default-image

শুরুটা কী ওই সেন্টারেই হলো?

আরিয়ান কবির: পিএইচডি প্রোগ্রাম শেষ করার পর ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান তহবিল (এনএসএফ) থেকে ৫০ হাজার ডলারের একটা ফান্ড পাই। আমাদের সাত সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, এই সময়ের মধ্যে অন্তত ১০০ জন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলতে হবে। সেখান থেকে চিহ্নিত করতে হবে, তাঁদের সমস্যা কোথায়। আমরা সাত সপ্তাহে ১৫০ গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা চিহ্নিত করি। সেখান থেকেই আমাদের কোম্পানির যাত্রা শুরু। এর আগে ২০১৭ সালে আমরা জার্মানির একটি প্রতিযোগিতায় (কুকা উদ্ভাবন পুরস্কার) ফাইনালিস্ট হয়েছি। সেই সুবাদে জার্মানিভিত্তিক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখার সুযোগ পাই। পিএইচডি শেষে কোম্পানি শুরু করার কিছু দিনের মধ্যেই করোনা মহামারি শুরু হয়৷ এতে শ্রমিকের অপ্রতুলতা দেখা দেয়। তখন সব মানুষ চিন্তা করতে শুরু করেন এসব সমস্যা কীভাবে দূর করা যায়। আমরাও বাজার পাওয়া শুরু করি। শুরুতে একটা অ্যাঞ্জেল বিনিয়োগকারী থেকে অল্প কিছু বিনিয়োগ নিয়েছি, যা দিয়ে আমাদের কোম্পানির জন্য একটা রোবট কিনি। এর কিছুদিন পর এনএসএফ থেকে আরেকটা অনুদান পাই। এটা আর অ্যাঞ্জেল বিনিয়োগকারীর ফান্ড এক করে আমাদের যাত্রা শুরু হয়।

আমরা প্রথমে যে কাজটা করি সেটা হলো, বাসের যন্ত্রপাতির কাজ করে এমন একজন গ্রাহকের কাছে যাই। যদিও তখনো আমাদের প্রোডাক্ট তৈরি হয়নি। তারা বিভিন্ন কম্পোজিট ফাইবার গ্লাসের কাজ করে। তাঁদের আয়ের ৭৫ শতাংশ শ্রমিক খরচে চলে যায়। তাঁকে বললাম, আমরা একটা রোবট বানাব যেটা নিজে নিজেই প্রোগ্রাম তৈরি করবে। ওই একটা রোবট দিয়েই অনেক কাজ করা যাবে। বুঝালাম, যা কিছু রোবটের সামনে নিয়ে আসা হবে, তা স্ক্যান করে রোবট নিজে নিজেই প্রোগ্রাম তৈরি করবে। অর্থাৎ একই রোবট নিজে নিজেই অনেক কাজ করতে পারবে। কথাগুলো শুনে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

কিন্তু আপনাদের তো তখনো রোবট ছিল না?

আরিয়ান কবীর: হ্যাঁ। আমাদের প্রোডাক্ট বা ট্র্যাক রেকর্ড কোনোটাই ছিল না। গ্রাহক হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে ভেবে আমরা তাদের প্রস্তাব দিলাম, রোবট একবারে না কিনেও সেবা হিসেবেও এটা তারা নিতে পারে। বললাম, তুমি আমাদের থেকে একটা রোবট নাও একজন শ্রমিকের পারিশ্রমিক বাবদ। তাকে কোনো প্রশিক্ষণ দিতে হবে না৷ রোবট ম্যাজিকের মতো সব কাজ করবে। তুমি মাসে মাসে বেতন দিয়ে দিবে। তখন সে দেখল, এতে তার কোনো রিস্ক নেই। কাজ না করলে টাকা দিতে হবে না। এরপরে সে রাজি হলো। আমাদের প্রেজেন্টেশন দেখে সে আমাদের সঙ্গে তিন বছরের জন্য চুক্তি করে।

আপনাদের প্রোডাক্ট সম্পর্কে বলুন।

আরিয়ান কবির: আমরা আপাতত বিভিন্ন সারফেস ফিনিশিং অপারেশনেই আছি। এটা হতে পারে সেন্ডিং, পলিশিং, কোটিং, গ্রাইন্ডিং, পেইন্টিংসহ যেখানে হাত দিয়ে কাজ করা হয়। সেসব কাজের জন্য আমরা বাজার থেকে রোবট কিনে আনি। তারপর সেটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রোগ্রাম চালাই। আমরা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সফটওয়্যার কোম্পানি। হার্ডওয়্যারগুলো কিনে এনে সেটির সঙ্গে স্পেসিফিক সেন্সর, টুলস এগুলো যুক্ত করে সেটির জন্য সফটওয়্যার সমাধান তৈরি করি।

গ্রে ম্যাটার রোবোটিকস কেমন সাড়া পাচ্ছে?

