গত জুলাই-জানুয়ারি সাত মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে আমদানি বিল পরিশোধে ৪৬% বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে।

বেশ কিছু পণ্যের ট্যারিফ মূল্য অনেক কম ছিল। যেমন খেজুর, ফল, কম্বল, সুতা, পলিপ্রোপাইলিন ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যাচাই-বাছাই করে এসব পণ্যের ট্যারিফ মূল্য বাড়ানো হয়। বাড়তি ট্যারিফ মূল্যেই এখন শুল্ক-কর আদায় করা হচ্ছে।

এসব কারণে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর আদায়ের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অর্থবছরের প্রথম আট মাস জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে আগের ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর আদায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বা ২৩ শতাংশ বেড়েছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে শুল্ক-কর্মকর্তারা জানান।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আমদানি পর্যায়ে সাধারণত আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট আদায় করে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য অগ্রিম আয়কর আদায় করা হয়। এসব শুল্ক-কর ও ভ্যাট নির্ধারিত হয় আমদানি মূল্যের ওপর। আমদানি মূল্য যত বেশি হবে, শুল্ক-করও তত বেশি পাওয়া যাবে।

দেশে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়েই আমদানি পর্যায়ের শুল্ক-করের ৭০ শতাংশের মতো আদায় হয়। এ সম্পর্কে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কমিশনার ফখরুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, মূলত তিনটি কারণে এবার আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর আদায় বেড়েছে। প্রথমত আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায়। দ্বিতীয়ত ট্যারিফ মূল্য পুনর্বিন্যাস করায়। তৃতীয়ত, এত দিন ধরে যে কয়েকটি পণ্যের এইচএস কোড সঠিক ছিল না, সেগুলোতে তা ঠিক করে দেওয়ায় শুল্ক বেড়েছে। সব মিলিয়ে শুল্ক-কর বেশি আদায় হয়েছে।

ফখরুল আলম আরও বলেন, গত জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের মাধ্যমে শুল্ক-কর আদায়ে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশে আমদানির পরিমাণ খুব বেশি বাড়েনি। কিন্তু বেশির ভাগ পণ্য বাড়তি দরে আমদানি করতে হয়েছে বলে আমদানি বিল পরিশোধের পরিমাণ বেশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাই-জানুয়ারি সময়ে আমদানিবাবদ আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বা ৪৬ শতাংশ বেশি অর্থ খরচ হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১৪ কোটি টাকার মতো (প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ধরে)।

আমদানি পর্যায়ে শুল্ক বেড়েছে ২৩%

কোভিডের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি শ্লথ হওয়ায় এনবিআরের রাজস্ব আহরণের পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর আদায় বেশ বৃদ্ধি পায়। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর আদায়ে সব মিলিয়ে ২৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা মূসক বা ভ্যাট ও আয়করের চেয়ে অনেক বেশি।

গত দুই দশকে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর আদায়ে এত প্রবৃদ্ধি হয়নি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে একবার আমদানি পর্যায়ে শুল্ক-কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে উঠেছিল। পরবর্তী পাঁচ বছরে প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরেই ছিল। এবার তা এক লাফে ২৩ শতাংশে পৌঁছাল। এবার আলোচ্য সময়ে আমদানি পর্যায়ে ৫৬ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকার শুল্ক-কর আদায় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা বেশি।

এবার দেখা যাক, কোন খাতে কেমন প্রবৃদ্ধি হলো। চলতি অর্থবছরে আমদানি শুল্ক আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত আট মাসে ২২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। এই আদায় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি আমদানি শুল্ক আদায় হয়েছে। এবারে পুরো অর্থবছরের জন্য মূসক বা ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ৪৫ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। জুলাই-ফেব্রুয়ারি আট মাসে আদায় হয়েছে ২৮ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এই খাতে প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশের বেশি। অন্যদিকে একই সময়ে সম্পূরক শুল্ক আদায় হয়েছে ৬ হাজার ১১১ কোটি টাকা। তাতে প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশের বেশি। এ বছর সম্পূরক শুল্ক আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১২ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা।

আমদানি বিল পরিশোধ

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৬ শতাংশ বেশি আমদানি বিল পরিশোধ করতে হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, এই সময়ে সব মিলিয়ে ৫ হাজার ৪৫ কোটি ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশকে আমদানি বিল বাবদ সবচেয়ে বেশি দাম পরিশোধ করতে হয়েছে জ্বালানি তেল, ভোগ্যপণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামালের জন্য। এসব পণ্যের আমদানির পরিমাণ খুব বেশি বাড়েনি বলে জানা গেছে। কিন্তু গত জুলাই-জানুয়ারি সময়ে এসব পণ্যের আমদানিবাবদ ৫০ শতাংশের বেশি অর্থ খরচ করতে হয়েছে। যেমন জ্বালানি তেল আমদানিতে গত বছরের একই সময়ে মাত্র ২৪০ কোটি ডলারের বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৬ কোটি টাকা। খরচ বেড়েছে ৮৬ শতাংশ।

এসব নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমদানি খরচ এতটা বেড়ে গেলে চাপ সহ্য করা কঠিন হবে। আগামী কয়েক মাসে আমদানি খরচ আরও বাড়বে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও ফুরাতে থাকবে।’

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন