বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লুচিয়া বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার কোনো মূলধন ছিল না। তারপরও সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছি। এখন আমার পণ্য তৈরির কাজ করেন কয়েকটি গ্রামের ৩০০ থেকে ৪০০ নারী। তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমি কাজ দিই। পরে পণ্য বুঝে নিয়ে আসি। মজুরির টাকাও তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দিই। এভাবেই চলছি। চলতি মাসে আমি ৩২ লাখ টাকার কার্যাদেশ পেয়েছি।’

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়াসহ আশপাশের উপজেলাগুলোর বিভিন্ন গ্রামে খেজুরপাতা ও কাশফুলের খড় দিয়ে নানান ধরনের পণ্য তৈরি হয়। উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—কুকুর ও বিড়াল ঘুমানোর বাস্কেট বা ঝুড়ি, ছাতা রাখার ঝুড়ি, ফল রাখার ঝুড়ি, গোলাকৃতির ও চারকোনা ঝুড়ি, সার্ভিং ট্রে ঝুড়ি, খেলনা রাখার ঝুড়ি, ফুলের পাত্র রাখার ঝুড়ি, বাসা ও অফিসের ওয়েস্ট বা বর্জ্য ফেলার ঝুড়ি, কাটলারি ঝুড়ি, স্যুটকেস ঝুড়ি, জুয়েলারি রাখার ঝুড়ি, ফিশ টেবিল ম্যাট, সিলিন্ডার ঝুড়ি ইত্যাদি।

default-image

ইউরোপ-আমেরিকায় ছয় কোটি টাকার বাজার

বর্তমানে স্থানীয় শিমুলিয়া গির্জার হস্তশিল্প বিভাগের পাশাপাশি লুচিয়া বিশ্বাসসহ সাত উদ্যোক্তা খেজুরপাতা ও কাশফুলের খড় দিয়ে পণ্য তৈরির কাজে নিয়োজিত। অন্য ছয় উদ্যোক্তা হলেন রাজীব বিশ্বাস, অসীম বিশ্বাস, সজল বিশ্বাস, আকরাম হোসেন, গোপাল বিশ্বাস ও রকি। এসব উদ্যোক্তার কাছ থেকে পণ্য কিনে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরে তা বিদেশে রপ্তানি করে।

এদিকে শিমুলিয়ার আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রামে খেজুরপাতা ও কাশফুলের খড়ের পণ্য তৈরির কাজ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব গ্রামের অন্তত পাঁচ হাজার নারী এখন এই কাজের সঙ্গে জড়িত, যাঁরা ঘরে বসেই মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা রোজগার করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।

অসীম বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিমুলিয়া গ্রাম থেকে মাসে অন্তত ৫০ লাখ টাকার পণ্য ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। সেই হিসাবে বছরে অন্তত ছয় কোটি টাকার পণ্য এখান থেকে যায়, যার পুরোটাই বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।’

শিমুলিয়ার পণ্য সুইডেন, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, স্পেন, ব্রাজিল, পেরু, কানাডা, আমেরিকাসহ বিশ্বের অন্তত ৩০টি দেশে রপ্তানি হয় বলে জানা গেছে।

default-image
যশোরের ঝিকরগাছাসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার ২০ গ্রামে এখন খেজুরপাতা আর কাশফুলের খড় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের রপ্তানিমুখী পণ্য তৈরি হচ্ছে। আমার কোনো মূলধন ছিল না। তারপরও সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছি। এখন আমার পণ্য তৈরির কাজ করেন কয়েকটি গ্রামের ৩০০ থেকে ৪০০ নারী।
—লুচিয়া বিশ্বাস, উদ্যোক্তা, শিমুলিয়া গ্রাম, ঝিকরগাছা, যশোর।

জানতে চাইলে ঢাকার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা হিপ বাংলাদেশের হস্তশিল্প বিভাগের ব্যবস্থাপক রঞ্জিত কুমার সরকার বলেন, ‘বিদেশে শিমুলিয়া গ্রামের তৈরি খেজুরপাতা আর কাশফুলের খড়ের তৈরি পণ্যের বড় বাজার রয়েছে। আমরা ৩০টি দেশে এসব পণ্য রপ্তানি করি। পোষা বিড়াল ও কুকুরের ঘুমানোর ঝুড়ি, লন্ড্রি করার কাপড় রাখার ঝুড়ি, ফল রাখার ঝুড়িসহ বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প পণ্য রয়েছে রপ্তানির তালিকায়। গত বছর আমরা ২ কোটি টাকা মূল্যের অন্তত ৩০ হাজার পিস পণ্য রপ্তানি করেছি। করোনা পরিস্থিতির আগে রপ্তানি আরও বেশি ছিল।’

