default-image

২০১২ সালে তেজগাঁওয়ে ছোট কারখানায় কাগজের কাপ উৎপাদনের জন্য কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা করেন কাজী সাজেদুর রহমান। চার বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির মাসিক কাপ বিক্রির পরিমাণ গিয়ে ১ কোটি ২০ লাখ পিসে দাঁড়ায়। ২০১৮ সালে পূর্বাচলে শীতলক্ষ্যার পারে ২৪ শতাংশ জায়গার ওপর নতুন কারখানায় স্থানান্তরিত হয় কেপিসি। সেখানে মাসে আড়াই কোটি পিস পেপার কাপ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কাপের পাশাপাশি থালা–বাটিও তৈরি হয় কারখানাটিতে। সব মিলিয়ে ২৮ ধরনের পণ্য উৎপাদন করে কেপিসি।

দেশে করোনা শুরুর প্রথম মাস কেপিসির উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকে। পরের দুই মাসে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন হয় সক্ষমতার ৩০ শতাংশ। বর্তমানে ৭০-৭৫ শতাংশ সক্ষমতায় কারখানার উৎপাদন চললেও গত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে কেপিসির বিক্রি গত বছরের তুলনায় অর্ধেক কমেছে। ব্যবসা কমে যাওয়ায় কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে পুঁজি ভাঙতে বাধ্য হন সাজেদুর রহমান। প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ পেয়েছেন ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

কাজী সাজেদুর রহমান বললেন, ‘আমার প্রতিষ্ঠানে চলতি মূলধনের ৩০ শতাংশ হিসেবে সাড়ে চার কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার কথা। কিন্তু যে টাকা পেয়েছি, তা দিয়ে হয়তো ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা যাবে। তারপর করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে প্রতিষ্ঠান চালানো মুশকিল হবে। অন্যদিকে শীতে নতুন করে করোনার সংক্রমণ বৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে।’ তিনি বলেন, এক ব্যাংক থেকে প্রণোদনা পাওয়ায় অন্য ব্যাংক থেকে আর পাওয়া যাবে না।

বিজ্ঞাপন
লকডাউনে জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে। পুঁজি বলতে আমার আর কিছু নেই। চার মাসের ভাড়া দিতে পারছি না বলে দোকান ছেড়ে দিয়েছি। এখন গ্রামের বাড়ি চলে যাব। দেখি সেখানে কিছু করা যায় কি না।
আনোয়ার হোসেন

তবু কেপিসি তো প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পেয়েছে। মুদ্রার উল্টো পিঠের চিত্র হচ্ছে, অনেক ছোট ব্যবসায়ী করোনায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খেলেও কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না। ব্যবসা গুটিয়ে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। তেমনই একজন রংপুরের আনোয়ার হোসেন। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যবাড্ডা এলাকায় টেইলার্সের দোকান চালাচ্ছিলেন। তাতে তাঁর ছোট সংসার দিব্যি চলে যেত। তবে করোনার লকডাউনে দিনের পর দিন দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হন আনোয়ার। চাহিদামতো পোশাকের নতুন ফরমাশ না পাওয়ায় দোকানভাড়া বাকি পড়তে থাকে। টানা চার মাস ভাড়া বাকি পড়ায় ভবনের মালিক দোকান ছাড়তে বলেন। শেষ পর্যন্ত ভাড়ার টাকা জোগাড় না করতে পেরে দোকানই ছেড়ে দেন। টেইলার্সের দোকানে গত সপ্তাহে নতুন একটি সেলুন চালু হয়েছে।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘লকডাউনে জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হয়েছে। পুঁজি বলতে আমার আর কিছু নেই। চার মাসের ভাড়া দিতে পারছি না বলে দোকান ছেড়ে দিয়েছি। এখন গ্রামের বাড়ি চলে যাব। দেখি সেখানে কিছু করা যায় কি না।’
অবশ্য আনোয়ার হোসেন কোনো ব্যাংকিং চ্যানেলের মধ্যে ছিলেন না। প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের জন্য আবেদনও করেননি। তবে আবেদন করেও ঋণ না পাওয়ার উদাহরণ আছে অনেক। সারা দেশের হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করলেও প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি।

করোনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার গত এপ্রিলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই প্রণোদনা থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে চলতি মূলধন বা বিনিয়োগ সুবিধার জন্য কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ও সেবা খাতের ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ এক বছর মেয়াদি ঋণ নিতে পারবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বলেন, ‘বেসরকারি একটি ব্যাংক থেকে দীর্ঘদিন ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছি। করোনায় ব্যবসা ব্যাপকভাবে ক্ষতিতে পড়েছে। বিক্রি নেই। তাই উৎপাদন কমে গেছে। প্রণোদনার ঋণ চেয়ে ব্যাংকে আবেদন করেছিলাম। তবে ঋণ পাইনি। এ কারণে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’

করোনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার গত এপ্রিলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই প্রণোদনা থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে চলতি মূলধন বা বিনিয়োগ সুবিধার জন্য কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ও সেবা খাতের ব্যবসায়ীরা সর্বোচ্চ এক বছর মেয়াদি ঋণ নিতে পারবেন। নতুন উদ্যোক্তারাও ঋণসুবিধার আওতায় আছেন। ন্যূনতম ৫ শতাংশ ঋণ নারী উদ্যোক্তাদের এবং ১৫ শতাংশ ঋণ গ্রামাঞ্চলে দেওয়ার বিধানও রাখা হয়। প্যাকেজের আওতায় ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ। তার মধ্যে ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি দেবে, বাকি ৪ শতাংশ সুদ ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে।

অবশ্য ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের দুই-তৃতীয়াংশই বরাদ্দ হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত প্যাকেজের ৭ হাজার ৭০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন হয়েছে।

এসএমই ফাউন্ডেশন কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের প্যাকেজের ঋণপ্রাপ্তির বিষয়ে অবহিত করছে। প্রয়োজনে বিভিন্ন সহযোগিতাও করছে। জানতে চাইলে এসএমই ফাউন্ডেশনের একজন সহকারী মহাব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উদ্যোক্তারা প্রত্যাশিত হারে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পাচ্ছেন না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁদের ব্যবসার লেনদেনের পরিমাণ কম, ঋণও দরকার অল্প টাকার এবং ব্যাংকে কোনো ঋণ নেই, তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
আমরা আশা করেছিলাম, সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণে বেসরকারির চেয়ে সরকারি ব্যাংকগুলো ভালো ভূমিকা রাখবে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি শামস মাহমুদ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপ, সতর্কতা, ঋণ নিশ্চয়তা স্কিম (ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম) গঠনসহ নানা উদ্যোগের পরও সিএমএসএমই খাতে প্রণোদনার ঋণ বিতরণে গতি আসছে না। সে কারণে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, প্রণোদনা ঋণের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ট্রেডিং ব্যবসা উপখাতে বিতরণ করা যাবে। আগে এ খাতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ঋণ দেওয়া যেত। এখন উপখাতে ঋণ বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণে গতি আনতে চায় সংস্থাটি। পাশাপাশি ঋণ বিতরণের সময় বাড়িয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণে বেসরকারির চেয়ে সরকারি ব্যাংকগুলো ভালো ভূমিকা রাখবে। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। বেসরকারি কয়েকটি ব্যাংক অনেক উদ্যোক্তাকে ঋণ দিয়েছে। সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে হলে সরকারি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা পরিবর্তন করতে হবে। কারণ, ঢাকার বাইরে তাদের শাখাই সবচেয়ে বেশি।’

করোনার শুরুতে সরকারের তরফ থেকে যখন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল, তখনো জানতাম না প্রকৃতপক্ষে কী ঘটতে চলেছে। তবে ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর অনেক ধরনের তথ্য–উপাত্ত সংগৃহীত হয়েছে। তাই কেবল সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারের আলাদা একটি প্যাকেজ ঘোষণা করা দরকার বলে মন্তব্য করেন শামস মাহমুদ। তিনি বলেন, প্যাকেজটি বাস্তবায়নে পিকেএসএফ, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। কারণ, প্রত্যন্ত এলাকায় ভালো উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করতে তারাই দ্রুত ভূমিকা রাখতে পারবে।

মন্তব্য পড়ুন 0