বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেশে নাচকে ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয় না। সেটিই করে দেখিয়েছেন পূজা সেনগুপ্ত। অন্য ব্যবসার মতো তাঁর দল তুরঙ্গমীও গ্রাহকের আগ্রহ ও চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে সাজান নাচের অনুষ্ঠান। এ ছাড়া নির্ধারিত কিছু প্রযোজনাও তৈরি থাকে। এভাবে বছরে ৬০ থেকে ৬৫টি নৃত্য প্রদর্শনী করে তুরঙ্গমী। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎসবেও অংশ নেয় তারা।

২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করার পর থেকেই নৃত্য প্রদর্শনীর ব্যবসায় বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছে তুরঙ্গমী। যাদের আমন্ত্রণে তারা নৃত্য প্রদর্শন করেছে, তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো বহুজাতিক এইচএসবিসি ব্যাংক ও ডেল কম্পিউটার করপোরেশন; বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব); ঢাকার ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতীয় দূতাবাস।

নতুন করে প্রতিষ্ঠানটি আলোচনায় এসেছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করে। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের ওই আয়োজনে দাবার কোর্টের ওপর শেখ মুজিবের অদম্য সত্তাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তুরঙ্গমীর শিল্পীরা। এটি বেশ ব্যয়বহুল প্রযোজনা ছিল বলে জানা গেছে। শুধু বঙ্গবন্ধুর জীবনীই নয়, ঢাকার ভিয়েতনাম দূতাবাসের অনুরোধে সেই দেশের জাতির পিতা হো চি মিনের জীবনী নিয়েও নৃত্য প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান তুরঙ্গমী।

মুজিব চিরন্তন মঞ্চের তিন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের অন্যতম গ্রে বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক সাইফুল আজিম বলেন, ‘এমন একটা মঞ্চে আমরা বাংলাদেশকে যেভাবে উপস্থাপন করতে চাইছিলাম, তার জন্য বিশ্বমানের কাজের দরকার ছিল। সে কাজটা খুব সহজভাবে করেছে তুরঙ্গমী।’ তিনি বলেন, দেশে ইভেন্টের বাজারের আকার ২ হাজার কোটি টাকা, যার ২০ শতাংশ পান দেশি-বিদেশি শিল্পীরা।

পূজা বলেন, ‘আমি যখন বিশ্বভারতী থেকে এসে পেশাদার নাচের দল তৈরি করে ব্যবসাটা দাঁড় করানোর চেষ্টা করি, তখনো বাজারে ঠিক অর্থের বিনিময়ে নাচ দেখার প্রচলন হয়নি। এমনকি পৃষ্ঠপোষকও পাওয়া যেত না। কিন্তু বাণিজ্যকে বাদ দিয়ে শুধু যে শিল্পের চর্চা হতো, তা দিয়ে ঠিক পেশাদারি কাজ হতো না। অথচ বড় কাজ ঠিকই হতো, যার জন্য বিদেশ থেকে শিল্পীর দল আসত। তাই আমিও ভাবতে থাকি এখানে কী কী বদল আনা যায়।’ তিনি প্রথমে ৬০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নাচের জন্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তুরঙ্গমী গড়ে তোলেন।

পদার্থবিজ্ঞানে ক্যারিয়ার গঠন না করলেও পদার্থবিজ্ঞানে শেখা জ্ঞান ঠিকই কাজে লেগে যায় নাচে। শব্দে, আলোতে, সেট ডিজাইনে যুক্ত হতে থাকে প্রযুক্তি। ভিন্নতা আনা হয় প্রযোজনায়। এভাবেই নিজেদের বাজার তৈরি করে তুরঙ্গমী।

সাইফুল আজিম বলেন, ‘তুরঙ্গমীর সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হচ্ছে তারা নৃত্যশিল্পের সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর প্রযোজনা এখনো কম হয়। সে জন্য দেশে যখন আন্তর্জাতিক মানের কাজের প্রয়োজন হয়, তখন আমরা বিদেশি প্রযোজনা সংস্থা বা শিল্পী আনি। এতে আমাদের খরচ বেশি হয়। তুরঙ্গমী থাকায় এখন আমাদের কাজটা সহজ হচ্ছে।’

default-image

তবে বাজার তৈরি হলেও নৃত্য প্রযোজনা সংস্থার পক্ষে বাণিজ্যিকভাবে টিকে থাকা খুব সহজ নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে শিল্পের মেধাস্বত্ব নিয়ে তেমন কোনো কড়াকড়ি নেই। নেই কোনো আইনি কাঠামো। পূজার মুখেই শোনা যাক, দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি করা প্রযোজনা অনেক সময়ই নকল হয়ে যায়। আবার কাছাকাছি কিছু কাজ কম খরচে করে পেশাদারদের আয়ে ব্যাঘাত ঘটান অপেশাদার শিল্পীরা। তারপরও নিজেদের বাজার প্রতিনিয়ত বড় করছে তুরঙ্গমী।

পূজা বলেন, ‘আমাদের শক্তির জায়গা আমাদের সৃষ্টিশীলতা। এখানে আমরা বিন্দুমাত্র ছাড় দিই না। আমাদের প্রযোজনার প্রয়োজনে আমরা সুর সৃষ্টি ও গান তৈরি করাই পেশাদারদের দিয়ে। এভাবেই আমরা অনেকের মধ্যে অন্যতম শিল্পীসত্তা তৈরি করতে পারি, যার মাধ্যমে আয় করা সম্ভব।’

তুরঙ্গমীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী, জানতে চাইলে পূজা শহরকেন্দ্রিক প্রদর্শনী বাড়ানোর কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো অনেক কম অনুষ্ঠান হয়। অনেক মঞ্চ খালি পড়ে থাকে। যেমন হাতিরঝিলের মুক্তমঞ্চ। শহরের এ রকম মঞ্চগুলোতে অনুষ্ঠান বাড়লে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেমন জোরদার হবে, তেমনি প্রযোজনা সংস্থাগুলোও বেড়ে উঠতে পারবে। মঞ্চগুলোও আর্থিকভাবে লাভবান হবে।

নাচকে মূল পেশা হিসেবে নেওয়া প্রসঙ্গে পূজা বলেন, এখনো সেই অবস্থা তৈরি হয়নি। করোনার সময় যখন শো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, শিল্পীদের সম্মানী বা বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া নিয়মিত কাজ পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত। তারপরও আস্তে আস্তে ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। শহরে শিল্প ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়লে শিল্পীরা দ্বিতীয় কোনো পেশার কথা চিন্তা না করে নাচকেও বেছে নিতে পারবেন।

একেকটি নৃত্য প্রদর্শনী আয়োজনের খরচ, প্যাকেজের সর্বনিম্ন দাম, গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা প্যাকেজের দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়, জানতে চাইলে পূজা বলেন, প্রযোজনায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি, প্রযোজনার সময়, মঞ্চ ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য ১ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে তুরঙ্গমী।

অনন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারায় ২০১৭ সালে তুরঙ্গমীকে সম্মানজনক নূরুল কাদের সম্মাননায় ভূষিত করে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক এবং চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব প্ল্যাটফর্ম।

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন