default-image

করোনাভাইরাসের কারণে গতবার পয়লা বৈশাখের ব্যবসা ধুয়েমুছে গিয়েছিল। সেই লোকসান পোষাতে এবার পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু হঠাৎ করে মহামারির সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এবারও বৈশাখের ব্যবসা মার খেল। সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যে গত পাঁচ দিন দোকানপাট খোলা থাকলেও বৈশাখকেন্দ্রিক বেচাবিক্রিতে ছিল না কোনো গতি।

করোনার কারণে সরকার আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, এবারের পয়লা বৈশাখের সব অনুষ্ঠান হবে অনলাইনে। এর মধ্যে আজ বুধবার শুরু হচ্ছে আট দিনের ‘সর্বাত্মক লকডাউন’। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়ার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। সব মিলিয়ে দুই সপ্তাহ ধরে চলাফেরায় নানা রকম বিধিনিষেধের কারণে বোঝাই যাচ্ছিল, এবারের পয়লা বৈশাখে কোনো প্রকার উৎসবের আমেজ থাকছে না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎসব নাই, তাই ব্যবসাও নাই। অবশ্য বৈশাখের চেয়ে এখন ঈদের ব্যবসা নিয়ে বেশি চিন্তিত তাঁরা।

কয়েক বছর ধরেই বাংলা নববর্ষ ঘিরে কেনাকাটা বাড়ছিল। সাধারণ মানুষের গণ্ডি পেরিয়ে উৎসবটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানেও মিশেছে। ফলে কেবল পোশাক কেনাবেচা বর্ষবরণের ব্যবসা-বাণিজ্যে আটকে নেই, বরং পরিধি বেড়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখী ভাতা পান। বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানও ভাতা দেওয়া শুরু করেছে। এভাবে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণের ব্যাপ্তি বড় হওয়ায় বৈশাখকেন্দ্রিক ছোট অর্থনীতির আকারটিও ধীরে ধীরে বাড়ছিল। যদিও গত দুই বছর সেটি ব্যাপকভাবে হোঁচট খেয়েছে।

বর্ষবরণের উৎসবে নতুন পোশাকের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি থাকে। পয়লা বৈশাখের এক সপ্তাহ আগেই রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, নিউমার্কেট, গুলিস্তানে বৈশাখী পোশাক কিনতে ভিড় জমে। তবে করোনার কারণে চলতি বছর উল্টো চিত্র। বৈশাখের বেচাবিক্রিতে যখন গতি আসতে শুরু করেছিল, তখনই সরকারি বিধিনিষেধে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের টানা বিক্ষোভে ৫ থেকে ৮ এপ্রিল বন্ধ থাকার পর দোকানপাট ও বিপণিবিতান খুললেও বেচাবিক্রিতে আগের গতি ফেরেনি।

রাজধানীর পান্থপথে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, স্বনামধন্য ব্র্যান্ড আড়ংয়ে অল্প কয়েকজন ক্রেতা থাকলেও অধিকাংশ বিক্রয়কেন্দ্রই ছিল ক্রেতাশূন্য। বৈশাখী পোশাকের বড় আয়োজন থাকে দেশী দশে। সেখানেও ক্রেতা পাওয়া গেল হাতে গোনা কয়েকজন। তবে বৈশাখের চেয়ে ঈদের পোশাকই তুলনামূলক বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে জানালেন কয়েকজন বিক্রয়কর্মী।

দেশী দশের বাংলার মেলা বিক্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক শহীদুল ইসলাম বলেন, স্বাভাবিক সময়ে যে বিক্রি হয়, তা–ই হয়েছে। উৎসবের কোনো আমেজ নেই। বৈশাখের পোশাক বিক্রি না হওয়ায় স্টক জমে যাবে। ঈদের বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে কি না জানতে চাইলে বলেন, টুকটাক কিছু বিক্রি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার মতো চট্টগ্রামের ব্যবসাও খারাপ। ফ্যাশন হাউস শৈল্পিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এইচ এম ইলিয়াস প্রথম আলোকে বলেন, ‘পয়লা বৈশাখ আর ঈদ সামনে রেখে আমরা ১৫ কোটি টাকার বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বিনিয়োগ করেছি। তবে বৈশাখের বিক্রির লক্ষ্যমাত্রার ৫-১০ শতাংশও হয়নি। এ অবস্থায় ঈদের বিক্রি নিয়ে চিন্তায় আছি।’ তিনি বলেন, পরপর দুই বৈশাখে ব্যবসা হলো না। ঈদে ব্যবসা না করতে পারলে দেউলিয়া হওয়ার দশা হবে।

দেশীয় ফ্যাশন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির (এফইএবি বা ফ্যাশন উদ্যোগ) তথ্য অনুযায়ী, ফ্যাশন হাউসগুলোতে সারা বছর যে বিক্রি হয়, তার অর্ধেকই হয় রোজার ঈদে। আর ২৫-২৮ শতাংশ পয়লা বৈশাখে। সে হিসাবে পয়লা বৈশাখে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হয়।

জানতে চাইলে এফইএবির সাবেক সভাপতি আজহারুল হক প্রথম আলোকে বলেন, গতবার বৈশাখে এক টাকার ব্যবসাও হয়নি। এবারও ২ শতাংশ ব্যবসা হয়নি। এই অবস্থায় ঈদের বেচাবিক্রি নিয়েই ব্যবসায়ীরা বেশি চিন্তিত। ঈদে ব্যবসা করতে না পারলে অনেকেই পথে বসবে। তাই এক সপ্তাহের লকডাউন শেষে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে পান্তা-ইলিশ। এই পান্তা-ইলিশ খাওয়ার জন্য চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বাজারে ইলিশ কেনার ধুম পড়ে যেত। ইলিশের এই ‘নগরকেন্দ্রিক’ চাহিদাকে পুঁজি করে তাই ফায়দা লোটেন পাইকারি ও খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা। হিমায়িত ইলিশও তাজা ইলিশ বলে চালিয়ে দেন, আর ক্রেতার কাছ থেকে হাতিয়ে নেন কয়েক গুণ বেশি টাকা।

করোনার কারণে এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। তারপরও গতকাল রাজধানীর কাঁচাবাজারে মোটামুটি ইলিশ কেনার ক্রেতার সংখ্যা ছিল অনেক। দামও বেশি। কারওয়ান বাজারে ৭০০-৮০০ গ্রাম ওজনের চট্টগ্রামের একেকটি ইলিশ ৭০০ টাকা, বরিশালের ইলিশ ৮০০-৯০০ ও পদ্মার ইলিশ ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। এক কেজি ওজনের একেকটি ইলিশ বিক্রি হয় দেড় হাজার টাকায়।

কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী সুমন ইসলাম গতকাল সারা দিনে তিন লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি করেছেন। তাঁর আগের কয়েক দিন গড়ে ৭০-৮০ হাজার টাকার ইলিশ বিক্রি হয়েছে। সুমন বললেন, আজ (গতকাল) বিক্রি ভালোই হয়েছে।

বৈশাখের প্রথম দিনটিতে পুরান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা হালখাতা খুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানান। ক্রেতাদের আপ্যায়নে দোকানে দোকানে বিলি করা হয় মিষ্টি। সে কারণে পয়লা বৈশাখে সাধারণ সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ মিষ্টি বিক্রি হয়। তবে লকডাউনের কারণে হালখাতা নেই, মিষ্টির ব্যবসায়ও ভয়াবহ মন্দা।

প্রাণ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বঙ্গ বেকার্সের মিষ্টির ব্র্যান্ড মিঠাই ২০১৯ সালে বৈশাখের আগের এক সপ্তাহে প্রতিদিন ৫ টন করে মিষ্টি বিক্রি করেছিল। তখন তাদের বিক্রয়কেন্দ্র ছিল ১৮টি। বর্তমানে বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১১৯টি। চলতি বছর তাদের আশা ছিল, বৈশাখের আগের কয়েক দিন গড়ে ২০–২৫ টন মিষ্টির করপোরেট ক্রয়াদেশই থাকবে।

বঙ্গ বেকার্সের নির্বাহী পরিচালক অনিমেষ সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার কারণে গত দুই সপ্তাহে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বৈশাখের কোনো ব্যবসা নেই। দু–একটি করপোরেট ক্রয়াদেশ থাকলেও তা বলার মতো কিছু না।’

পরপর দুই বছর ব্যবসা না করতে পেরে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবেন বলে মন্তব্য করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে সরকারের আর্থিক সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে অন্তত হারানো পুঁজি পেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ পায়। না হলে অনেকেই পেশা থেকে হারিয়ে যাবেন।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন