উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল বিপণনের অটোপাইলট

মার্কোপোলো এআইয়ের উদ্যোক্তা তাসফিয়া তাসবিন ও রুবাইয়াত ফারহান
ছবি: সৌজন্যে

একটি স্টার্টআপে কাজ করার সময় থেকে প্রকৌশলী তাসফিয়া তাসবিন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কাজ করেছেন আলাদা করে। কাজ করতে গিয়ে লক্ষ করেছেন, মার্কেটিং বা বিপণন হচ্ছে উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় যন্ত্রণার নাম। তত দিনে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব বা গুগলের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী নবীন উদ্যোক্তারা তাঁদের পণ্য ও সেবার খবর পৌঁছে দিচ্ছেন দুনিয়াজুড়ে। কিন্তু বাংলাদেশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা তাতে নিজেদের হিস্যা পাচ্ছিলেন না। কারণ, প্রথমত তাঁদের বিপণনের আলাদা টিম নেই, কর্মী নেই। অন্যদিকে বেশির ভাগ ‘ওয়ানম্যান আর্মি’র বিপণনের জন্য আলাদা সময়ও নেই। ‘অথচ ওদের অনেকেরই ভালো পণ্য বা সেবা রয়েছে, যা কেবল বিপণনের অভাবে পরের ধাপে যেতে পারছে না,’ বলছিলেন তাসফিয়া।

২০২০ সালে করোনা শুরু হলে তাসফিয়া তাঁদের ডিজিটাল মার্কেটিং বা অনলাইন বিপণন ব্যবস্থা থেকে সহায়তার মাধ্যমে অনেক প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে সাহায্য করেন। এর মধ্যে ‘নিজে একটা কিছু’ করার জন্য তাসফিয়া চাকরিও ছেড়ে দিয়েছেন। নিজে কিছু করার এই চেষ্টায় তাঁর সঙ্গী হয়েছেন আরেক প্রকৌশলী রুবাইয়াত ফারহান। রুবাইয়াত দুই বছর ধরে আর একটি প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাজ করেছেন। সেখানে কিন্তু নিজেদের জন্যও তাঁকে ডিজিটাল মার্কেটিং বা বিপণন করতে হতো।

এরপর আমরা প্রতিদিন বনানীর একটি কফি হাউসে সারা দিন আড্ডা দিতাম। দুজন দুইটা ল্যাপটপ নিয়ে নানান পরিকল্পনার কথা বলি, অনেক হিসাব-নিকাশ করি। দুজনই ভেবেছি কীভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিপণনের কাজে সাহায্য করা যায়।’ তবে সেটি প্রচলিত ‘এজেন্সির মতো করে নয়।’ ‘আমরা বিপণনের কাজটা অটোমেটিক করতে চেয়েছি।’ আর এভাবে জন্ম হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল বিপণন প্রতিষ্ঠান মার্কোপোলো এআই (https://www.markopolo.ai/)-এর।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ডিপ লার্নিং প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগের কথা মনে হলে প্রযুক্তির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র সিলিকন ভ্যালির কথাই আমাদের মনে হয়। নিদেনপক্ষে ভারতের বেঙ্গালুরু বা ইউরোপের কোনো দেশ। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে এ দেশের তরুণ-যুবারাও সদর্পে এই পথে হাঁটতে শুরু করেছেন। বৈশ্বিক পণ্য লঞ্চিংয়ের প্ল্যাটফর্মে (Product Hunt) মার্কোপোলোর প্রোডাক্ট লঞ্চিংয়ের খবরটি আমাকে দিয়েছে আমার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে, কয়েক মাস আগে। বুঝেছি, আমরা খবর না রাখলেও তরুণদের নজর এসব দিকেই। তার পর থেকে আমি মার্কোপোলোর খোঁজ রেখেছি। এর মধ্যে আগস্টে তাদের বাড়িতে গমন আমার।

গুলশান অ্যাভিনিউর বহুতল কাচ গুদামগুলোর মাঝখানে দোতলা বাড়িতে ঢুকেই চমকে গেলাম। কারণ, বাড়ির লন তো নয়, যেন এক বোটানিক্যাল গার্ডেন। নানা ধরনের অর্কিড, বনসাই ও লতাগুল্মের সমাহার। ভিন্ন এক পরিবেশে পরিপাটি একটি অফিস। কথা বলে জানলাম, প্রচণ্ড কাজের চাপে ফ্লোরে ঘুমাতেও কারও দ্বিধা নেই। কারণ, তাঁদের কাছে মার্কোপোলো কাজ নয়, স্বপ্ন। তাঁদের অফিসে কোনো স্যার/ম্যাডাম নেই। সবাই সমান। সেই মার্কোপোলোর অফিসে দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতা তাসফিয়া ও রুবাইয়াতের সঙ্গে আমার আলাপচারিতা।

তাসফিয়া চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে ইলেকট্রনিকস ও টেলিকমিউনিকেশনে পড়লেও পাস করার পর ওর কাজের ক্ষেত্র কোডিং থেকে দূরে। যদিও রোবটিকস ও মেকাট্রনিকস নিয়ে তিনি অনেক কাজ করেছেন শিক্ষাজীবনে। খুব অল্প সময়ে ডেটাসফট, এটুআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাসফিয়ার।

রুবাইয়াত পাস করেছেন বুয়েটের মেটালার্জি ও ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে। মাথায় সারাক্ষণ আইডিয়া ঘুরতে থাকে এই উদ্যোক্তার।

নাম নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা শেষে ইতালির পরিব্রাজক মার্কোপোলোর নামে নিজেদের উদ্যোগের নাম ঠিক করেন তাঁরা। তবে পরিব্রাজকের Marco polo-র নামের ‘সি’-এর জায়গায় ‘কে’ বসিয়ে দেন। এর ফলে ব্যাপারটা এমন হয় ‘Mr Mark is presenting your Marketing Plan’ হাসতে হাসতে বললেন তাসফিয়া।

মার্কোপোলো উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল বিপণনের কাজটাকে অটোপাইলটে নিয়ে গেছে। পণ্য বা সেবা, ব্যবসা এবং সেক্টর সম্পর্কে কিছু তথ্য পূরণ করে দিলে মার্কোপোলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ওই উদ্যোক্তার বিপণনকৌশল; প্রচারণা পরিকল্পনা; প্রচারণার কনটেন্ট; গুগল, ফেসবুক, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রামে বিজ্ঞাপন প্রচারের সময়সূচি এবং বিজ্ঞাপন অপটিমাইজেশনের সবকিছু তৈরি করে ফেলে। ওদের পাশে বসে দেখলাম একটি বিস্কুটের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল ও শিডিউল ছাড়া পোস্টের ক্যাপশনও তৈরি করে দিয়েছে। বিজ্ঞাপন প্রচারের পর সেটির নানা তথ্য জানাসহ এসব বিষয় তত্ত্বাবধান করার জন্য মার্কোপোলো গ্রাহকদের একটি ড্যাশবোর্ড দিয়ে দিচ্ছে। ‘এ ছাড়া গ্রাহক চাইলে প্রস্তাবিত ক্যাপশন, ছবি কিংবা পরিকল্পনাও নিজের মতো সাজিয়ে নিতে পারে,’ রুবায়েত জানান।

গুগল, ফেসবুক বা ইউটিউব প্রতিনিয়ত তাদের অ্যালগরিদমের নানা পরিবর্তন করে। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পক্ষে সবকিছু সামলে সে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময় বের করাটা কঠিন। আবার সময় পেলেও এসব বিষয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করা মোটেই সহজ নয়। মার্কোপোলো এই সব বিষয় থেকে তাকে মুক্তি দেয়।

ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিংয়ে (NLP) এখনো বাংলার স্থান পোক্ত হয়নি। ফলে মার্কোপোলোর সেবা এখনো ইংরেজিতে। ‘তবে আমরা কাজ করছি বাংলা যুক্ত করার,’ বলেন তাসফিয়া।

ইংরেজিতে হওয়ার কারণে মার্কোপোলোর উদ্যোগ সহজেই বৈশ্বিক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকা, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ করতে শুরু করেছে মার্কোপোলো। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শপিফাই বা আমাজনের এফবিএ মার্চেন্ট। ‘তবে আমাদের লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়া। ইন্দোনেশিয়া দিয়েই আমরা শুরু করেছি। এ অঞ্চলে ই-কমার্স ও অনলাইন ব্যবসা দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। শপির (Shopee) মতো বৃহৎ ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার চেষ্টা করছি আমরা এখন,’ জানান দুই উদ্যোক্তা।

এরই মধ্যে এক দফায় দুই লাখ ডলারের বিনিয়োগ জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছে মার্কোপোলো। এ ছাড়া উপদেষ্টা হিসেবে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন দুবাইভিত্তিক স্পাইডার ডিজিটাল ইনোভেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও এইচটিপুলের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কাজী মনিরুল কবির। তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তাঁরা তাঁদের প্রোডাক্টের উন্নয়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য কাজ করছেন। এ মুহূর্তে ৯ জন পূর্ণকালীন কর্মী রয়েছেন।

বাংলাদেশে বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি স্টার্টআপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এই খাতে সম্ভাবনা অনেক। বাংলাদেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের বেশ বড় বাজার রয়েছে। এ নিয়ে নতুনদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে মার্কোপোলোর উদ্যোক্তারা।

দক্ষিণ কোরিয়ার বৈশ্বিক ইনকিউবেটর প্রোগ্রাম কে স্টার্টআপ চ্যালেঞ্জে নির্বাচিত হয়ে মার্কোপোলো জায়গা করে নিয়েছে ২০টি স্টার্টআপের মধ্যে। কোরিয়ার কয়েকটি শহরে তাদের প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যার কাজ হবে। ‘কে স্টার্টআপের এই সুযোগটা আমরা কাজে লাগাতে চাই দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য।’ এটাই আপাতত ভাবনা।

বর্তমানে নতুন বিনিয়োগের খোঁজ করছে মার্কোপোলো। এবার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দেশে আনতে চায় তারা। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা, স্বয়ংক্রিয়করণে বাংলা ভাষাকে যুক্ত করা, ড্যাশবোর্ডের উন্নয়নসহ ডিজিটাল বিপণন ‘অটোপাইলট যেন’ বাধাহীনভাবে চলতে পারে, সেটাই তাদের লক্ষ্য।