মোবাইল মাধ্যমে অর্থ লেনদেন
মোবাইল মাধ্যমে অর্থ লেনদেনছবি। প্রথম আলো

অর্থ আদান–প্রদানে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলো। শহুরে শিক্ষিত সমাজের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে হাতের মুঠোয় ছড়িয়ে পড়েছে এই সেবা। তবে অর্থ উত্তোলনের অতিমাশুল নিয়ে আপত্তি রয়েছে গ্রাহকদের।

কারণ, ব্যাংকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত পাঠাতে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা খরচ হয়। আর এসব সেবায় প্রতি হাজার উত্তোলনে ১৮ টাকার বেশি খরচ দিতে হয়। ফলে মোবাইলের মাধ্যমে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন দিনে দিনে কমে আসছে।

গ্রাহকদের এই আপত্তি মোকাবিলায় সাড়া দিয়েছে ডাক বিভাগের সেবা ‘নগদ’। প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার টাকা অর্থ উত্তোলনে অ্যাপসের মাধ্যমে ভ্যাটসহ মাশুল ১১ টাকা ৪৯ পয়সা এবং অ্যাপস ছাড়া প্রতি হাজার উত্তোলনে ভ্যাটসহ ১৪ টাকা ৯৪ পয়সায় নামিয়ে এনেছে। কার্যক্রম শুরুর আড়াই বছরের মাথায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে নগদ।

বিজ্ঞাপন
ব্যাংকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত পাঠাতে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা খরচ হয়। আর মোবাইলের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনে প্রতি হাজারে ১৮ টাকার বেশি খরচ দিতে হয়। অর্থ উত্তোলনে খরচ কমাল নগদ, তাহলে কী ভাবছে বিকাশ, রকেট?

তবে এখনো বিকাশ, রকেটসহ অন্য সেবাদাতারা অর্থ উত্তোলনে মাশুল কমায়নি। প্রতিষ্ঠান দুটি কার্যক্রম শুরুর প্রায় এক দশক অতিক্রম করেছে। শুরু থেকেই প্রতি হাজার টাকা উত্তোলনে ১৮ টাকার বেশি মাশুল নিচ্ছে। তবে নগদ মাশুল কমানোয় কিছুটা চাপে পড়েছে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো।

জানা যায়, ২০১১ সালের মার্চে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করে। ২০১৬ সালে এ সেবার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রকেট’। দেশে ডাচ্-বাংলাই প্রথম ব্যাংক, যার হাত ধরে এমএফএস সেবা চালু হয়। বর্তমানে দেশের মোবাইল ব্যাংকিং সেবার ২০ শতাংশের বেশি রকেটের। রকেট সেবায় এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলনে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা খরচ দিতে হচ্ছে।

খরচের বিষয়ে জানতে চাইলে রকেট সেবাদাতা ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রকেট সেবার খরচ কমাতে পারলে আমারও ভালো লাগবে। তবে আগে বিকাশকে কমাতে হবে। তারা না কমালে আমরা এখনই কমাতে পারব না। কমালে এজেন্টরা আমাদের সেবা দেবে না। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাশুল নির্দিষ্ট করে দেয়। এর সুফল তখন সবাই পাবে। টাকা উত্তোলনে যে মাশুল কাটা হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই এজেন্টরা পায়।’

default-image

দেশের সবচেয়ে বড় সেবাদাতা ব্র্যাক ব্যাংকের ‘বিকাশ’। ২০১১ সালে কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। বিকাশে এজেন্ট থেকে নগদ উত্তোলনে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা গুনতে হচ্ছে।

কেন অর্থ উত্তোলনে মাশুল কমছে না, এ নিয়ে যোগাযোগ করা হয় বিকাশের সঙ্গে। বিকাশের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার প্রথম আলোকে লিখিতভাবে জানান, ‘সেবার মান ও পরিচালন ব্যয়ের ভিত্তিতে টেকসই সেবা নিশ্চিত করতেই খরচ হিসাব করে সেবার মাশুল নির্ধারণ হয়। দেশের সব প্রান্তে গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ মানের টেকসই সেবা নিশ্চিত করতে এজেন্ট, পরিবেশক চ্যানেল, মোবাইল অপারেটর, সরকারি ভ্যাট ও ট্যাক্স এবং বিকাশের এই মাশুল ভাগাভাগি হয়। এজেন্টদের টেকসই ব্যবসার মাধ্যমে টিকিয়ে রেখে গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতেই মাশুলের বড় অংশটি তাদের জন্য রাখা হয়েছে।’

ফলে ঠিক কত দিনে মাশুল কমে আসবে, তা অনিশ্চিত। এদিকে ডাক বিভাগ ও থার্ড ওয়েভ টেকনোলজির সেবা নগদ সম্প্রতি অর্থ উত্তোলনে মাশুল কমিয়ে নিয়ে এসেছে। দেশে বর্তমানে নগদের গ্রাহকসংখ্যা ২ কোটি ১৯ লাখ। ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ কার্যক্রম শুরু করে নগদ।

বিজ্ঞাপন
গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোবাইলে আর্থিক সেবার আওতায় নিবন্ধিত গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৪৮ জন। সেপ্টেম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন হয়েছে ৪৯ হাজার ১২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

জানতে চাইলে নগদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, ‘আগে মাশুলের ৭০ শতাংশ এজেন্ট ও পরিবেশকেরা নিত। এখন তা ৯০ শতাংশ করা হয়েছে। আর অর্থ উত্তোলনে মাশুল ৯ টাকা ৯৯ পয়সা করায় লেনদেন অনেকে বেড়ে গেছে। এতে এজেন্টদের আয়ও অনেক বেড়ে গেছে। তাই মাশুল কমানোয় এজেন্টরা খুশিই হয়েছে।’ তানভীর আহমেদ বলেন, ‘নগদের এজেন্ট হতে কল সেন্টারে প্রতিদিন আড়াই হাজার আবেদন আসছে। ডাক বিভাগের অনুমোদন লাগে, তাই ২০-২৫টির বেশি অনুমোদন দেওয়া যাচ্ছে না।’

এদিকে খরচ কীভাবে কমানো যায়, এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেই খরচ কমানোর কৌশল জানতে চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেবে। জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরাও মনে করি, অনেক বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নিয়ে কাজ করছে।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব সেবার আওতায় নিবন্ধিত গ্রাহকসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৪৮ জন। সেপ্টেম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন হয়েছে ৪৯ হাজার ১২১ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

মন্তব্য পড়ুন 0