শিমুলিয়া গির্জার ভ্যালেরিয়ান হস্তশিল্প বিভাগ নিউজিল্যান্ডে, খুলনার বাংলাদেশ হস্তশিল্প একতা সেবা সংস্থা (বেজ) স্পেন, ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্রে এবং ঢাকার ক্ল্যাসিক নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান আরও কয়েকটি দেশে পণ্য রপ্তানি করছে।

সম্প্রতি শিমুলিয়া ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে খেজুরের পাতা রোদে শুকানো হচ্ছে। কাশফুলের খড়ও রয়েছে প্রায় সব বাড়িতে। আর নারীরা বাড়ির বারান্দা বা আঙিনায় বসে খেজুরপাতা ও খড় দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঝুড়ি তৈরি করছেন। এই কাজ করে নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ায় শিমুলিয়াসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে এখন কাঁচা ঘর সচরাচর চোখে পড়ে না বললেই চলে। প্রতিটি বাড়িই বেশ পরিপাটি। কোনো পরিবারেই যেন আর্থিক অনটন নেই।

এই গ্রামের শাহিদা খাতুন জন্মগত প্রতিবন্ধী। তাঁর দুই পা আর এক হাত নেই। তবু তাঁর জীবনসংগ্রাম থেমে থাকেনি। এক হাতেই তিনি খেজুরপাতা ও খড় দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করেন। শুধু তা-ই নয়, যশোর সরকারি এমএম (মাইকেল মধুসূদন) কলেজ থেকে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিও অর্জন করেছেন। কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাননি। তাই এখন এই কাজ করে মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় করেন। এলাকার প্রতিবন্ধী নারীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলছেন তিনি।

শাহিদা খাতুন বলেন, ‘শিমুলিয়া গির্জার ভ্যালেরিয়ান হস্তশিল্প থেকে আমার মা প্রথমে এই কাজ শেখেন। পরে আমিও শিখেছি। এসব পণ্য তৈরি করে মাসে পাঁচ হাজার টাকার মতো রোজগার করা যায়। ভ্যালেরিয়ান হস্তশিল্প থেকে এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হয়।’

ভ্যালেরিয়ান হস্তশিল্প কেন্দ্রের ইনচার্জ জাসিন্তা কস্তা জানান, তাঁরা গত বছর সরাসরি ২০ লাখ টাকার পণ্য নিউজিল্যান্ডে রপ্তানি করেছেন। এ ছাড়া খুলনার বাংলাদেশ হস্তশিল্প একতা সেবা সংস্থার (বেজ) মাধ্যমে ইতালি, স্পেন, আমেরিকা ও কানাডায় আরও ২০ লাখ টাকার পণ্য পাঠান।

default-image

শুরুর কথা

জানা গেছে, শিমুলিয়গির্জার ফাদার আত্তেলিও বস্কাতো ও মাদার রোজারিয়া গ্রামের নারীদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে ভ্যালেরিয়ান হ্যান্ডিক্র্যাফট গড়ে তোলেন। ওই বছরেই তাঁরা খেজুরপাতা আর খড় দিয়ে তৈরি কিছু হস্তশিল্প পণ্য নমুনা হিসেবে নিজেদের দেশ ইতালিতে পাঠান। পরে ইতালিতে চাহিদা বাড়তে থাকায় রপ্তানিও বৃদ্ধি পায়। এর ধারাবাহিকতায় অন্যান্য দেশেও রপ্তানি শুরু হয়।

শিমুলিয়া গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই নারীরা হস্তশিল্প পণ্য তৈরির কাজ করেন। তাঁদের প্রশিক্ষণ দেয় ভ্যালেরিয়ান হ্যান্ডিক্র্যাফট। শিমুলিয়া গির্জার বর্তমান ফাদার বাবলু লরেন্স সরকার বলেন, লাভের উদ্দেশ্যে নয়, গ্রামের নারীদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে গির্জায় হস্তশিল্প বিভাগ গড়ে তোলা হয়েছে। এই বিভাগের মাধ্যমে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মমুখী করা হচ্ছে। ফলে তাঁদের তৈরি পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত মুনাফার টাকা নারীদের দেওয়া হয়।

বাবলু লরেন্স সরকার আরও বলেন, পণ্য তৈরির উপকরণ যে দামে কেনা হয়, তার চেয়ে কম দামে নারীদের কাছে বিক্রি করা হয়। পরে আবার তাঁদের তৈরি করা পণ্য ন্যায্যমূল্যে কিনে নেওয়া হয়।

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন