default-image

কয়েক দশক ধরে তো বটেই, সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ বছরের মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে মনে রাখা জরুরি যে রেমিট্যান্সের পাশাপাশি দেশীয় শ্রমবাজারের উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তির বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমেও আন্তর্জাতিক অভিবাসন আমাদের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রেখে আসছে।

করোনার সময়ে রেমিট্যান্সের এই গতি-প্রকৃতি ইতিবাচক হলেও এর স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রবাহের ক্ষেত্রে বেশ কিছু দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, জুন-জুলাই মাসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির পেছনে ঈদের মতো উৎসব কিছুটা হলেও ভূমিকা রেখেছে আর আমাদের দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ অনেক ক্ষেত্রেই মৌসুমভিত্তিক হয়ে থাকে। প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও আয়ের ক্ষেত্রেও মৌসুমভিত্তিক প্রবাহ আমরা দেখতে পাই। দ্বিতীয়ত, এটা আশঙ্কা করা অমূলক হবে না যে করোনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে প্রবাসী শ্রমিকদের কেউ কেউ কাজ হারিয়েছেন কিংবা কাজ হারানোর আশঙ্কায় আছেন এবং তাঁরা তাঁদের সঞ্চয় দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এ ছাড়া দেশে পরিবারকে আয়ের সংকট থেকে রক্ষা করতে প্রবাসীরা তাঁদের সীমিত আয়ের সিংহভাগই হয়তো দেশে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, যা স্বাভাবিক সময়ে সঞ্চয় কিংবা নিজস্ব খরচের জন্য ব্যবহৃত হতো। তৃতীয়ত, করোনার ফলে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর জটিলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা কিছুটা কমে যাওয়ার ফলে বৈধ পথে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়েছে। এ ছাড়া গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা চলতি বাজেটেও বলবৎ থাকায় তা রেমিট্যান্সের প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, রেমিট্যান্সের এই ঊর্ধ্বগতি কত দূর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে? এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, কোভিড-১৯–এর কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রেমিট্যান্স ২৬ শতাংশের মতো কমে যেতে পারে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের নিম্নগতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে শ্রমিকের চাহিদা কমে যেতে পারে। এ ছাড়া করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান আবার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে একদিক থেকে দেশে ছুটিতে এসে আটকে পড়া বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের ফিরে যাওয়া যেমন জটিল হয়ে পড়েছে, তেমনি প্রবাসের শ্রমবাজারে বিদেশিদের কর্মসংস্থানও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বিদেশি শ্রমিকদের কাজের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ ও কোটা আরোপ করা হয়েছে, যা আমাদের অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা স্বল্প দক্ষ হওয়ার কারণে এ ধরনের বিধিনিষেধের কারণে তাঁদের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি। প্রবাসে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হলে একদিকে যেমন দেশীয় শ্রমবাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে, অন্যদিকে বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়নের অগ্রগতি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কোভিডের সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েকটি ধাপে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফিরে আসা প্রবাসীদের জন্য ২০০ কোটি টাকার ফান্ড, প্রবাসে বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের জন্য ২০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা, ফিরে আসা অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ ইত্যাদি। এ ছাড়া চলতি বাজেটে প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসা প্রবাসী ছাড়াও বিদেশে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী ও তাঁদের পরিবার এবং বিদেশে নতুন করে যেতে আগ্রহী (ও দেশে ছুটিতে এসে আটকে পড়া প্রবাসী), মূলত এই তিন ধরনের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। সার্বিকভাবে ফিরে আসা প্রবাসীদের দেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন আর্থিক প্রণোদনা, অন্যদিকে বর্তমানে যাঁরা দেশের বাইরে আছেন, তাঁদের কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগের দরকার রয়েছে। এ ছাড়া বিদেশে যাঁরা যেতে আগ্রহী ও যাঁরা ফেরত যেতে চান, তাঁদের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা মূল চ্যালেঞ্জ।

default-image

ফিরে আসা প্রবাসীদের কর্মসংস্থানের জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা মূলত ব্যাংকিং চ্যানেল ও শর্তভিত্তিক ঋণ হওয়ার কারণে অনেকেই এর সুবিধা নিতে পারছেন না। প্রণোদনার অর্থ ছাড়ে জটিলতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যাংকের যেমন ঋণের শর্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, তেমনি অভিবাসীদের জন্য সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোও জরুরি। তবে ঋণসুবিধার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগের তথ্যসহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করারও প্রয়োজন রয়েছে। স্বনিয়োজিত কাজ ছাড়া, ফেরত আসা প্রবাসীদের দক্ষতা দেশীয় বাজারে কাজে লাগানোর জন্য বিএমইটি ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের জন্য প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জরুরি ভিত্তিতে নগদ সহায়তার ব্যবস্থা প্রশংসনীয় হলেও প্রয়োজনের তুলনায় এ বরাদ্দ অত্যন্ত অপ্রতুল। বরাদ্দ বাড়াতে তাই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রবাসীকল্যাণ তহবিলের অর্থের ক্ষেত্রে অভিবাসীদের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের সরাসরি আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বায়রাকে দ্রুত নির্দেশনার মাধ্যমে যেসব অভিবাসী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, তাঁদের তালিকা তৈরি করে সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারে। বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত বিমান ফ্লাইটের ব্যবস্থাসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভিসা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাঁদের জন্য নির্ভরযোগ্য টেস্টের ব্যবস্থা থাকাও দরকার।

সার্বিকভাবে বলা যেতে পারে, কোভিডের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে হলে অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জরুরি দেশে ফেরত আসা অভিবাসীদের দেশীয় অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করা। রেমিট্যান্সের প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হলে বৈধ পথে যাতে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হন, সে জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। এ ছাড়া দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের আবার ফেরত পাঠাতে এবং প্রবাসে থাকা অভিবাসীদের দেশে ফেরত পাঠানো বন্ধ করতে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই। তবে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কোভিড–পূর্ববর্তী সময়েও হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো, অবৈধ পথে বিদেশে যেতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়া, নারী অভিবাসীদের নির্যাতন, প্রবাসে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার মতো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল, যার নিরসন না হওয়া পর্যন্ত অভিবাসীদের সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। উল্লেখ্য যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি হওয়া সত্ত্বেও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক কিংবা আমলাতান্ত্রিক সক্ষমতা বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল, যা এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কারের অন্তরায়। এ ছাড়া সার্বিকভাবে আমাদের অভিবাসীরা স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায়, যেকোনো ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাত তাঁদের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। তাই মধ্যম বা দীর্ঘ মেয়াদে অভিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা করতে হলে মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার অভিবাসীদের বিদেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0