খন্দকার আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, ‘আমাদের দেশের মানুষ স্বাস্থ্যগত সমস্যা মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেলেই কেবল চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন। তাতে তাঁরা সেকেন্ডারি বা টারশিয়ারি সেবা পান। অথচ নিয়মিত প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিলে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। এ জন্য আমরা প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করছি।’

কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়ালেখা করা মামুনের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার প্রেক্ষাপটটা একটু ভিন্ন। ১৯৯৮ সালে ঢাকার আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করে ওই বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ২০০৮ সালে যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান চিকিৎসা প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা বা পিএইচডি করার জন্য।

খন্দকার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মা-বাবা চাইতেন, আমি চিকিৎসক হব। কিন্তু আমার ইচ্ছে ছিল প্রকৌশলী হওয়ার। যুক্তরাজ্যে পড়তে গিয়ে এই দুই ইচ্ছের সংযোগ ঘটল। গবেষণার অংশ হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক বিষয় জানতে হয়েছে। কথা বলতে হয়েছে অনেক বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকের সঙ্গে। কাকতালীয়ভাবে আরেকটি ঘটনা ঘটে সে সময়। মায়ের ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ে। তাতে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।’

২০১২ সালে কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে গবেষক হিসেবে যোগ দেন মামুন। সেখানকার ল্যাবে স্ট্রোক, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর হেলথ, ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস, বডি সেন্সর নেটওয়ার্ক ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করেন তিনি। মামুন বলেন, ‘কাজ করতে করতেই আমার দেশে ফিরে একটি ল্যাব প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে তৈরি হয়। সেই ইচ্ছে থেকেই ২০১৪ সালে দেশে এসে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিই। আর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে শুরু করি স্বপ্নের অ্যাডভান্সড ইন্টেলিজেন্ট মাল্টিডিসিপ্লিনারি সিস্টেমস (এইমস) ল্যাবের কার্যক্রম।’

এইমস ল্যাবের প্রথম প্রকল্পটিই ছিল ক্লাউড বেজড মেডিকেল সিস্টেম ফর হেলথ মনিটরিং নিয়ে। এ কাজের জন্য ২০১৬ সালে সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগ থেকে প্রথম অনুদান পান। প্রকল্পটির বাণিজ্যিক সফলতার দিক বিবেচনা করে একে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। এ কাজে সহযোগী হয়ে আসে দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন। তাদের জিপি এস্কেলেটর প্রোগ্রাম থেকে ১১ লাখ টাকার বিনিয়োগ পায় সিমেড।

এরপর মামুনকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এখন পর্যন্ত ১০ লাখ ডলার বা প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ ও অনুদান পেয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। মামুন জানান, স্টার্টআপ উদ্যোগ হিসেবে বর্তমানে বার্ষিক ২৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের। মাত্র তিনজন কর্মী নিয়ে শুরু করা প্রতিষ্ঠানটিতে এখন ৬০ জন কাজ করছেন।

শুধু সিমেড নয়, এইমস ল্যাবের মাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবনের নানা সমস্যা খুঁজে বের করে তার সমাধানে বিভিন্ন প্রকল্প নিচ্ছেন মামুন। অটিজম আক্রান্ত শিশু, আলঝেইমার বা স্মৃতিভ্রংশ, পারকিনসন ইত্যাদি রোগের ব্যবস্থাপনা নিয়েও কাজ করছেন তাঁরা।

সিমেড মূলত তিনটি ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে কাজ করে। প্রথমটি বিভিন্ন অফিস, করপোরেট ও কারখানার জন্য। মডেলটির নাম ‘ডিজিটাল হেলথ কর্নার’। এ ব্যবস্থার আওতায় সংশ্লিষ্ট গ্রাহক প্রতিষ্ঠানে একটি ডিজিটাল হেলথ কর্নার থাকে। সেখানে কর্মীদের নিয়মিত সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেয় সিমেড। প্রত্যেক কর্মীর জন্য থাকে একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য হিসাব। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তার কর্মীর স্বাস্থ্যগত বিষয়ে অবগত থাকতে পারবে।

দ্বিতীয় ব্যবসা মডেলটি ফার্মেসিসংক্রান্ত। যার নাম ‘সুস্বাস্থ্যসেবা’। দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি মানুষ তাঁর প্রথম চিকিৎসাসহায়তা পান স্থানীয় ফার্মেসি থেকে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসিতে গিয়ে ওষুধ কেনেন অনেকে। তাই ডিজিটাল পদ্ধতির সহায়তায় ফার্মেসি থেকেই টেলিমেডিসিন পদ্ধতিতে চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর যোগাযোগের ব্যবস্থা করা হয়। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ শুনে ব্যবস্থাপত্র দেন, যা ডিজিটাল পদ্ধতিতেই ফার্মেসি এবং রোগীর কাছে পৌঁছে যায়। মামুন বলেন, ‘আমরা চাই প্রতিটি এলাকায় অন্তত একটা করে ফার্মেসি গড়ে উঠুক, যিনি হবেন ওই এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যের অভিভাবক।’

তৃতীয় মডেলটিকে জেনারেল প্র্যাকটিশনার বা জিপি মডেল বলা হয়। এটি স্বাস্থ্যসেবা দেয় এমন সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রাহকদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা যাচাই করেন ও প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে দেন। কারও কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে সেটি চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় ঘরে বসেই প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ করে দিচ্ছে সিমেড।

সিমেডের প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবা মানে শুধু চিকিৎসক আর হাসপাতালে যাওয়া নয়। সরকার, দাতা সংস্থা, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধের দোকানসহ সবাই যুক্ত থাকবেন আমাদের কার্যক্রমের সঙ্গে। এটাকে সিমেড বলছে ডিজিটাল হেলথ ইনক্লুশন।

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন