'বুলবুলের' প্রভাবে বেড়েছে বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া

বিজ্ঞাপন
default-image

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ঝোড়ো হাওয়া। চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। নদীতে বড় বড় ঢেউ। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট এলাকার পরিস্থিতি এখন এমন। গতকাল শুক্রবার সারা দিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলে শনিবার ভোর থেকে বৃষ্টির গতির বেড়েছে। বইতে শুরু করেছে ঝোড়ো হাওয়া।

সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার লোকজনকে বেলা ১১টার মধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠতে বলা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন দ্বীপ শ্যামনগরের গাবুরা এলাকার মানুষজন সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

শ্যামনগর থেকে মহন কুমার মণ্ডল জানান, চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। দমকা বাতাস বাড়ছে। মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত।

আবদুল হালিম জানান, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ শ্যামনগরের গাবুরা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নিতে বুড়িগোয়ালিনীতে চারটি বাস রাখা রয়েছে। কিন্তু খোলপেটুয়া নদী পার হয়ে কেউ গাবুরা ছেড়ে বুড়িগোয়ালিনীতে আসতে চাচ্ছে না। গাবুরার ডুমুরিয়া আশ্রয়কেন্দ্রে ২০-২৫ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জাকির হোসেন জানান, উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর চাকলা, সুভাদ্রকাটি, হরিশখালী ও হিজলিয়া এলাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের অবস্থা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। নদীর পানি বাড়লে এসব বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর আলিফ রেজা জানান, বেলা ১১টার মধ্যে সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে। এ জন্য মাইকিং করা হয়েছে। ১০৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আগের চেয়ে বৃষ্টি বেড়েছে।

শ্যামনগরের ইউএনও মো. কামরুজ্জামান জানান, গাবুরা ইউনিয়ন থেকে লোক সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কোস্টগার্ডের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস বইছে। ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র এবং ১ হাজার ২০০ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক এস এম হাসান জানান, সুন্দরবনের মধ্যে থেকে সব জেলে–বাওয়ালিকে লোকালয়ে আসার জন্য বলা হয়েছে। বনের ভেতর কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপদে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল জানান, জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

বাগেরহাট : বাগেরহাটে শুক্রবার থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। আজ সকালেও প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে। সকালের দিকে আধা ঘণ্টার মতো বৃষ্টি থামে। পরে আবার শুরু হয়। সঙ্গে মৃদু ঝোড়ো হাওয়া বইছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, এটা সিডরের মতো প্রচণ্ড ঝড়ের লক্ষণ। শরণখোলায় সরকারি হিসাবে সিডরের সময় মারা যায় ৯৩০ জন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ সময় বলেশ্বর নদে প্রচুর ইলিশ মাছ থাকায় বিপৎসংকেত উপেক্ষা করে জেলেরা নৌকা ও ট্রলার নিয়ে বলেশ্বর নদে ইলিশ ধরতে গেছেন।

জেলা প্রশাসক মামুনূর রশীদ বলেন, চারটি উপকূলীয় উপজেলা মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, রামপাল ও মোংলার ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনকে আজ দুপুরের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য কাজ চলছে। সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকিপল্লির জেলেদের সরানোর জন্য র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।

কোস্টগার্ডের পশ্চিম জোনের অপারেশন অফিসার লেফটেন্যান্ট ইমতিয়াজ আলম বলেন, ৫০০ জন জেলেকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হয়েছে। অন্য জেলেদের আনার প্রক্রিয়া চলছে। প্রয়োজনে কোস্টগার্ডের নিজস্ব ক্যাম্পে আশ্রয় দেওয়া হবে।

প্রশাসন বলছে, মোংলা ও শরণখোলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে দিয়ে বুলবুল আঘাত হানতে পারে।

খুলনা : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে ইতিমধ্যে ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেত ঘোষণা করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সারা রাতই খুলনার সব এলাকায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় সকাল থেকে হালকা বাতাস বয়েছে। নদী শান্ত রয়েছে। রাতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে নদীর পানি কিছুটা বেড়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতেও আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হচ্ছে না সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ খুলনার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা এলাকার মানুষ। তাঁদের জোর করে সেখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে স্থানীয় প্রশাসন।
কয়রা উপজেলা নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জাফর রানা প্রথম আলোকে বলেন, শুক্রবার দুপুর থেকেই এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষ ওই ঘোষণা খুব বেশি আমল দেয়নি। সকাল থেকে আবারও সবাইকে বুঝিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। এখন মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া হবে।
ওই এলাকায় ১১৬টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। পর্যাপ্ত শুকনো খাবার প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। ওই উপজেলার অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক ফুট বেড়ে গেলে বাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছে উপজেলা প্রশাসন।
দাকোপ উপজেলার নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বরত শেখ আবদুল কাদের জানান, সারা রাত গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হলেও সকাল থেকে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। কিছু মানুষ রাতেই আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে, তবে বেশির ভাগ মানুষ এখনো তাঁদের বাড়িতেই রয়েছে। ওই মানুষগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে কাজ করছে এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। বানিশান্তা, কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ওই উপজেলায় ৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।

পাইকগাছা উপজেলায় কোনো বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় নেই বলে জানান ওই উপজেলার নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বরত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস। তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য বারবার বলা হচ্ছে কিন্তু তাঁরা তা শুনছেন না। সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন