default-image

ডিলার লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রায় ২৫ হাজার গ্রাম বা ২ হাজার ১৪৩ ভরি সোনা বৈধভাবে আমদানি করে দুটি প্রতিষ্ঠান। তারপর গত তিন মাসে নতুন করে কোনো প্রতিষ্ঠান সোনা আমদানি করতে পারেনি। ছয়টি প্রতিষ্ঠান আমদানির জন্য অনাপত্তিপত্র চেয়ে আবেদন করে রেখেছে। তবে অনুমতি দিতে সময়ক্ষেপণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৈধভাবে আমদানি না হওয়ায় ভরিতে অন্তত আড়াই হাজার টাকা বেশি দিয়ে সোনার অলংকার কিনতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের। যে উদ্দেশ্যে আমদানির জন্য ডিলার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, সেটি সফল হচ্ছে না। তাতে দেশজুড়ে জুয়েলারি ব্যবসাকে পুরোপুরি স্বচ্ছ করার উদ্যোগটিও অনেকটা আটকে গেছে।

জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে দেশের বাজারে সোনার দাম অত্যধিক বেড়েছে। অন্যদিকে নানা অজুহাতে সোনা আমদানির অনুমতি দিতে বিলম্ব করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈধভাবে পর্যাপ্ত আমদানি হলে বর্তমানের চেয়ে প্রতি ভরি সোনার দাম অন্তত আড়াই হাজার কম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

বর্তমানে দেশের বাজারে প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেট সোনার অলংকারের দাম ৭৬ হাজার ৩৪১ টাকা। গত ৬ আগস্ট আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ২ হাজার ৭০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তখন প্রতি ভরির দাম গিয়ে ৭৭ হাজার ২১৬ টাকায় দাঁড়ায়। সেটিই ছিল দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম। আড়াই মাস পর বর্তমানে যে দামে সোনা বিক্রি হচ্ছে, সেটিও তৃতীয় সর্বোচ্চ।

দেশে বছরে ২০-৪০ মেট্রিক টন সোনার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ পুরোনো সোনার অলংকার গলিয়ে সংগ্রহ করা হয়। চাহিদার বাকি ৯০ শতাংশ সোনা এত দিন ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে আসে। বৈধভাবে আমদানির জন্য ডিলার লাইসেন্স দেওয়ার পরও সেই অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। উল্টো ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে হঠাৎ করেই সোনা আসা বেড়ে গেছে। চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ৯৫০টি সোনার বার এনেছেন প্রবাসীরা।

বিজ্ঞাপন
বৈধভাবে আমদানি না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশে সোনার দাম ভরিতে সব সময়েই ৩-৪ হাজার টাকা বেশি থাকে। সে কারণে অল্প কিছু মুনাফার জন্য সোনার বার নিয়ে আসেন প্রবাসীরা।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বৈধভাবে আমদানি না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশে সোনার দাম ভরিতে সব সময়েই ৩-৪ হাজার টাকা বেশি থাকে। সে কারণে অল্প কিছু মুনাফার জন্য সোনার বার নিয়ে আসেন প্রবাসীরা। তবে তাঁদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে শিল্পটি সামনে এগোতে পারবে না। কোনো প্রকার স্বচ্ছতাও আসবে না। তাই বৈধভাবে সোনা আমদানি সহজ করা দরকার। সেটি হলে সোনা চোরাচালানও অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে।

করোনাভাইরাসের প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার উত্তেজনা, বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার দুর্বল হয়ে পড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনা কেনায় ঝুঁকছেন। এভাবে চাহিদা যত বাড়ছে, সোনা-রুপার দামের পালেও তত হাওয়া লাগছে।

অবশ্য বিদেশে মূল্য বৃদ্ধি পেলেই যে শুধু দেশে দাম বাড়ে, তা নয়। অন্য অজুহাতেও দেশের সোনার দাম বাড়িয়ে দেয় জুয়েলার্স সমিতি। করোনাজনিত লকডাউনে আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে সোনা আসা বন্ধ হয়ে যায়। তখন বিশ্ববাজারেও দাম বাড়তে থাকে। এই দুই কারণ দেখিয়ে গত ২৩ জুন সোনার দাম এক লাফে ভরিতে ৫ হাজার ৮২৫ টাকা বৃদ্ধি করেছিল সমিতি। আবার বর্তমানে ব্যাগেজ রুলসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সোনা এলেও দাম কমায়নি তারা। উল্টো গত বৃহস্পতিবার ভরিতে ২ হাজার ৩৩৩ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

কমোডিটি এক্সচেঞ্জ মার্কেটে গতকাল বিশুদ্ধ বা ২৪ ক্যারেট প্রতি আউন্স সোনার দর ছিল ১ হাজার ৯০১ ডলার। তার মানে প্রতি ভরি ৭১২ ডলার ৮৮ সেন্ট। দেশি মুদ্রায় যা দাঁড়ায় ৬০ হাজার ৫৯৫ টাকা (প্রতি ডলার = ৮০ টাকা ধরে)। ২৪ ক্যারেট সোনার বারে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা পাওয়া যায়। আর ২২ ক্যারেটে ৯১ দশমিক ৬০ শতাংশ। সেই হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ২২ ক্যারেট সোনার দাম হবে ভরি প্রতি ৫৫ হাজার ৫০৫ টাকা। তবে দেশে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে সোনা বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি এনামুল হক বলেন, বৈধভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণ আমদানি হলে রাতারাতি সোনার দাম ভরিতে আড়াই হাজার টাকা কমানো সম্ভব।

শুল্ক বেশি থাকায় লাইসেন্স পাওয়ার পরও ছয় মাস সোনা আমদানি করেননি ব্যবসায়ীরা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ২০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা হয়। প্রতি ভরি সোনা আমদানিতে বর্তমানে ২ হাজার টাকা সম্পূরক শুল্ক দিতে হয়। ব্যাগেজ রুলসেও একই শুল্ক লাগে।

বৈধ আমদানি কার্যত বন্ধ

২০১৭ সালে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় প্রধান আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে শাফাত আহমেদ গ্রেপ্তার হন। পরে দিলদার আহমেদের অবৈধ সম্পদ খুঁজতে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ। এ সময় বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় সাড়ে ১৩ মণ সোনার অলংকার ও ৪২৭ গ্রাম ডায়মন্ড জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের জিম্মায় দেন গোয়েন্দারা। এরপরই স্বর্ণ নীতিমালার বিষয়টি জোরেশোরে আলোচনায় আসে। পরের বছরের নভেম্বরে নীতিমালা চূড়ান্ত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তারপর গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ ১৮টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়। পরে আরও একটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পায়।

শুল্ক বেশি থাকায় লাইসেন্স পাওয়ার পরও ছয় মাস সোনা আমদানি করেননি ব্যবসায়ীরা। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ২০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা হয়। প্রতি ভরি সোনা আমদানিতে বর্তমানে ২ হাজার টাকা সম্পূরক শুল্ক দিতে হয়। ব্যাগেজ রুলসেও একই শুল্ক লাগে। শুল্ক কমানোর পর ১০ জুন ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ১১ হাজার গ্রাম সোনা আমদানির জন্য আবেদন করে। দ্রুত সময়ের মধ্যে অনাপত্তিও দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। দুবাই থেকে ৩০ জুন সোনার বার আমদানি করে নিয়ে আসে প্রতিষ্ঠানটি। পরে অরোসা গোল্ড করপোরেশন ১৫ হাজার গ্রাম সোনা আমদানি করে।

প্রথম চালান আনার পরপরই ২০ হাজার গ্রাম বা ১ হাজার ৭১৪ ভরি সোনা আমদানির জন্য ঢাকা ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড। সেই আবেদনের ২০ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি হওয়া সোনার মান যাচাইয়ে জাহাজীকরণের আগে ও পরে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চায়। ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড সেসবের জবাব দিলেও অনাপত্তি পায়নি।

বিজ্ঞাপন
নানাভাবে সোনা আমদানি প্রক্রিয়া বিলম্ব করা হচ্ছে। একেক সময় একেকটা বিষয় জানতে চাওয়া হচ্ছে। স্বর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে অনুমতি দেওয়ার বিধান থাকলেও সেটি করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক
ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা

এদিকে গত ৩ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সোনা আমদানির ক্ষেত্রে জাহাজীকরণের প্রাক্কালে সরবরাহকারী প্রান্তে ও দেশে আসার পর পণ্যের মান যাচাইয়ে সঠিক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার বিষয়ে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। গতকাল পর্যন্ত সেই মতামত চূড়ান্ত করেনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, নানাভাবে সোনা আমদানি প্রক্রিয়া বিলম্ব করা হচ্ছে। একেক সময় একেকটা বিষয় জানতে চাওয়া হচ্ছে। স্বর্ণ নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে অনুমতি দেওয়ার বিধান থাকলেও সেটি করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের পাশাপাশি জুয়েলারি হাউস, রতনা গোল্ড কর্নার, জড়োয়া হাউজ, রিয়া জুয়েলার্স ও বিডিইএক্স গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ড সোনা আমদানির জন্য আবেদন করেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানকে সোনা আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমদানি পর্যায়ের সোনার মান যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। যাচাই প্রক্রিয়া কীভাবে করা হবে, তা জানতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা মতামত দিলেই আমরা নতুন আমদানির অনুমতি দেব।’

সোনার চাহিদার বড় অংশ বিদেশফেরত প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে ব্যাগেজ রুলসের আওতায় আসা সোনার বার ও পুরোনো অলংকার গলিয়ে সংগ্রহ করা হয়। সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা তাঁদের মজুত সোনার কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেন না। জুয়েলারি ব্যবসায় এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বৈধভাবে আমদানি বিলম্ব হওয়ায় জুয়েলারি ব্যবসা যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

মন্তব্য পড়ুন 0