default-image

কয়লার অভাবে এই মৌসুমে দেশের সব ইটভাটায় উৎপাদন শুরু হয়নি। তবে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে এখন কয়লা আমদানি শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ইটের উৎপাদনও। কিন্তু এরই মধ্যে বেড়ে গেছে ইটের দাম।
গত মৌসুমে উৎপাদিত প্রতি হাজার ইট যেখানে ছয় হাজার ৫০০ থেকে সাত হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়, এখন তা বিক্রি হচ্ছে সাত হাজার ৫০০ থেকে আট হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি হাজার ইটের দাম বেড়েছে এক থেকে দেড় হাজার টাকা।
ইটভাটামালিকেরা বলছেন, কয়লা আমদানি শুরু হলেও আমদানি মূল্য বেড়ে গেছে আগের চেয়ে তিন গুণ। আর বেশি দামে কয়লা আমদানিই তাঁদের ইটের দাম বাড়াতে বাধ্য করেছে।
বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে যে কয়লা আসছে, তার দাম বেড়েছে তিন গুণ। কিন্তু সেই অনুযায়ী ইটের দাম বেশি বাড়ানো হয়নি।’
দেশে নভেম্বর থেকে এপ্রিল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মে পর্যন্ত হচ্ছে ইট প্রস্তুতের মৌসুম। প্রতিবছরই নভেম্বরে উৎপাদন শুরু হলেও এবার সব ইটভাটা কয়লার অভাবে উৎপাদনে যেতে পারেনি। ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি বলছে, সারা দেশে ছয় হাজার ২০০ ইটভাটা আছে। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ইটভাটা কয়লার অভাবে এখনো ইট উৎপাদন শুরু করতে পারেনি। কারণ, ইটভাটায় একবার কয়লা পোড়ানো শুরু হলে তা আর বন্ধ করা যায় না। যেসব ইটভাটায় আগের কয়লা মজুত ছিল, সেসব ভাটাতেই উৎপাদন শুরু হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে অবশ্য দেশে ইটভাটা আছে ছয় হাজার ৭৪৬টি।
ইট প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাবে, দেশের ইটভাটাগুলো চালাতে বছরে ৩৭ লাখ টন কয়লার প্রয়োজন। এই কয়লার বড় অংশই আসে ভারত থেকে। বিশেষ করে মেঘালয় ও আসাম থেকে। তবে ভারতীয় পরিবেশবাদীদের মামলার কারণে গত ১৬ মে থেকে ভারতীয় কয়লা আসা বন্ধ হয়ে যায়।
তবে ভারত সরকার সম্প্রতি কয়লা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। আবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে কয়লা আমদানিতে শুল্ক ছাড় ঘোষণা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আমদানিকারকেরা এখন ভারতসহ যেকোনো দেশ থেকে শুধু ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) দিয়েই কয়লা আমদানি করতে পারছেন। আগে সব মিলিয়ে শুল্ক দিতে হতো ৩১ শতাংশ।
কিন্তু শুল্ক ছাড় দেওয়ার পর দেশে যে কয়লা আমদানি হচ্ছে, তার দাম হয়ে গেছে তিন গুণ। কয়লা আমদানিকারকেরা বলছেন, লালমনিরহাটের বুড়িমাড়ি, সাতক্ষীরার ভোমরা, পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ দিয়ে ভারত থেকে প্রতি টন কয়লা আমদানি হচ্ছে ২১ হাজার টাকায়। আগের মৌসুমে কয়লা আমদানি হতো সাত হাজার ৫০০ টাকা থেকে আট হাজার টাকায়। সিলেটের বিয়ানীবাজার সীমান্তের শেওলা শুল্ক স্টেশন দিয়েও কয়লা আমদানি হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি হয়েছে প্রতি টন ২০ হাজার ৫০০ টাকায়। আবার দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ২২ হাজার টন কয়লা নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে বলে জানা গেছে।
ইটভাটামালিকেরা বলছেন, যে সময়টায় ভারত কয়লা রপ্তানি বন্ধ রাখে, তখন দেশে ইট উৎপাদনের মৌসুম ছিল না। সে কারণে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব ইটভাটাগুলোতে তেমন পড়েনি। আবার এবারের মৌসুম শুরুর কিছুদিন পরই ভারত কয়লা রপ্তানি শুরু করেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এখন চড়া দামে কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। আবার কয়লা আসছে চাহিদার চেয়ে অনেক কম।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের সিদ্ধিরগঞ্জ ও বন্দর উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মমিন খানের অভিযোগ, কয়লা আমদানির সঙ্গে জড়িত ভারত ও বাংলাদেশের একটি সিন্ডিকেট কয়লার কৃত্রিম সংকট ও দাম বাড়ানোর সঙ্গে জড়িত। চাহিদামতো কয়লা না পেয়ে ও দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ইটভাটা বন্ধ রয়েছে। যেসব মালিক বেশি দামে কয়লা কিনে ইটভাটা চালু রেখেছেন, তাঁরা বেশি দামে ইট বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বেশি দামে কয়লা কেনার ফলে ইটের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ইট প্রস্তুতকারী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর। তিনি জানান, ২০ থেকে ২২ হাজার টাকায় এক টন কয়লা আমদানি করে তা দিয়ে এক হাজার ইট প্রস্তুত করতে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ পড়ছে। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে সাত হাজার ৫০০ থেকে আট হাজার ৫০০ টাকায়।
সোনারগাঁয়ের উদ্ধবগঞ্জ বাজারের ইট ব্যবসায়ী জজ মিয়া জানান, ইটের দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারি-বেসরকারি ঠিকাদার, শিল্পকারখানা ও ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাতাদের অনেকেই নির্মাণকাজ বন্ধ রেখেছেন।
এর সত্যতা মিলল সোনারগাঁয়ের ভূঁইয়া প্লাজার স্বত্বাধিকারী শিমুল ভূঁইয়ার কথায়। তিনি জানান, ইটের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কেটের চলমান নির্মাণকাজ তিনি বন্ধ রেখেছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রত্না এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন জানালেন, সরকার যে নির্ধারিত দরে ইট কেনার প্রস্তাব করে দরপত্র দিয়েছে, তার চেয়ে ইটের দাম বেশি। সে কারণে তিনিও নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
ইট প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাবে, প্রতিবছর দেশে এক হাজার ৭৫০ কোটি ইট উৎপাদিত হয়। প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে ইটের চাহিদা বাড়ছে।
 প্রতি হাজার ইট এখন বিক্রি হচ্ছে ৭৫০০-৮৫০০ টাকায়; যা আগে ছিল ৬৫০০-৭৫০০ টাকা
 কয়লা আমদানিতে শুল্ক কমিয়েছে সরকার। তবু কয়লার আমদানিমূল্য বেশি
 কয়লার অভাবে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ইটভাটা বন্ধ আছে

‘‘ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে যে কয়লা আসছে, তার দাম বেড়েছে তিন গুণ। কিন্তু সেই অনুযায়ী ইটের দাম বেশি বাড়ানো হয়নি
আবু বকর
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন