default-image

কথাটা স্ক্যায়ার। এর অর্থ ভয়, ভীতি বা আতঙ্ক। এখান থেকেই এসেছে স্ক্যায়ারমঙ্গারিং কথাটা। আতঙ্ক বা ভীতি ছড়ানোকে বলেই স্ক্যায়ারমঙ্গারিং। আতঙ্ক ছড়ানো কাকে বলে, করোনাভাইরাসের এই সময়ে নতুন করে বোঝানোর কিছু নেই। আবার যদি বলি করোনাভাইরাস যত মানুষ মারবে, তার চেয়ে বেশি মানুষকে দেউলিয়া করবে, এটাও হয়তো একধরনের স্ক্যায়ারমঙ্গারিং। একে আবার ফিয়ার-মঙ্গারিংও বলা হয়। কথাটা অভিধানে স্থান করে নিয়েছে অনেক আগে থেকেই।

নানা ধরনের স্ক্যায়ারমঙ্গারিংয়ের উদাহরণ আছে। রাজনীতিকদের বিরুদ্ধেও ভীতি ছড়ানোর নানা অভিযোগ আছে। এ জন্য ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে আছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন। ১৯৬৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ছোট্ট একটা বাচ্চাকে দিয়ে একটা বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়। ডেইজি নামের সেই বিজ্ঞাপনে একটা বাচ্চার চোখে দেখানো হয়েছিল জনসন না জিতলে পৃথিবী কীভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে, তার একটি কল্পিত ও ভয়াবহ চিত্র। স্ক্যায়ারমঙ্গারিং কথাটা এলেই সবার আগে এই ডেইজির উদাহরণটি সবার আগে দেওয়া হয়।

করোনার এই সময়ে এমনিতেই বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক। এ সময় একজন নতুন আক্রান্তের তথ্য বা মৃত্যুর খবরই ভীতি ছড়ানোর জন্য যথেষ্ট। সুতরাং অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় স্ক্যায়ারমঙ্গারিংয়ের উদাহরণ এখন প্রতি মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে। এই আতঙ্ক সহজে কাটবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যেই খানিকটা আশার আলোও আছে।

স্ক্যায়ারমঙ্গারিং কথাটা নিয়ে এখন অন্যভাবে আলোচনাও শুরু হয়েছে। একটু বুঝিয়ে বলি। তার আগে ইংরেজি বানানটা একটু দেখতে পারি। scaremongering। এখন scare থেকে s অক্ষরটি তুলে দিলে হয় care। অনেক মানুষ এখন অন্যের যত্ন নেওয়াকে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি শুরু করেছে। আর এর ফলে স্ক্যায়ারমঙ্গারিংয়ের পরিবর্তে এখন নতুন কথা প্রচলিত হচ্ছে। আর তার নাম হয়ে গেছে কেয়ারমঙ্গারিং বা সেবাপ্রসারণ।

শুরু কানাডার টরন্টো থেকে। দুই বান্ধবী ভ্যালেনটিনা হারপার ও মিতা হান্স-এর হাত ধরে। পুরো বিশ্ব বলতে গেলে এখন ঘরবন্দী। অনেক দেশের সরকারও বাধ্য করছে ঘরে থাকতে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে আপাতত উপায়। স্বাস্থ্যগত বিবেচনায় করোনাভাইরাসের সবচেয়ে বড় শিকার বয়স্করা। আর অর্থনীতিতে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার দরিদ্র্যরা। এমন অনেক মানুষ আছে, যাদের খাবার নেই, নেই বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সরঞ্জাম, কিংবা অর্থ থাকলেও বের হওয়ার পরিস্থিতি নেই অনেকের। এই সব মানুষের জন্য দাঁড়িয়ে গেছে আরেক দল মানুষ। তাদের মাধ্যম মূলত অনলাইন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা গ্রুপ করে অসহায়দের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। যেমন কেউ হয়তো অসহায় মানুষদের দরজায় বাজার রেখে যাচ্ছে, কেউ খাবার পৌঁছে দিচ্ছে ওষুধসহ অন্য সামগ্রী। এই সব কাজকে এখন বলা হচ্ছে কেয়ারমঙ্গারিং। কানাডা থেকে শুরু হলেও এখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশে দেশে। 

বিবিসি ভারতের একটি উদাহরণ দিয়েছে। এমন অনেক ভারতীয় আছেন, যাঁদের বৃদ্ধ মা-বাবা দেশেই থাকেন। করোনাভাইরাসের প্রকোপে সাহায্যকর্মীরা নেই, তাঁরা খাবার বা ওষুধ কিনতে বাইরেও যেতে পারছেন না। মাহিতা নাগরাজ নামের এক নারী একদিন তাঁর যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক বন্ধুর টেলিফোন পেলেন। তাঁর মা-বাবা থাকেন বেঙ্গালুরুতে। বৃদ্ধ মা-বাবার জরুরি ওষুধ লাগবে। কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না। যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন, এমন আরেক বন্ধুর কাছ থেকে এই অনুরোধ পেলেন মাহিতা। মাহিতার এরপর মনে পড়ল আরেক বৃদ্ধ দম্পতির কথা, যাঁদের খোঁজ নেওয়ার আসলে কেউ নেই। মাহিতা অনেক দূরে থাকেন। উপায় না পেয়ে সহায়তা চেয়ে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলেন। সারা পাওয়া গেল খুব দ্রুত এবং অনেক। অনেকেই জানাল তারা ওষুধ পৌঁছে দেবে। আর এভাবেই ১৭ মার্চ তৈরি হলো বেশ বড় একটা গ্রুপ, নাম ‘স্টপ স্ক্যায়ারমঙ্গারিং অ্যান্ড স্টার্ট কেয়ারমঙ্গারিং’। আতঙ্ক না ছড়িয়ে মানুষকে ভালোবাসা জানানোই এর বড় লক্ষ্য। এক সপ্তাহের মধ্যে এই গ্রুপের সদস্যসংখ্যা ৬৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তাঁরা একটা হেল্পলাইন চালু করেছেন। কেউ কোনো সহায়তা চাইলে নিকটবর্তী সদস্য তা পূরণ করে দিচ্ছেন।

কেয়ারমঙ্গারিং এখন অনেক দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। ব্রিটেনে এ রকম এক গ্রুপের কাজ হচ্ছে বয়স্কদের দরজায় স্যুপ পৌঁছে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে অসহায় বা বয়স্ক মানুষদের দরজায় বাজারসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। এমনকি অনেকে রান্না করা খাবারও দরজার সামনে রেখে দিয়ে আসছে। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। অনেকেই ফেসবুকে গ্রুপ খুলে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। আশা করতেই পারি যে বাংলাদেশে ফেসবুকে গুজব, আতঙ্ক আর উন্মাদনা না ছড়িয়ে সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটাই বড় হয়ে উঠবে।

এবার হয়তো অভিধানে স্থান করে নেবে কেয়ারমঙ্গারিং কথাটা। 

default-image

এগিয়ে আসুক সবাই
নাজনীন আহমেদ একজন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। ফেসবুকে তিনি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘এত দিন ভাবতাম তারাই ধনী, যাদের রয়েছে অনেক বেশি ব্যাংক ব্যালেন্স, ইন্ডাস্ট্রি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অনেক বড় চাকরি। কিন্তু করোনার এই দুঃসময়ে দেখি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, বড় চাকরি থাকলেই তারা সবাই ধনী হয় না। যারা বছর বছর কোটি কোটি টাকা আয় করার পরও সংকটের সময় নিজেদের কর্মচারীদের বেতন দিতে অন্যের কাছে সাহায্য চান, তাঁরা কিসের ধনী? বরং আমি দেখি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ চাকরিজীবী, মধ্যবিত্ত, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—তাঁরা এই সংকটে নানা রকম উদ্যোগ নিয়েছেন, নিজেদের কর্মচারীর বেতন দিতে সঞ্চয় ভাঙছেন, পকেটের টাকা খরচ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন খাদ্য ও জরুরি প্রয়োজনীয় সামগ্রী। কেবল গুটিকয় ধনীকে দেখেছি এই উদ্যোগে শামিল হতে। ধনীদের অনেকেই দেশের এই চরম সংকটে নিজেদের শ্রমিকের বেতন দেওয়ার জন্য হাত পাতছেন অন্যের কাছে। যে টাকাটা তাঁদের শ্রমিকের বেতনের জন্য চাইছেন, তাঁরা সেটা না নিলে, সেই টাকা সরকার ব্যয় করতে পারত সাধারণ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তায়, ডাক্তারদের পিপিই দিতে। এখন ভাবুন, কী কারণে এদের আমরা ধনী মনে করি?’

বাড়ি ভাড়া নেবেন না, এ রকম কিছু উদ্যোগ কিন্তু দেশে দেখা যাচ্ছে। আবার শ্রমিকদের বিনা মূল্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন, এমন শিল্পপতিও আছেন। অল্প করে হলেও দেশের কিছু ব্যবসায়ী গ্রুপ নিজেদের শ্রমিক বা স্বাস্থ্য সেবায় সরকারকে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। এ রকম আরও অনেক মানুষ, অনেক বিত্তবানেরাও হয়তো এগিয়ে আসবেন।

বড় ভরসা সরকার
অর্থনীতির ক্ষতি কত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিভিন্ন দেশ বিপুল অর্থের পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দুই ট্রিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির কথা বলছে। জি-২০ দেশগুলো খরচ করবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ সরকার রপ্তানিমুখী খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচির কথা বলেছে। তবে অবশ্যই এ অর্থ পর্যাপ্ত নয়। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে। দিন আনে দিন খায়, এমন মানুষ প্রচুর। ছোট্ট একটা দোকান দিয়ে বসতেন বা পণ্য ফেরি করতেন, এমন মানুষও অসংখ্য। কাজ না থাকলে দুই বেলা খাবার জোগাড় করতে পারবেন না, এমন মানুষও মোটেই কম নয়।

ব্যক্তি উদ্যোগ জরুরি। বিত্তবানদের ভূমিকাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আসল ভরসা দিতে পারবে কেবল সরকার। আর এ কারণেই করোনাভাইরাসের প্রকোপ শেষ হওয়ার আগেই দেশে দেশে সরকার মানুষকে ভরসা দিতে নানা অঙ্কের আর্থিক কর্মসূচির ঘোষণা দিচ্ছে। দেশের মানুষ যাতে অনুভব করতে পারে যে সরকার তাদের সঙ্গে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় একটি দায়িত্বশীল সরকারের ভূমিকা ও গুরুত্ব এখন অনেক বেশি। 

আমরাও সরকারের ওপর ভরসা করতে চাই।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0