default-image

ভারতীয় পণ্যের চালানটি ছিল মালয়েশিয়ায়। সেখান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে এনে আরেকটি জাহাজে নেওয়া হবে কলকাতায়। হংকংভিত্তিক জাহাজ কোম্পানি গোল্ড স্টার লাইন এই নৌপথে ভারতীয় পণ্য নিয়মিত পরিবহনের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলে। সে অনুযায়ী চট্টগ্রামমুখী একটি জাহাজে ৮০ কনটেইনারের চালানটি বোঝাই শুরু হয়। তবে কনটেইনারপ্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস ও চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল দেখে তাদের চোখ ছানাবড়া। দেরি না করে সিদ্ধান্ত বাতিল করে কোম্পানিটি। তবে তার আগেই ৪৫ কনটেইনার বোঝাই হয়ে যায় জাহাজটিতে।

এই অনিচ্ছাকৃত ট্রান্সশিপমেন্টের চালানটি বন্দরে এসে পৌঁছেছে গতকাল শনিবার। ‘এমভি ওইএল শাস্তা’ জাহাজ থেকে চালানটি নামিয়ে প্রথমে চট্টগ্রাম বন্দরের চত্বরে রাখা হবে। এরপর আগামী সপ্তাহে কলকাতাগামী একই প্রতিষ্ঠানের ‘এমভি এশিয়াটিক মুন’ জাহাজে তুলে দেওয়া হবে। হংকংভিত্তিক কোম্পানি গোল্ড স্টার লাইন চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় সরাসরি সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজ চলাচল শুরু করায় ট্রান্সশিপমেন্টের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বাড়তি খরচের কারণে এই সম্ভাবনারও মৃত্যু হয়ে গেল।

এমন এক সময়ে এ ঘটনা ঘটল, যখন চার দিন আগে ভারতীয় একটি চালান চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে তাদের নিজেদের রাজ্য ত্রিপুরা ও আসামে নেওয়া হয়েছে। ট্রানজিট চুক্তির আওতায় কলকাতা থেকে সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম এনে ওই চালান সড়কপথে ত্রিপুরা ও আসামে নেওয়া হয়। এবারের ভারতীয় পণ্যের চালানটি চীনের নিংবো, ভিয়েতনামের হো চি মিন ও থাইল্যান্ডের ব্যাংকক বন্দর থেকে প্রথমে মালয়েশিয়ায় আনা হয়। যেটি আবার সমুদ্রপথে কলকাতায় নেওয়া হবে। রাবার উড, মাস্ক তৈরির মেশিন, পোশাকশিল্পের কাঁচামাল, সৌরবিদ্যুতের এলইডি লাইট, টিভিসি রেজিনসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে চালানটিতে।

কত খরচ?

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য কাস্টমস কেজিপ্রতি এক টাকা করে মাশুল আদায় করছে। এই চালানের ৪৫ কনটেইনারে ৬৫৬ টন পণ্য আছে। এ হিসাবে কনটেইনারপ্রতি সাড়ে ১৪ হাজার টাকা বা ১৭১ ডলার মাশুল দিতে হচ্ছে। আর বন্দরের যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো ব্যবহারের মাশুল পড়ছে প্রতি কনটেইনারে ১৪৭ ডলার। এই দুই মাশুলই মিলিয়ে খরচ পড়ছে ৩১৮ ডলার। আনুষঙ্গিক খরচসহ তা ৩৪০ ডলারে দাঁড়াচ্ছে। অবশ্য বন্দরের যা আয় হচ্ছে তার বিপরীতে কিছু সেবা পাচ্ছে কোম্পানিটি। কিন্তু কাস্টমসের ওই মাশুলের বিপরীতে বলতে গেলে কোনো সেবা মিলছে না।

হংকংভিত্তিক জাহাজ কোম্পানি গোল্ড স্টার লাইনের এজেন্ট ট্রাইডেন্ট শিপিং কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক (আইন ও প্রশাসন) মো. দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং-চট্টগ্রাম-কলকাতা পথে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা থাকায় এ পথে পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ নিয়েছিল গোল্ড স্টার লাইন। তারা বলেছে, পোর্ট কেলাং বন্দরে ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য কনটেইনারপ্রতি ৬০-৭০ ডলার খরচ হয়। কিন্তু চট্টগ্রামে বেশি খরচ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি এখন আর এ পথে পণ্য পরিবহন করতে চাইছে না। তবে ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার আকর্ষণীয় করা গেলে পণ্য পরিবহন বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রাও আয় হবে।

>

কনটেইনারপ্রতি সাড়ে ১৪ হাজার টাকা বা ১৭১ ডলার মাশুল নিচ্ছে কাস্টমস
বন্দর ব্যবহারের মাশুল প্রতি কনটেইনারে ১৪৭ ডলার
বন্দর ও কাস্টমসের মাশুল মিলিয়ে খরচ প্রতি কনটেইনারে ৩১৮ ডলার

এদিকে গত মঙ্গলবার ট্রানজিট চুক্তির আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরে ভারতীয় পণ্যের পরীক্ষামূলক চালানে ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য ফি নেওয়া হয়েছিল কেজিপ্রতি ২ পয়সা। সেটা অবশ্য চুক্তির আওতায় নির্ধারণ হয়েছিল। তাতে দেখা যাচ্ছে, চুক্তির ওই চালানের চেয়ে স্বাভাবিক ট্রান্সশিপমেন্টের চালানে ফি ৫০ গুণ বেশি। এখন যে ট্রান্সশিপমেন্ট হচ্ছে তার জন্য চুক্তির দরকার হচ্ছে না। কারণ, নিয়মানুযায়ী বন্দরের ভেতরে ট্রান্সশিপমেন্টের সুযোগ আছে।

কেন চট্টগ্রাম বন্দর

ট্রান্সশিপমেন্টের সুযোগ তৈরি হয়েছিল হংকংভিত্তিক কোম্পানিটির আগ্রহে। কলকাতা থেকে মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং বন্দরে কনটেইনার পরিবহনে সহজলভ্য সেবা না থাকায় তারা এই নৌপথ বেছে নিয়েছিল। কোম্পানিটি এ মাসের শুরুতে চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় সরাসরি সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজ পরিচালনা শুরু করে। তাতে সাত-আট দিনেই মালয়েশিয়া থেকে তাদের জাহাজে কলকাতায় কনটেইনার নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল।

ভারতের বন্দরগুলোর সঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশের বন্দরের সরাসরি কনটেইনার পরিবহন সেবা নেই। এ কারণে বাংলাদেশের মতো ভারতও সিঙ্গাপুরের সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ও শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নিজ দেশের পণ্য আনা–নেওয়া করে।

গত বছরের মে মাসের হিসাবে ভারতের মোট আমদানি–রপ্তানি পণ্যের ৪২ শতাংশই আনা–নেওয়া হয় কলম্বো বন্দর দিয়ে। এই বন্দর থেকে ভারতের বড় বন্দরগুলোতে নিয়মিত কনটেইনার পরিবহন সেবা চালু রয়েছে। এরপরের অবস্থান হলো সিঙ্গাপুর। আর মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং বন্দর দিয়ে ১১ শতাংশ কনটেইনার আনা–নেওয়া হয়। বন্দরটি দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্টের হার কম থাকায় ভারতের সব কটি বন্দরে কনটেইনার পরিবহন সেবা নেই। এসব কারণেই চট্টগ্রাম বন্দর বেছে নিয়েছিল জাহাজ কোম্পানিটি।

কতটুকু প্রস্তুত বন্দর

এ মুহূর্তে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার জাহাজের তেমন জট নেই। ফলে এখন ট্রান্সশিপমেন্ট হলে বন্দরের সমস্যা হবে না। আবার শুরুতে খুব বেশি পণ্য ট্রান্সশিপমেন্ট হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। তবে ভবিষ্যতে বন্দর সুবিধা বাড়লে ট্রান্সশিপমেন্ট করে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ জন্য অবশ্য বন্দর ব্যবহার আকর্ষণীয় করতে সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি মাশুল কমাতে হবে বলে মনে করছেন ব্যবহারকারীরা।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন