default-image

ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার নির্দেশনায় আটকে গেছে পুরো ব্যাংক খাত। কম সুদে ঋণ দেওয়ার চাপাচাপিতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো বেশ সতর্ক। নতুন ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনেও দ্বিধান্বিত তারা। ফলে গত অক্টোবরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছেছে।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বিশেষ সুবিধায় ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়ায় অনেক ভালো গ্রাহকও ঋণের কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আবার সুদহার কমানোয় বেসরকারি ব্যাংকের গ্রাহকেরা ছুটছেন সরকারি ব্যাংকে। ফলে বেড়ে গেছে ঋণ কেনাবেচার ঘটনা। 

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র এবং কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অ্যাজেন্ডা বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকাররাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। 

ব্যাংকাররা বলছেন, সুদহারকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। চাপাচাপির কারণে ঋণ বিতরণ কমে যাচ্ছে। কম সুদে আমানত পেলে ব্যাংক নিজেই কম সুদে ঋণ দেবে, এটাই অর্থনীতির চরিত্র। এভাবেই ২০১৭ সালে সুদহার এক অঙ্কে নেমে এসেছিল। খেলাপি ঋণ কমানো ও সুদহার নিয়ন্ত্রণ দুটো বিষয় মাথায় রেখেই ব্যাংকগুলোকে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। চাপাচাপি করে সুদহার কমানোর চেষ্টায় ঋণ কমে যাচ্ছে, যাতে অর্থনীতি ক্ষতিতে পড়ছে। 

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সুদহার এক অঙ্কে রাখার ঘোষণার পর অনেক ব্যাংক ঋণ বিতরণে এখন বেশ সতর্ক। এ কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। আবার আমানতও সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার সুবিধা নেওয়ার জন্য অনেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ আসার কথা থাকলেও তার অর্ধেকও পায়নি বেসরকারি ব্যাংকগুলো। সব মিলিয়ে পুরো ব্যাংক খাত চাপে রয়েছে। 

যেভাবে এল এক অঙ্কের সুদ

২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংক মালিকদের চাপে ব্যাংক কোম্পানি আইনে বেশ কিছু পরিবর্তন আনে সরকার, যাতে একই পরিবার থেকে ৪ পরিচালক টানা ৯ বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হয়। এরপরই ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে আমানত এবং সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণের ঘোষণা দেয় ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস। তবে সেটা ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর মধ্যে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার কথা বলে ব্যাংকমালিকেরা গত দেড় বছরে আরও অনেক সুবিধা নেন। এরপরও সুদহার কমেনি। কেবল সরকারি ৮টির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অল্প কয়েকটি ব্যাংক কিছু কিছু ঋণে তা কার্যকর করেছে। 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সুপারনিউমারি অধ্যাপক হেলাল আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সব বেসরকারি ব্যাংকের জন্য ঋণে ৯ শতাংশ সুদ নামিয়ে আনা সময়সাপেক্ষ বিষয়। কারণ, ব্যাংকগুলো তহবিল খরচ বিশ্লেষণ করেই ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে। তাই অনেকেই ঋণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির স্বার্থে একেবারেই কাম্য নয়।

সরকারি ব্যাংকে ছুটছে সবাই

বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ সুদ কার্যকর না করলেও সরকারি ব্যাংকগুলো গত বছরই তা কার্যকর করে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তো ঘোষণা দেওয়া হয়। এমন খবরে ব্যবসায়ীরা এখন সরকারি ব্যাংকের দিকে ছুটছেন। 

ব্যাংকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি ব্যাংকের অনেক গ্রাহক ঋণের জন্য সরকারি ব্যাংকে আবেদন করেছেন। বেশির ভাগই তাঁদের ঋণ সরকারি ব্যাংক দিয়ে অধিগ্রহণের চেষ্টা করছেন। অধিগ্রহণে রাষ্ট্রমালিকানাধীন অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক সবচেয়ে এগিয়ে। এতে ঋণপ্রবাহ বাড়লেও দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখতে পারছে না এসব ঋণ। এমন চাপ সরকারি ব্যাংকগুলোতে বাড়ছেই। 

>ঋণের সুদ এক অঙ্ক করা নিয়ে চাপাচাপি করছে সরকার। ফল হয়েছে উল্টো। খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস উল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন,‘সুদহার কমানোয় ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছে বেশি আসছেন। আমরাও বেশ কয়েকটি ভালো প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করেছি। বেশ কিছু প্রস্তাব জমাও রয়েছে।’

পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হেলাল আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ সরকারি ব্যাংকে চলে গেলে ঋণপ্রবাহ বাড়ে। তবে এতে দেশের অর্থনীতির তেমন উপকার হয় না। আবার ঋণ কেনায় ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। খেলাপি ঋণ কমানো ও সুদহার নিয়ন্ত্রণ দুটো বিষয় মাথায় রেখেই ব্যাংকগুলোকে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

ঋণপ্রবাহ নেতিবাচক 

গত ছয় মাসে এক অঙ্কে সুদহার কার্যকরে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে ব্যাংকগুলোকে। এতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ায় সতর্ক হয়ে পড়েছে। জানা গেছে, যারা পুরোনো ও ভালো গ্রাহক, তাদের অনেকেই ১০ শতাংশের নিচে ঋণ পাচ্ছে। তবে নতুন গ্রাহকেরা সেই সুবিধা পাচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের খাত। 

যদিও এই সময়ে সরকারি ব্যাংকগুলো গ্যাস-বিদ্যুতের ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বড় প্রকল্পে এক অঙ্কের সুদে ঋণ দিচ্ছে। ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণে পিছিয়ে গেছে। গত অক্টোবরে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে হয়েছে ১০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। 

এদিকে সুদহারের পাশাপাশি দফায় দফায় নীতিমালা পরিবর্তন করে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে খেলাপিদের। এতে ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কমে গেছে। আবার খেলাপি ঋণও বেড়ে গেছে। সর্বশেষ হিসাবে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ। 

 সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান সামগ্রিক বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির যে সাফল্য তুলে ধরা হয়, তার সঙ্গে দেশের ব্যাংক খাত কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়। দেশের ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার মাধ্যমে তা প্রকাশ হচ্ছে মাত্র। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাত নিয়ে যত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার কোনোটাই খাতটির উন্নতি করেনি, বরং এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে পেছনে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতায় আঘাত করা হয়েছে। ঋণখেলাপিদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এক অঙ্কের সুদ বাস্তবায়ন কঠিন। সরকারের ঋণও বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও নতুন উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ কমে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন