বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

স্বামী আবু দাউদ একজন ব্যবসায় অন্তপ্রাণ মানুষ, পর্যটনের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ের সঙ্গেও তিনি জড়িত। ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেই তিনি নতুন ব্যবসায়ের সিদ্ধান্ত নেন। কুয়ালালামপুর থেকে মধুচন্দ্রিমা সেরে দেশে ফেরার বছর দুয়েক পরে ২০১৭ সালের শেষ দিকে স্ত্রীর ভাবনাকে বাস্তব করে তুলতে চান তিনি। মুনিরা-দাউদ দুজনে মিলে গড়ে তোলেন ‘কোকা ল্যাব’ চকলেট। চকলেট তৈরির উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নামার পরের সাড়ে তিন বছরের মধ্যে শেষ দেড় বছর কেটেছে করোনায়। তারপরও কোকা ল্যাবের বার্ষিক আয় ৬০ থেকে ৮০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে বলে জানান এই উদ্যোক্তা দম্পতি।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জে কোকা ল্যাবের কারখানায় কথা হয় মুনিরা ও দাউদের সঙ্গে। তাঁরা জানান, ১ হাজার ৩০০ বর্গফুটের কারাখানাটিতে ছয়জন কর্মী কাজ করেন। কারখানায় হালকা কিছু মেশিন আছে, যেগুলোতে চকলেট গোলানো, বিভিন্ন স্বাদ দেওয়া ও আকার কী হবে তা নির্ধারণের কাজগুলো করেন ওই কর্মীরা।

মিঠে রোদের সকালে গরম চকলেটের মিষ্টি গন্ধে ম–ম করছিল কারখানার ভেতর। একবার মুনিরা যাত্রা শুরুর কথা বলেন তো আরেকবার দাউদ ব্যবসায় বৃদ্ধির গল্প শোনান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া আবু দাউদ বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে দেওয়া আমার রেস্তোরাঁ ব্যবসাটা বিফলে গিয়েছিল। সেই শিক্ষা থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিই, আগে চকলেট সম্পর্কে লেখাপড়া করব।’ যেমন কথা, তেমন কাজ। মুনিরা–দাউদ দম্পতি ২০১৫ সালে আবার কুয়ালালামপুরে যান। চকলেট তৈরির ওপর একাডেমি অব প্যাস্ট্রি অ্যান্ড কালিনারি আর্টস মালায়েশিয়া নামের প্রতিষ্ঠানে দুই সপ্তাহের কোর্স করেন তাঁরা। ওই কোর্স করার পরে তাঁদের দুটি লাভ হয়। প্রথমত তাঁরা চকলেট তৈরির কলাকৌশল শিখতে পেরেছেন। দ্বিতীয়ত, চকলেটের কাঁচামাল ও মেশিন কোথা থেকে কেনা যায় সেই সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। এই জ্ঞানের ভিত্তিতেই তাঁরা ৩০ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে চকলেটের ব্যবসা শুরু করেন।

মুনিরা বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল, আমরা ভিন্ন স্বাদের চকলেট বানাব যেটা বাজারে পাওয়া যায় না। এজন্য একজন চকলেটিয়ার বা চকলেটের স্বাদ বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দিয়েছি। এর ফলও দারুণ পেয়েছি।’ হাসতে হাসতে তিনি বলেন, কোকা ল্যাবের একটি চকলেট আছে, যার সঙ্গে মরিচের স্বাদ যুক্ত করা হয়েছে। মিষ্টি চকলেট খাওয়ার পরে মুখে ঝাল ঝাল একটা ভাব আসবে। কিন্তু ঠিক ঝালও নয়, একদম শতভাগ চকলেট।

সাড়ে তিন বছরে কোকা ল্যাবের ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে অনেক স্বাদের চকলেট—কমলা, বাদাম, কফি, খেজুর ইত্যাদি। এগুলোর কোনোটা সাধারণ বার, কোনোটা দেখতে ছোট একটা হৃৎপিণ্ডের মতো, আবার কোনোটা ফুলের মতো—এমন দুই শতাধিক আকারের চকলেট বানান তাঁরা। দাউদ বলেন, ‘আমাদের মূল ব্যবসা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে। তারা যেমন ফরমাশ দেয়, সেই মাপের চকলেট বানিয়ে দিই আমরা। আবার ঈদ, রোজা, বড়দিন, নববর্ষ, ভ্যালেন্টাইনস ইত্যাদি উপলক্ষেও চকলেটের ফরমাশ আসে। ফলে চকলেট হয় নানান রকমের।’

কোকা ল্যাব এ পর্যন্ত কাজ করেছে রবি ১০ মিনিট স্কুল, হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও, হোটেল রিজেন্ট ও শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে। এ ছাড়া ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমেও বিক্রি হয় চকলেট।

মুনিরা বলেন, ‘আমরা শুরু থেকে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করেছি, যেটাকে বড় করা যায়। তাই মান নিয়ন্ত্রণে সরকারের নির্ধারিত নিয়মকানুন মানার চেষ্টা করেছি। আমাদের পণ্যের বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) সার্টিফিকেট আছে। হালাল সার্টিফিকেটও আছে।’

ব্যবসা করতে এসে কেমন অসুবিধায় পড়তে হয় জানতে চাইলে এই ‘চকলেট দম্পতি’ জানান, এখন পর্যন্ত কোনো অসুবিধা হয়নি। করোনার মধ্যে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাধা পেলেও গুটি গুটি পায়ে ঠিকই এগিয়েছেন তাঁরা। ইচ্ছা আছে এ বছর বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষে ব্যবসাটিকে আরও বড় করার। তবে এতটুকুই তাঁদের স্বপ্ন নয়। তাঁরা চান বাংলাদেশেও হবে চকলেটের জাদুঘর, যেখানে শেখানো হবে চকলেট বানানোর কৌশল। মুনিরা বলেন, ‘শুধু বিক্রি বা আয় বৃদ্ধি নয়, আমরা অন্যের জীবনকেও চকলেটের মতো মধুর করতে চাই।’

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন