির বন্য প্রাণী প্রজনন ও সংরক্ষণ মাঠ গবেষণাগারে ময়ূর নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে কোনো একদিন আবারও প্রকৃতির সৌন্দর্য ময়ূর শালবন বা অন্য কোনো উপযুক্ত অভয়ারণ্য মাতিয়ে তুলবে। তবে এটা সহজ কাজ নয়। এ জন্য সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি দরকার পাখির প্রতি জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসা, ধৈর্য ও সহনশীলতা। প্রকৃতি, বন, বন্য প্রাণী ও পাখি যে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য, এটা বুঝতে হবে সবাইকে।

আ ন ম আমিনুর রহমান, অধ্যাপক, বশেমুরকৃবি, গাজীপুর

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন