default-image

টিলার চূড়ায় প্রথমে টিনশেডের ঘর তৈরি করা হয়। এসব ঘরে বসবাস করতে টিলার ঢাল কেটে চলাচলের রাস্তা বানানো হয়। এরপর ঘরের বাসিন্দারা নানা অজুহাতে কাটেন টিলা। একপর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঘর দেখিয়ে প্রকাশ্যেই চলে টিলা সাবাড়। পরিবেশ আইন ফাঁকি দিতে ঘরের ঘেরাটোপে টিলা সাবাড় করার এই কৌশল ‘টিলাখেকো ঘর’ বলে পরিচিত। 

এবার বাইরে নয়, খোদ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টিলাখেকো ঘর’! কৌশলে চলছে টিলা কাটা। নতুন একটি হল নির্মাণে একটি টিলার ঢাল কাটা হয়েছে। আরেকটি টিলার চূড়ায় চলছে পাকা স্থাপনা তৈরির কাজ। গত শনিবার গিয়ে দেখা গেছে এই চিত্র।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, প্রায় ২৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হল ও শহীদজননী জাহানারা ইমাম হলের মধ্যবর্তী এলাকায় নতুন একটি ছাত্রী হল নির্মাণ হচ্ছে। সেখানে পাশাপাশি কয়েকটি টিলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি টিলার একদিকে টিনের বেড়া। ভেতরে খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর) দিয়ে টিলার ঢাল কেটে পাশের জমিতে ফেলা হয়েছে মাটি। ওই মাটি দিয়ে ছাত্রী হলের জন্য নির্ধারিত অংশের নিচু জায়গা সমান করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশলীদের তদারকিতে নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স সিএফ করপোরেশন’ এ কাজ করছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (২০০০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানার কোনো পাহাড়-টিলা কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ। বৃহত্তর স্বার্থে পাহাড়-টিলা কাটতে হলে আগে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে টিলা বা পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ কাটতে হয়। যোগাযোগ করলে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় সূত্র জানিয়েছে, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ রকম কোনো ছাড়পত্রের আবেদনও করেনি, কোনো ছাড়পত্রও দেওয়া হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ‘ইনচার্জ’ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি দাবি করেন, তাঁরা টিলা কাটছেন না। টিলার নিচের দিকের কিছু অংশ সমান্তরাল করছেন। তিনি বলেন, ‘টিলার চূড়ায় স্থাপনা নির্মাণকাজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রকৌশল বিভাগের নির্দেশনায় হচ্ছে।’
টিলা কাটা হয়নি বলে দাবি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. মতিউর রহমানও। টিলার ঢাল আর টিলার চূড়ায় স্থাপনা নির্মাণ কি টিলা না কেটে হয়েছে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আসলে আমরা নই, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কথা বলবে।’

default-image

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কোনো টিলা কাটা হয়নি। তাঁকে সুনির্দিষ্ট করে দুটি স্থান ও টিলার চূড়ায় স্থাপনা বানানোর বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি, ঠিকাদার নিচের দিকে কিছু মাটি কেটে সমান করেছে। আমি নির্দেশ দিয়েছি কোনো টিলা না কাটতে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর দিকে চা-বাগান হওয়ায় উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিম দিক বেঁকে ছোট-বড় অসংখ্য টিলা রয়েছে। এসব টিলা এলাকায় জনবসতি থাকায় বছরজুড়েই চলে নানা কৌশলে টিলা কাটা। ২০১৬ সালের দিকে প্রথম আলোর সরেজমিন অনুসন্ধানে ‘টিলাখেকো ঘর’ সন্ধান মিলেছিল। এ নিয়ে ওই বছরের ২৪ মে ‘সিলেটে টিলাখেকো ঘর’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের এনফোর্সমেন্ট দপ্তর ‘টিলাখেকো ঘর’ নির্মাণ করায় একটি প্রতিষ্ঠানকে অর্থদণ্ড করে।
এ ঘটনার তিন বছরের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর-পূর্ব দিকে তারাপুর চা-বাগানের টিলাভূমিতে একই তৎপরতা শুরু হয়েছিল। এ নিয়ে গত বছরের ২৬ জুলাই ‘টিলাখেকো ঘর এবার চা-ভূমিতে’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের স্থায়ী বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এরপর থেকে এ তৎপরতায় ভাটা পড়ে।
পরিবেশ আইন ফাঁকি দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে চলা টিলা সাবাড়ের কৌশল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চলায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে টিলা এলাকায় নানা কৌশলে সাবাড় করার বিষয়টি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা উদ্বেগের সঙ্গে আমাদের জানান। এখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই যদি একই কৌশলে টিলা কাটে, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কী রকম বার্তা যাবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।’ তিনি এ ব্যাপারে পরিবেশ আইন বাস্তবায়নে কাজ করা সরকারি ও আইনি সংগঠনগুলোকে কঠোর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

default-image

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরিবেশ আইন ও উচ্চ আদালতের আদেশ একই সঙ্গে অমান্য করেছেন বলে মনে করছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)। গতকাল টিলা কাটা সরেজমিন প্রত্যক্ষ করে বেলা আজ রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে একটি চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছে।
বেলা সিলেট অঞ্চলের সমন্বয়ক শাহ্ সাহেদা আখতার বলেন, ‘পরিবেশ আইন ছাড়াও সিলেট অঞ্চলে পাহাড়-টিলা কাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই সূত্রে বলা যায়, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরিবেশ আইন ভঙ্গ করা ছাড়াও উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে আদালত অবমাননাও করেছেন।’
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছাড়পত্র ছাড়া টিলায় কোনো ধরনের কাজ করা স্পষ্টত পরিবেশ আইন লঙ্ঘন। আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করে পরবর্তী ব্যবস্থা কী নেওয়া যায়, দেখব।’

বিজ্ঞাপন
পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন