আইপিডিসি নতুন অনেক আর্থিক সেবার পথিকৃৎ। কোন খাতে ঋণ বেশি যাচ্ছে, নতুন কী সেবা আসছে।

মমিনুল ইসলাম: এখন ঋণের ৫০ শতাংশ করপোরেট খাতে, ২৭ শতাংশ এসএমই খাতে ও রিটেইল খাতে ২৩ শতাংশ যাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে করপোরেট ঋণের হার কমে ২৫ শতাংশে নেমে আসবে। বাকি দুটো খাতেই ঋণ বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এসএমই ও রিটেইলের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) ঋণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রযুক্তির ব্যবহার করে বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে এক হয়ে আমরা এই ঋণ দিচ্ছি। এর ফলে খরচ কমছে ও ঋণ আদায় ভালো হচ্ছে।

ব্লক চেইনভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘অর্জন’-এ আগামী ৫ বছরে ১০ লাখ গ্রাহক যুক্ত হবেন। যাঁরা মূলত সরবরাহকারী ও পরিবেশক। এতে ইতিমধ্যে ২ হাজার ২০০ গ্রাহক যুক্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আমরা এই প্ল্যাটফর্ম উন্মুক্ত করে দেব। অন্যরাও এই গ্রাহক তথ্য ব্যবহার করে ঋণ দিতে পারবেন। এর বিনিময়ে আমার তাঁদের কাছ থেকে কমিশন নেব।

আইপিডিসির ‘ডানা’ নামক সেবায় যুক্ত হবে ১০ লাখ ছোট দোকানের মালিক ও ব্যবসায়ী। ইতিমধ্যে ১৩ হাজার যুক্ত হয়ে এই ঋণ নিয়েছেন। আইপিডিসি ‘ইজি’র মাধ্যমে টিভি, ফ্রিজ কিনতে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য কোনো সুদ বা সেবা মাশুল নেওয়া হচ্ছে না। আমরা বিক্রেতাদের থেকে কিছু কমিশন নেব। শিগগির বিভিন্ন শোরুম থেকে এই ঋণ পাওয়া যাবে। আগামী মার্চ থেকে গ্রাহকেরা ইজি অ্যাপস থেকে নিজেরাই ঋণ নিতে পারবেন, যা পুরো দেশে নতুন এক ধারার সৃষ্টি করবে।

সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে কারা কারা যুক্ত হলো?

মমিনুল ইসলাম: একটি বড় করপোরেট কোম্পানিতে যারা পণ্য সরবরাহ করছে, আমরা তাদের ঋণ দিচ্ছি। ওই বড় কোম্পানি আমাদের টাকা পরিশোধের পর বাকিটা সরবরাহকারী পাচ্ছে। এর ফলে এসব ঋণে ঝুঁকিও কম, খরচও তেমন নেই। একইভাবে আমরা পরিবেশকদেরও অর্থায়ন করছি। এর মাধ্যমে এখন পর্যন্ত আমরা গ্রামীণফোন, প্রাণ-আরএফএল, এসিআই, এসিআই গোদরেজ, বিকাশ, আড়ং, বার্জার, বিএটি, ইউনিলিভার, সিপিসহ আরও বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছি। বাটা ও অ্যাপেক্সের জুতা সরবরাহ করে এমন উৎপাদকদেরও আমরা ঋণ দিচ্ছি।

সারা দেশে নেটওয়ার্ক না থাকলেও আইপিডিসির গ্রাহক ছড়িয়ে রয়েছে সারা দেশে। এটা কীভাবে সম্ভব হলো?

মমিনুল ইসলাম: আইপিডিসির লক্ষ্য তরুণ, ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা। পাশাপাশি ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে স্বল্প আয়ের মানুষদের বাড়ি তথা গৃহঋণ দেওয়া। আমাদের আমানত গ্রাহকদের এখন ৩৭ ভাগ নারী। আর ঋণের ক্ষেত্রে নারী গ্রাহক ১৮ ভাগ, যদিও দেশে এসএমই খাতের মাত্র ৩ শতাংশ নারী। এ জন্য আমরা এসএমই খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্য টাকার ভিত্তিতে নির্ধারণ না করে কতজন নারীকে ঋণ দিতে পারছি, তার ভিত্তিতে নির্ধারণ করেছি। আমরা যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছি, তখন একসঙ্গে অনেককে গ্রাহক হিসেবে পাচ্ছি। এর ফলে ঢাকায় বসেও আমরা সারা দেশে গ্রাহক তৈরি করতে পারছি।

আমরা বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বই কিনতেও ঋণ দিয়েছি। এসব উদ্যোগ আমাদের মানুষের কাছে নিয়ে গেছে। এভাবে আমরা দেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও সমাজ উন্নয়নে মানুষের পাশে আছি। আমরা গ্রাহককে কাছে টানার একটা পরিবেশ তৈরি করেছি। ফলে সহজেই গ্রাহকেরা যুক্ত হচ্ছেন।

এখন আমাদের ঋণ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালেও ছিল ৬৩০ কোটি টাকা। এখন আমানত ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল ৩৭০ কোটি টাকা। গত ৬ বছরে আমাদের যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, দেশের আর কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এত প্রবৃদ্ধি হয়নি। আমাদের আমানতের ৬৭ শতাংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, ৩৩ শতাংশ সাধারণ নাগরিকের। মোট আমানতকারী প্রায় ১২ হাজার।

দেশে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এর প্রভাব পড়ছে পুরো খাতের ওপর। এর সমাধান কীভাবে হবে?

মমিনুল ইসলাম: দেশে শক্তিশালী ব্যাংকের পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকও আছে। তবে দুর্বল ব্যাংকের কারণে ভালো ব্যাংকের দোষ হচ্ছে না। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও একই অবস্থা। কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রীতিমতো ডাকাতি হয়েছে। কিন্তু দোষ চলে এসেছে পুরো খাতের ওপর। এই সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে যে সহায়তা প্রয়োজন ছিল, তা কিন্তু দেওয়া হয়নি। এর ফলে ছোট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপদে পড়ে গেছে। ব্যাংকগুলো টাকা তুলে নিচ্ছে, গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে সমস্যায় পড়েছে। তবে আইপিডিসি, আইডিএলসি, লঙ্কাবাংলা, ডিবিএইচ, ইউনাইটেড ফাইন্যান্সের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ায় তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। ২০১৯ সালে সার্বিকভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে আমানত কমলেও আমাদের কিন্তু ৫১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

অনেকের মধ্যে ধারণা হয়েছে, ব্যাংক থাকতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেন প্রয়োজন। বাস্তবতা হলো, ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করতে পারবে না, আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করা।

ভারতের মতো দেশে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান তহবিলের উৎস বন্ড। আমাদের এখানে কোনো বন্ডবাজার নেই। বন্ড ছাড়তে ৬-৮ মাস লাগে। অবকাঠামো ও আবাসন খাতে যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রয়োজন, তা আমরা দিতে পারি। আবার আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতেও আমরা বেশি ভূমিকা রাখতে পারি। শ্রীলঙ্কার মতো দেশে ব্যাংক ৩ বছরের বেশি মেয়াদে কোনো ঋণ দিতে পারে না। কারণ, ওই দেশে সেটা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাজ।

যে পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সমস্যা হয়েছে তার সমাধান করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠান একীভূত বা পুনর্গঠন করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকে শেয়ারে রূপান্তর করতে হবে। যারা এসব প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত ডাকাতির সঙ্গে জড়িত, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা দিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। এই সেবায় কোনো চেক থাকবে না, নগদ লেনদেনও হবে না। এর ফলে গ্রাহকসেবা আরও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। ফলে অর্থনীতিতে আমাদের অবদান আরও বাড়বে। যেসব বিদেশি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান দেশে আসতে চাইছে, তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিলে নতুন নতুন সেবা আসবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে আইনকানুনের কি ঘাটতি আছে? সে জন্যই কি এখন নতুন নতুন নিয়ম ও নীতিমালা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক?

মমিনুল ইসলাম: কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় দুর্ঘটনার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কঠোর হয়ে গেছে। এর ফলে আমাদের হাত-পা বাঁধার জন্য যত কাজ হচ্ছে, সাঁতার কাটার জন্য তত জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিবেশী ভারতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তিন ধরনের নীতিমালা রয়েছে। যেমন যারা গ্রাহকের আমানত নেয়, তারা ব্যাংকের মতো নিয়মকানুন মানে। অন্যদের জন্য রয়েছে পৃথক নীতিমালা। কিন্তু আমাদের দেশে ছোট-বড় সবার জন্য একই নীতিমালা। এর ফলে অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান তা মানতে পারছে না, সমস্যায় পড়ছে।

দেশের প্রচলিত আইন সময়োপযোগী করে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। এখনকার আইনটি নিয়ন্ত্রণমূলক। এতে সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে তেমন কিছু নেই। আবার এখন ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিমালাও আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের মতো কয়েকটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তা মানতে পারলেও দুর্বল ও ছোট আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তা মানতে গিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ছে। এ জন্য সবার কথা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়।