default-image

গত দুই-তিন মাস ধরে ধীরে ধীরে সবকিছু খুলে দেওয়া হচ্ছে। দেশের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এখন খুলেছে। ফলে মানুষ কাজে ফিরেছেন। আর করোনার মধ্যে কৃষি খাত তো খোলাই ছিল। সবকিছু খুলে দেওয়ায় মানুষের মধ্যে একধরনের স্বস্তি এসেছে।

অনানুষ্ঠানিক খাতের দোকানপাট, হাটবাজার, চায়ের দোকান, রাস্তাঘাট সব সচল হওয়ায় বেকার বসে থাকার হার কমেছে। কিন্তু করোনার আগে যে আয় তাঁরা করতেন, এখন আর সেই আয় করতে পারছেন না।
করোনার আগে একজন রিকশাচালক প্রতিদিন গড়ে এক হাজার টাকা রোজগার করতেন। এখন তাঁর আয় দৈনিক বড়জোর ৪০০-৫০০ টাকা। একজন চায়ের দোকানদার সারা দিন ঠিকই দোকান খোলা রেখেছেন। তবে বেচাকেনা আগের মতো হচ্ছে না। এবার আসি উৎপাদন খাতের দিকে। চাহিদা না থাকায় করোনার পূর্ববর্তী উৎপাদনেও ফেরা সম্ভব হচ্ছে না। সার্বিকভাবে সক্ষমতার ৫০–৭০ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতে করোনার আগে যেমন উৎপাদন হতো, সেই পরিমাণ উৎপাদন এখন হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু এই ঘুরে দাঁড়ানো কতটা টেকসই হবে? এই মুহূর্তে এটা বলা যাচ্ছে না। এমনিতে আয় ও উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরে যায়নি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অনিশ্চয়তা আছে। ইউরোপ-আমেরিকায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেখানে আবার করোনা শনাক্তের হার বাড়ছে।

বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির বড় শক্তি রপ্তানি। কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলে সেখানে অর্থনৈতিক মন্দা গভীরতর হতে পারে। আমরা জানি, স্প্যানিশ ফ্লুর দ্বিতীয় ঢেউ প্রথমটির চেয়ে বেশি জোরদার ছিল। করোনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রণোদনা দিয়েছিল, সেটি শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান কোম্পানিগুলো এখন তাদের অনেক কর্মীকে বেতন দিচ্ছে না, তবে চাকরি বহাল রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কারণে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এলে নতুন করে প্রণোদনা দিতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে।

পুরোনো গরিবদের পাশাপাশি নতুন গরিবদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে তাঁদের হাতে নগদ টাকা যাবে।
জাহিদ হোসেন

অন্যদিকে, আগামী ডিসেম্বর মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর প্রণোদনার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আবার করোনার প্রকোপ বাড়লে নতুন করে প্রণোদনা দেওয়া না হলে ওই দেশে মন্দার গভীরতা বাড়বে। ফলে ওই দেশের নাগরিকদের চাহিদা কমে গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার আগেই তৈরি পোশাকের যে অর্ডার এসেছে, তা দ্রুত সরবরাহ করা উচিত। এ জন্য লিড টাইম কমানোর জন্য সরকারকে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরে গতি আনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। ৯০ দিনের মধ্যে পণ্য জাহাজে ওঠার সময় থাকলেও ৪০-৫০ দিনের মধ্যে এই কাজ করতে পারলে ক্ষতি নেই। পোশাকের চালান অন্তত দ্রুত জাহাজে ওঠাতে পারলে ইউরোপ-আমেরিকায় আবার করোনার প্রকোপ বাড়লেও অর্ডার বাতিল বা স্থগিত করতে পারবেন না বিদেশি ক্রেতারা।

অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙা রাখতে হলে প্রথমেই স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ যদি স্বাস্থ্যসুরক্ষার প্রটোকল মেনে মাস্ক পরেন ও হাত জীবাণুমুক্ত রাখেন, তাহলে নতুন স্বাভাবিক জীবন চালু করা সম্ভব হবে। তখন সবকিছু চালু হলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি হবে। এ ছাড়া পুরোনো গরিবদের পাশাপাশি নতুন গরিবদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করা উচিত। এতে তাঁদের হাতে নগদ টাকা যাবে। অর্থনীতি চাঙা হবে।

জাহিদ হোসেন: বিশ্বব্যাংকে ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0