আরিয়ান কবির: আমরা রোবোটিক বিজনেস রিভিউর (আরবিআর) ৫০ উদ্ভাবনী পুরস্কার পেয়েছি। এর মানে হলো, আমরা এখন রোবোটিকস এআই ইনোভেশনের জন্য বিশ্বের সেরা ৫০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি। এই পুরস্কার পাওয়াতে আমরা সারা পৃথিবী থেকে সাড়া পেতে শুরু করি।

তা ছাড়া আমরা কিন্ত সেবা হিসেবে রোবোটিকস (RaaS)-এর সেবা দিই। আমাদের গ্রাহক কিন্তু রোবট কিনে নেয় না। আমাদের রোবটগুলো তারা ‘শ্রমিক’ হিসেবে তাদের প্ল্যান্টে ব্যবহার করে। ফলে গ্রাহকদের কিন্তু রোবট কেনার এককালীন খরচ বহন করতে হয় না।

নিজেরা রোবট বানাচ্ছেন না কেন?

আরিয়ান কবির: সেটির তো দরকার নেই। রোবট বানানোর অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। আর অন্যান্য কারখানাগুলোর দরকার ওদের কাজের একটা সমাধান। রোবটটা কে বানাচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। রোবট কাজটা ঠিকভাবে করছে কি না, সেটিই দরকারি। আমরা সেই সলিউশনটাই দিচ্ছি। আমাদের কাজ হচ্ছে, গ্রাহকের সমস্যা বুঝে তাকে একটা সমাধান প্রস্তাব করা। গ্রাহকের সেটা পছন্দ হলে তখন আমরা সমাধানটা করে দিই।

গ্রে ম্যাটার রোবোটিকস তো দুই কোটি ডলার বিনিয়োগ পেল।

আরিয়ান কবির: জি। আগস্টের মাঝামাঝি আমরা ২০ মিলিয়ন ডলারের সিরিজে বিনিয়োগ পেয়েছি। বিনিয়োগকারীদের নেতৃত্বে আছে বো ক্যাপিটাল ভেঞ্চার। আগের বি ক্যাপিটাল গ্রুপ, ক্যালিব্রেট ভেঞ্চার, ওসিএ ভেঞ্চার, পাথব্রেকার ভেঞ্চার, ত্রি এম ভেঞ্চার এবারও বিনিয়োগ করেছে। নতুন হিসেবে পেয়েছি সুইফট ভেঞ্চার।

এই মুহূর্তে আমাদের কোম্পানিতে ১৫ জন পূর্ণকালীন কর্মী আছেন। এই বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের টিমটা বড় করে ফেলব। পরিসর বড় করতে হলে আমাদের নিজেদের রোবটের সংখ্যা বাড়াতে হবে। কর্মী বাড়ানোর পাশাপাশি আমরা তাই নতুন কিছু রোবটও সংস্থাপিত করে নেব। এ ছাড়া গবেষণা উন্নয়ন অব্যাহত রাখব।

default-image

আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বর্তমানে রোবোটিকস, এআই-এর প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তাদের উদ্দেশে কি বলবেন?

আরিয়ান কবির: আমার মনে হয়, সবার আগে যথেষ্ট আগ্রহ থাকা দরকার। আজকাল নিজে নিজেই অনেক কিছু শেখা যায়। ফলে কেউ চাইলে নিজেই নিজেকে প্রশিক্ষিত করতে পারেন। তবে রোবোটিকস নিয়ে কাজ করতে হলে কম্পিউটার বিজ্ঞান, তড়িৎ প্রকৌশল, যন্ত্রকৌশল, গণিত এসবে পারদর্শী হতে হবে। আগামী পাঁচ বছর পরে কী ধরনের চাহিদা তৈরি হবে এসব নিয়েও কাজ করা যেতে পারে। এখানে শুধু প্রকৌশলীরাই কাজ করবেন তা নয়। সবার জন্যই কাজের সুযোগ আছে। আগ্রহ ও পদক্ষেপ নেওয়াটাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। হাল না ছেড়ে লেগে থাকতে হবে। পড়াশোনা করার সময় শিখতে হবে কীভাবে বেশি শেখা যায়।

দেশে স্কুলপড়ুয়াদের জন্য রোবট অলিম্পিয়াডও কিন্তু হয়।

আরিয়ান কবির: তারা সিমুলেশনে রোবটের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করতে পারে। কারণ, খুব ভালো হার্ডওয়্যার নিয়ে কাজ করা অনেক ব্যয়বহুল। সিমুলেশনে তারা অ্যালগরিদম করবে, রোবট কীভাবে ঘর ঝাড়ু দেবে অথবা সার্জারি করবে সেসব সহজ কাজগুলো করতে শিখবে। এসব কাজে খুব পরিশ্রম করতে হবে না। ঘরে বসেই শিখতে পারবে।

প্রথম আলো: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। গ্রে ম্যাটার রোবোটিকসের জন্য শুভকামনা।

আরিয়ান কবির: আমাদের কাজগুলো দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার জন্য প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ। নতুনেরা যদি এগিয়ে আসে তাহলেই এই আলোচনাটা সার্থক হবে। আপনাদেরও ধন্যবাদ।

উদ্যোক্তা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন