৪৯ বছর আগে বহুজাতিক কোম্পানির মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে চামড়ার ব্যবসায় যুক্ত হন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। প্রথমে চামড়া রপ্তানি করে হাত পাকান। তারপর চামড়া থেকে জুতা তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে উৎপাদিত চামড়ার জুতার বিদেশযাত্রা (রপ্তানি) শুরু হয়। রপ্তানির পাশাপাশি দেশের জুতার বাজারেও অন্যতম শীর্ষ স্থান দখল করেছে তাঁর প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর হাতে গড়া অ্যাপেক্স গ্রুপের কোম্পানির সংখ্যা বর্তমানে ৮। চামড়া ও চামড়ার জুতার পাশাপাশি তাঁদের ব্যবসা ওষুধ, শেয়ারবাজার ও বিজ্ঞাপন খাতে বিস্তৃত হয়েছে। সব মিলিয়ে অ্যাপেক্স গ্রুপে কাজ করেন ১৭ হাজারের বেশি কর্মী। তাঁদের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ (২০২০-২১ অর্থবছর) ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। তার মধ্যে রপ্তানি ১ হাজার ৪২ কোটি টাকা।

অবশ্য সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে কেবল সফল ব্যবসায়ীর গণ্ডির মধ্যে রাখলে ভুল হবে। তিনি ১৯৯৬ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তখন যোগাযোগ, নৌপরিবহন, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ২০০১ সালেও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। তার বাইরে সংগঠক হিসেবেও অনেক কাজ করছেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকার (এমসিসিআই) সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির পদে ছিলেন। তিনি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য।

default-image

গত নভেম্বর শীতের এক সকালে গুলশানে অ্যাপেক্সের কার্যালয়ে ঘণ্টা দুই প্রথম আলোর এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজের ছোটবেলা, বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা বিষয়ে কথা বললেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। জীবনের শেষ বেলায় এসেও মনেপ্রাণে বেশ তরুণ তিনি। জীবন নিয়ে বললেন, ‘জীবন নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। একজন মানুষের কত আর প্রয়োজন। কোথাও না কোথাও তো দাঁড়ি টানতে হয়...।’

বহুজাতিকে চাকরি

কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্ম নেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। তাঁর বাবা স্যার সৈয়দ নাসিম আলী (১৮৮৭-১৯৪৬) কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান ১৯৩৩ সালে। তার এক যুগ পর তিনি প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি দেয়। বড় ভাই এস এ মাসুদও ১৯৭৭ সালে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান।
সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী কলকাতাতেই স্কুল ও কলেজ শেষ করেন। ১৯৬২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হোন। তারপর মাস্টার্স পড়তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোন। ১৯৬৪ সালে অর্থনীতিতে মাস্টার্স পাস করেন। থাকতেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে। তখন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিও করতেন।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল, চাকরি করব না; ব্যবসা করব, নিজের পায়ে দাঁড়াব। প্রত্যেক মানুষেরই স্বপ্ন থাকে; আমারও ছিল। তো এক–দুবার ব্যবসার কথা বললে আমার ভাইয়েরা টিটকারি করল। হাসাহাসি করল। বলল, ‘তুই ব্যবসার কী বুঝিস। আমাদের চৌদ্দ পুরুষ কেউ ব্যবসা করেনি।’

ছোটবেলা থেকে চাকরি না করার স্বপ্ন দেখলেও বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। সেই ঘটনাও বেশ চমকপ্রদ। এমএ পরীক্ষার পর অন্য সহপাঠীদের সঙ্গে সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা শুরু করেন। তবে সেই পরীক্ষায় বসার আগেই অনেকটা আকস্মিকভাবে তাঁর চাকরি হয়ে যায়।

১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে এমএ পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। বাড়ি থেকে মাসে মাসে টাকা আসছে। পড়াশোনা করছেন। সঙ্গে রাজনীতিও। একদিন জিন্নাহ অ্যাভিনিউ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটছেন। হঠাৎ খেয়াল করলেন, মনি, মনি (আমার ডাকনাম) বলে কেউ একজন ডাকছে। পেছনে তাকাতেই দেখলেন, পারিবারিক বন্ধু হুমায়ূন খান পন্নী। বললেন, এদিকে আয়। যেতেই জিজ্ঞেস করলেন, কী করছিস? মঞ্জুর এলাহী বললেন, পরীক্ষা শেষ। এখন সিএসপি পরীক্ষা দেব। পন্নী বললেন, সরকারি চাকরি কোনো চাকরি হলো। কোম্পানির চাকরি কর। মঞ্জুর এলাহী হেসে বললেন, ‘আমাকে চেনেটা কে? কে চাকরি দেবে?’

default-image

পরের ঘটনা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর মুখেই শুনুন। পন্নী সেখান থেকে জোর করে তাঁর অফিসে নিয়ে গেলেন। তারপর তিনি বললেন, তাঁর শ্যালক আনোয়ার দৌজা পাকিস্তান টোব্যাকোতে বিপণন বিভাগে কাজ করেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন। সেদিনই। প্রস্তুতি না থাকলেও গেলাম। আনোয়ার দৌজার সঙ্গে কথা বলতে বলতে জানলাম তিনি আমার বাবার হাইকোর্টের কর্মচারী ছিলেন। বললেন, সিভি আছে? আমি তো অবাক, সিভি আর কি থাকবে, নাম, জন্ম, বিএ, এমএ...আর তো কিছু নেই। বললেন, ওইটাই লেখো। একটা কাগজে লিখে দিয়ে এলাম। তারপর ভুলেও গেলাম।

১৯৬৫ সাল। জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে আনোয়ার দৌজা এসএম হলে হাজির হলেন। বললেন, তোমাকে একটা সাক্ষাৎকার দিতে হবে, করাচিতে। সামনের সপ্তাহে যেতে পারবে? বললাম, পারব। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার স্যুট আছে। বললাম, স্যুট তো নেই। বললেন, স্যুট পরে তো সাক্ষাৎকারে যেতে হয়। আমি আবার বললাম, আমার তো নেই। আনোয়ার দৌজা বললেন, তাহলে একটা বানাও। বললাম, আমার কাছে তো পয়সা নেই। বললেন, রমনার বেঙ্গল উল হাউসে যাও। স্যুটের অর্ডার দাও। আমার নামে লিখে রাখতে বলবে। তারপর বললেন, ফরমাল শার্ট আছে? টাই? বললাম, নেই। বললেন, সমস্যা নেই। আমি শার্ট-টাই দেব।

স্যুট, শার্ট, টাইয়ের ব্যবস্থা হলো। বিমানের টিকিট ও থাকার ব্যবস্থা করল পাকিস্তান টোব্যাকো। কোনো দিন করাচি যাইনি। আমরা হাত পা কাঁপা শুরু হলো। যা–ই হোক করাচিতে গেলাম। কোম্পানির লোকজন আমাকে বিমানবন্দর থেকে তাদের গেস্টহাউস হাউসে নিয়ে গেল। পরদিন সাক্ষাৎকার।

সাক্ষাৎকার বোর্ডের সবাই ইংরেজ। তারা আমার সম্পর্কে বলতে বললেন। বললাম, নিজের সম্পর্কে কী বলব। নাথিং টু সে (বলার কিছু নেই)। তখন বোর্ডের একজন বললেন, ‘এই চাকরিতে কি তুমি সত্যি আগ্রহী?’ আমি খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না। কিন্তু সেটা তো মুখের ওপর বলা যায় না। বললাম অবশ্যই আগ্রহী। তখন তারা কত বেতন চাই জানতে চাইলেন।

বেতনের বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না। তখন সিএসপি অফিসাররা ৪৫০ রুপিতে চাকরি জীবন শুরু করতেন। এক ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৩ টাকা। ভেবে আমি বললাম, ১ হাজার রুপি। পর মুহূর্তেই বললাম, ৯০০ দিলেও চলবে। বোর্ডের সদস্যরা মুচকি মুচকি হাসছেন। আমি ভাবলাম, বোধ হয় বেশি চেয়ে ফেলেছি। অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। তখন বললাম, ৬০০ রুপি হলেও হবে। তখন তারা জোরে জোরে হাসতে শুরু করলেন। কোম্পানির অর্থ পরিচালক বললেন, আমরা তোমাকে ৬০০ রুপি দিতে পারব না। আমি বললাম, ঠিক আছে। তিনি বললেন, ঠিক নেই। আমরা তোমার জন্য আমাদের পে স্কেল পরিবর্তন করতে পারব না। তুমি কি ১ হাজার ৯০০ রুপি নেবে? তখন আমি ভাবছি, তারা বোধ হয় ইয়ার্কি করছেন। বললাম, অবশ্যই। তখন তারা বললেন, আমাদের সঙ্গে লাঞ্চে (দুপুরের খাবার) চলো।

শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান টোব্যাকোতে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি পদে যোগ দেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। করাচিতেই দুই বছরের প্রশিক্ষণে অংশ নিলেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে গেলে ১৯৭১ সালের ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন তিনি।

চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু

স্বাধীনতাযুদ্ধের পরের ঘটনা। তখন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঢাকায় মিন্টু রোডে শ্বশুর মফিজ চৌধুরীর বাসায় উঠলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। ১৯৭২ সালের মে-জুন মাসে একদিন শ্বশুর মফিজ চৌধুরী তাঁর বাসায় লিহাই ইউনিভার্সিটি বন্ধু এফআইসিসিআইয়ের সভাপতি সঞ্চয় সেন ও অন্যান্য সফরসঙ্গীদের নৈশভোজে নিমন্ত্রণ করেন। মঞ্জুর এলাহীও উপস্থিত। সেখানে এক ফরাসি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়। রেমন্ড ক্লেয়ার নামের ওই ফরাসি ব্যবসায়ী কার্গো উড়োজাহাজ ভাড়া করে বিদেশ থেকে রাসায়নিক নিয়ে আসতেন, আর ফেরার সময় চামড়া কিনে নিয়ে যেতেন। ওই ব্যবসায়ী মঞ্জুর এলাহীকে তাঁর কোম্পানির কমিশন এজেন্ট হতে অফার করলেন। কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে মঞ্জুর এলাহী জানতে পারলেন, কমিশন যা পাবেন সেটি অনেক টাকা। তখনই তিনি ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে সমস্যা বাধল অন্য খানে। স্ত্রী নিলুফার মঞ্জুর সায় দিলেন না। পরে ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন শ্বশুর।

১৯৭২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নিজের ৩০তম জন্মদিনে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী চাকরি ছাড়লেন। তখন তাঁর মাসিক বেতন অনেক টাকা। তার বাইরে বাড়ি, গাড়িসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও ছিল। চাকরি ছাড়ার আগে তিনি বিএটির ঢাকা কারখানার ফাইন্যান্স ম্যানেজার ছিলেন। বললেন, রিকশায় করে আমি হাজারীবাগ যেতাম। দুর্গন্ধের মধ্যে ঘুরে ঘুরে চামড়া কিনতাম। আমি বেশ আনন্দ পাচ্ছিলাম।

হাজারীবাগ থেকে চামড়া কিনে রেমন্ড ক্লেয়ার-এর হল্যান্ডার গ্রুপের কাছে কমিশনে বিক্রি করে ভালোই ব্যবসা করছিলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। তখন সবগুলো ট্যানারি রাষ্ট্রমালিকানাধীন। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সরকার ট্যানারি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরের বছর প্রথমে অরিয়েন্ট ট্যানারি নিলামে তোলা হয়। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী তাতে অংশ নিলেন। সর্বোচ্চ ১২ লাখ ২২ হাজার টাকা দরে ট্যানারি কিনে নিলেন। তখন যাত্রা শুরু করল অ্যাপেক্স ট্যানারি। এতে তাঁর সঙ্গে মালিকানায় রয়েছেন এ কে এম রহমতুল্লাহ (ঢাকা-১১ আসনের সাংসদ)।

ট্যানারিতে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি করা শুরু করলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। জাপানি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান মিজুজে ছিল চামড়ার প্রথম ক্রেতা। ধীরে ধীরে ক্রেতার সংখ্যা বাড়তে থাকল। ১৪ বছর এভাবেই ব্যবসা চলল। তারপর ভাবতে লাগলেন, যেহেতু চামড়ার সর্বশেষ গন্তব্য হচ্ছে জুতার কারখানা; তাহলে কেন জুতার কারখানা হবে না। যেই ভাবা সেই কাজ। গাজীপুরের সফিপুরে ৫০ বিঘা জমিতে জুতার কারখানা স্থাপনে হাত দিলেন। ১৯৯০ সালে যখন কারখানার মাটি কাটা শুরু হলো, তখন একমাত্র ছেলে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর দেশে ফিরে প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হলেন।

default-image

বুয়েটের একজন স্থপতির নকশায় কারখানা ভবন নির্মিত হয়। বিদেশ থেকে আসে আধুনিক যন্ত্রপাতি। ১৯৯১ সালে প্রথম ধাপে ১৫০ শ্রমিক দিয়ে দৈনিক ১ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের সক্ষমতার এই শতভাগ রপ্তানিমুখী কারখানাটি উদ্বোধন হলো। জার্মানিতে জুতা রপ্তানি হতে থাকল। তবে অনভিজ্ঞতা, নিম্নমান ও সঠিক সময়ে সরবরাহ করতে না পারায় দ্বিতীয় মৌসুমেই ক্রয়াদেশ কমতে থাকে। তখন দুশ্চিন্তার পড়ে যান উদ্যোক্তারা। আবার নতুন ক্রেতা খুঁজতে থাকেন।

অ্যাপেক্স ট্যানারির চামড়ার জাপানি ক্রেতা ওশেন ট্রেডিং ও মিজুজের সূত্র ধরে দেশটির বৃহত্তম জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মারুটোমির মালিকের সঙ্গে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর পরিচয় হয়। অনেক অনুরোধের পর প্রতিষ্ঠানটি চাকরিজীবী পুরুষদের একটি নির্দিষ্ট নকশার শু বানানোর ক্রয়াদেশ দিল। তখন তারা কোরিয়া থেকে এই জুতা বানাত। তবে প্রথম ক্রয়াদেশের ৯৭ শতাংশ জুতাই মান উতরে যেতে পারল না। সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্রিনসবার্গ নামের একজন পরামর্শককে আনা হলো।

১৯৯৪ সালে জাপানে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে আবার বিপদে পড়ে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার। কারণ তাদের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়। সমস্যা সমাধানে বাবা-ছেলে একসঙ্গে ইতালিতে গেলেন। অ্যাপেক্স ট্যানারির চামড়ার ক্রেতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলকির মালিক মি. অ্যাডেলকির সঙ্গে দেখা করলেন। ইতালিতে তাঁদের বিশাল জুতার কারখানাও ছিল। শুরুতে পাত্তা না দিলেও বাংলাদেশে হঠাৎ এসে কারখানা দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে গেলেন অ্যাডেলকি। শেষমেশ কারিগরি সহায়তা দিতে রাজি হলেন। তারপর ইতালি থেকে অ্যাডেলকির লোকজন এসে কারখানার ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি বদলে দিলেন। ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে থাকল অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার।
২০১৩ সালে অ্যাডেলকির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়। তারপর থেকে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার এককভাবেই ব্যবসা করছে। এদিকে তাইওয়ানের গ্রিনল্যান্ড ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যৌথ বিনিয়াগে ব্লু ওশান ফুটওয়্যার নামে রপ্তানিমুখী আরেকটি জুতার কারখানার সঙ্গে যুক্ত হন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ও তাঁর ছেলে। সফিপুরে এই কারখানা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ব্র্যান্ড ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের জন্য নারীদের জুতা রপ্তানি করা হচ্ছে।

দেশের বাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে রপ্তানিমুখী কারখানার উল্টো পাশে আরেকটি কারখানা করলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। শুরু হলো নতুন এক যাত্রা। বর্তমানে সারা দেশে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের প্রায় ৬০০ বিক্রয়কেন্দ্র আছে। তার মধ্যে অর্ধেকই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বললেন, জুতার কারখানায় শুরুর দিকে বছরে ৩-৪ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন ও রপ্তানি হতো। পরে বছরে উৎপাদন ও রপ্তানি পৌঁছেছিল ৫৫ লাখ জোড়ায় এবং বর্তমানে কোভিড-পরবর্তী সময়ে আনুমানিক উৎপাদন ও রপ্তানি বছরে ৩০ লাখ জোড়া। তার বাইরে দেশের বাজারের জন্য বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ লাখ জোড়া এবং বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করছি আমরা। প্রথম দিকে কষ্ট হলেও আমি লেগে ছিলাম। নাসিমের (সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর) ওপর দিয়েও অনেক ঝড়ঝাপটা গেছে। সে কারণেই আজকের অবস্থানে পৌঁছা গেছে।

বর্তমানে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর ছেলে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পড়াশোনা শেষে ২০ বছর বয়সে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি পদে যোগ দেন সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। বেতন পাঁচ হাজার টাকা। গাজীপুরের সফিপুরে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার কারখানার ইট, বালু কেনা থেকে শুরু করে সবই করেছেন। ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে নেতৃত্বের ভার কাঁধে নিয়েছেন।

সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘চট্টগ্রামের মিনহার ফুটওয়্যার কেডস রপ্তানি করত। তবে চামড়ার জুতা রপ্তানির কাজটি প্রথম করেছে অ্যাপেক্স। বর্তমানে সেই রপ্তানি আরও সুদৃঢ় হয়েছে। যদিও যাত্রাটি মোটেই সহজ ছিল না। আধুনিক কারখানা গড়লেও কীভাবে জুতা বানাতে হয়, সেটি আমরা জানতাম না। দক্ষ জনবলও ছিল না। তবে বিভিন্ন সময় জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালিসহ নানা দেশের অভিজ্ঞ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় আমরা আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।’

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন