আয়ের আশায় খুলছে দুয়ার

বিজ্ঞাপন
default-image

পর্যটন–অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো তাদের সীমান্ত ও বিমানবন্দর খুলতে শুরু করেছে। তবে আপাতত সব দেশের নাগরিকেরা এই সুযোগ পাবেন না। ১৪টি দেশের পর্যটকেরাই কেবল ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সুযোগটি পাবেন। 

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে জারি করা লকডাউনের কারণে কয়েক মাস ধরে ভ্রমণ–পর্যটন বন্ধ থাকে। জুন মাস থেকে ধীরে ধীরে ইইউর দেশগুলো তা শিথিল করতে শুরু করে। সে অনুযায়ী ইইউ গত সোমবার ১৪টি ‘নিরাপদ দেশ’–এর তালিকা প্রকাশ করে। দেশগুলো হচ্ছে আলজেরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জর্জিয়া, জাপান, মন্টেনেগ্রো, মরক্কো, নিউজিল্যান্ড, রুয়ান্ডা, সার্বিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তিউনিসিয়া ও উরুগুয়ে। এসব দেশের জন্য গত বুধবার থেকে ইউরোপের সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়। 

প্রাথমিকভাবে নিরাপদ দেশের এই তালিকায় ৫৪টি নাম ছিল। তা থেকে ৪০টিই বাদ পড়ে। গতকাল বৃহস্পতিবার অবশ্য সর্তসাপেক্ষে চীনের নামও যোগ করা হয় তালিকায়। দুই সপ্তাহ পরপর এই তালিকা হালনাগাদ করা হবে।

তবে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ব্রাজিলসহ অনেক দেশের স্থান হয়নি ইইউর তালিকায়।

২০১৯ সালে বিশ্ব অর্থনীতি তথা মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের অবদান ছিল ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন বা ২ লাখ ৯০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। প্রসঙ্গত, এক লাখ কোটিতে এক ট্রিলিয়ন।

ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল–ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালে বৈশ্বিক জিডিপিতে পর্যটন খাতের হিস্যা ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। মোট কর্মসংস্থান দাঁড়িয়েছিল ৩৩ কোটি। অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে ১ জন এই খাতে কাজ করেন।

করোনার প্রভাবে এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক পর্যটন খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার কোটি ডলার। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার মতে, করোনার কারণে বিশ্বজুড়ে কর্মসংস্থান হারাবে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি পর্যটন কর্মী। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান স্ট্যাটিসটা অবশ্য আরও ভয়ের কথা বলছে। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ কোটির বেশি মানুষ চাকরি হারাবে। এর মধ্যে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই প্রায় ৪ কোটি ৩৪ লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারাবে। ইউরোপে ১ কোটি ৩০ লাখ কর্মসংস্থান কমবে।

>বৈশ্বিক জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১০ দশমিক ৩ শতাংশ
মোট কর্মসংস্থান প্রায় ৩৩ কোটি মানুষের
করোনায় এখন পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার

গত জুনে প্রকাশিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরে এ পর্যন্ত বিশ্বে পর্যটক কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ, যা ডিসেম্বর নাগাদ ৮০ শতাংশে উঠতে পারে। করোনার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পর্যটনশিল্পে প্রায় ৪০ হাজার কোটি ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করছে।

করোনার প্রকোপ কমায় ইউরোপের পরিস্থিতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হওয়ায় গত ১৫ জুন ইউরোপের ৩১ দেশের ওপর থেকে ভ্রমণসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় জার্মানি। ওই দিনই বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিমানবন্দর ও সীমান্ত খুলে দেয় গ্রিস। তবে সব সময় পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে বলে জানান দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস। বালুময় সৈকত ও অসাধারণ সূর্যাস্ত দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত গ্রিসে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক ঘুরতে যান। গত বছর প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ পর্যটক দেশটি সফর করেন। এর ফলে এই খাত থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি ইউরো।

গ্রীষ্মকালীন ছুটি সামনে রেখে পর্যটক আগমনের আশায় জুনের প্রথম সপ্তাহেই ইতালি, সুইজারল্যান্ড, লিচেনস্টেইন, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র সীমানা খুলে দেয়। পাশাপাশি ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ড সীমান্ত খুলে দেয়। তবে তারা সবাই শুধু যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য, শেনজেন অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য এই সুযোগ চালু করে। 

কূটনীতিকেরা বলছেন, ইইউর দেশগুলো থেকে যদি চীনে যাওয়ার চুক্তি হয়, তবে ইইউও চীনকে যুক্ত করতে প্রস্তুত রয়েছে। আর যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য ব্রেক্সিট চুক্তির আলোচনার অধীনে নতুননিয়ম করা হয়েছে। সে অনুযায়ী আগামী ৩১ ডিসেম্বর ব্রেক্সিট হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের বাসিন্দারা ইউরোপের নাগরিকের সমান মর্যাদাই পাবেন। যে কারণে সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন না ব্রিটিশ নাগরিকেরা।

ইইউভুক্ত অন্তত ৫৫ শতাংশ দেশ, যাদের জনসংখ্যা ইউরোপের ৬৫ শতাংশ, তারা নিরাপদ দেশের তালিকাটি অনুমোদন করেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে স্পেনসহ অনেক দেশ এখনো দ্বিধান্বিত। কারণ তারা একদিকে কোভিড-১৯–এর ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেয়ে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, অন্যদিকে আবার পর্যটনশিল্পকেও আগের অবস্থায় দেখতে চায়। তবে গ্রিসের মতো পর্যটন আয়ের ওপর নির্ভর করে চলা পর্তুগালও সবকিছুই স্বাভাবিক করতে আগ্রহী। 

এর আগে ইউরোপের সুনির্দিষ্ট কিছু দেশ ভ্রমণে বিধিনিষেধ শিথিলের ঘোষণা দেয় যুক্তরাজ্য। ৬ জুলাই থেকে পুরোপুরি শিথিল করতে যাচ্ছে দেশটি। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য শুরুতে স্পেন, ফ্রান্স, গ্রিস, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম, তুরস্ক, জার্মানি ও নরওয়ে ভ্রমণের অনুমতি দিতে পারে। তবে পর্তুগাল বা সুইডেন যাওয়ার অনুমতি এখনই না–ও মিলতে পারে। মহামারি করোনাভাইরাসের বিস্তারের প্রেক্ষাপটে গত ১৭ মার্চ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাকি ক্ষেত্রে নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছিল যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর। বিধিনিষেধ শিথিলের ফলে বিদেশ ভ্রমণ শেষে এখন দেশে ফিরলে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে না। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন