পেঁয়াজের বাজারদর

এক ঘোষণাতেই হুলুস্থুল

ক্রেতার চাপ, বিক্রেতা উধাও। দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ভারতকে অনুরোধ ঢাকার।

এক ঘোষণাতেই হুলুস্থুল
বিজ্ঞাপন
দাম একটু বাড়তির দিকে থাকায় আমরা ভয় পাচ্ছিলাম যে ভারত হয়তো নিম্নতম দর বেঁধে দিতে পারে, যেমনটা আগের বার দিয়েছিল। কিন্তু হুট করে বন্ধই করে দিল, এটা আমাদের চিন্তার বাইরে।
টিপু মুনশি, বাণিজ্যমন্ত্রী

বাংলাদেশকে যতটুকু পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়, তার ৯০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। দেশটি রপ্তানি বন্ধ করলেই কেবল বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা অন্য উৎসের খোঁজ করেন। তাই ভারতের বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাজার অনেকটা একসূত্রে গাঁথা। গত বছরের সেপ্টেম্বরেও ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল। সেটি তুলে নেওয়া হয় চলতি বছরের ১৫ মার্চ। ওই সাড়ে পাঁচ মাসে পরিস্থিতি সামাল দিতে উড়োজাহাজে উড়িয়ে এনে, জরিমানা করে এবং টিসিবির মাধ্যমে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করেও বাজার সামলানো যায়নি।

গত বছরের অক্টোবরে ভারত সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। ৪ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত বিজনেস ফোরামের সভায় তিনি বলেন, ‘ভারত হুট করে রপ্তানি বন্ধ করে দিল। আমরা পড়ে গেলাম বেজায় অসুবিধায়। একটু বলে-কয়ে সিদ্ধান্ত নিলে আমরা বিকল্প খোঁজার সময় পেতাম।’ ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাড়িতে বলে দিয়েছি পেঁয়াজ ছাড়াই রান্না করতে। আপনাদের অনুরোধ, ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে আমাদের একটু আগে থেকে জানাবেন।’

এবার কেন ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দিল, রাজনৈতিক কোনো কারণ আছে কি—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গতকাল রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বন্ধ করার কারণ তো তারা আমাদের বলবে না বা ব্যাখ্যাও দেবে না। তবে আমাদের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর বুধবার (আজ) একটি প্রতিবেদন পাঠাবে। তখন বুঝতে পারব ভেতরের কারণগুলো।’
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভারত হঠাৎ পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেবে—এমনটা আশা করেননি বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি বলেন, ‘দাম একটু বাড়তির দিকে থাকায় আমরা ভয় পাচ্ছিলাম যে ভারত হয়তো নিম্নতম দর বেঁধে দিতে পারে, যেমনটা আগের বার দিয়েছিল। কিন্তু হুট করে বন্ধই করে দিল, এটা আমাদের চিন্তার বাইরে।’

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল তাদের ৫০টি দল দেশের ৯৮টি বাজারে অভিযান চালিয়েছে। এতে ১৫২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় পৌনে ৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

পেঁয়াজ কেনার হিড়িক

মানুষ কীভাবে পেঁয়াজ কিনেছে তার উদাহরণ দিয়ে রংপুর শহরের সিটি বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, ‘এক ঘণ্টার কম সময়ে আমরা ২২ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছি। এমনটা আগে হয়নি।’

দাম যাতে না বাড়ে সে জন্য ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গতকাল নগরের মেছুয়া বাজারে অভিযান চালানো হয়। আর রাজশাহী নগরের মণিচত্বর বাজারের ক্রেতা মোতালেব হোসেন বলেন, বাজার থেকে পেঁয়াজ উধাও হয়ে যাচ্ছে।

ঢাকার মোহাম্মদপুরের আজিজ মহল্লার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম গতকাল স্থানীয় কৃষি মার্কেট থেকে পেঁয়াজ কিনেছিলেন। পরিচিত দোকানিকে তিনি বলেন, ‘এমন দাম বলিস না যে মাথা গরম হয়।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কৃষি মার্কেটের পেঁয়াজের আড়তে গিয়ে দেখা গেল, অপরিচিত কাউকে তাঁরা দাম বলতেই রাজি নন। আর কারওয়ান বাজারে গিয়ে দেখা গেল, আড়তের পাইকারি দোকানের অনেকগুলোতেই পেঁয়াজ গামছা দিয়ে ঢেকে রেখে বিক্রেতা উধাও। পরিচিত এক বিক্রেতাকে পাওয়া গেল চায়ের দোকানে। তিনি বললেন, জরিমানা চলছে। তাই বিক্রি বন্ধ।

পাইকারি বাজারে এক দিন আগের তুলনায় গতকাল দেশি পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজ ২০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হয়। এ চিত্র পুরান ঢাকার শ্যামবাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, কারওয়ান বাজার ও মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের আড়তের।

ব্যবসায়ীরা অবশ্য অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির চেষ্টা করছেন। চট্টগ্রামের বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মঙ্গলবারের দর অনুযায়ী ভারতের বাইরে অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আনতে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৭ টাকা খরচ পড়বে। এক মাসের মধ্যে পেঁয়াজের বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করেন তিনি।

হঠাৎ বন্ধ কেন?

ভারত গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজ রপ্তানিতে টনপ্রতি ৮৫০ ডলার ন্যূনতম মূল্য বেঁধে দিয়েছিল। দেশটির পত্রিকা দ্য হিন্দুর ওই সময়কার এক প্রতিবেদন বলছে, গত বছর রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আনার সময় দেশটির বিভিন্ন শহরে পেঁয়াজের প্রতি কেজি দাম ছিল ৪০ থেকে ৫০ রুপি। এরপর বাজার আরও নিয়ন্ত্রণহীন হওয়ার পর দেশটি ৩০ সেপ্টেম্বর রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ভারতীয় পত্রিকা হিন্দুস্তান টাইমস-এর গতকালের এক খবর বলছে, দেশটির খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি ৪০ রুপির আশপাশে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্যামবাজারের এক আমদানিকারক বলেন, মহারাষ্ট্রের নাসিকে সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের দাম সোমবার ৪০ রুপি পর্যন্ত উঠেছিল। রপ্তানি বন্ধের পর তা আবার কমে গেছে। তিনি মনে করেন, ভারত এবার বাড়তি সতর্কতা নিচ্ছে। তাদের পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে।

এক কেজির জন্য দেড় ঘণ্টা

অবশ্য দেশে চাষ করা ‘কিং’ নামে পরিচিত পেঁয়াজ বাছাই করা অবস্থায় কেজিপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ টাকায় গতকাল বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হয়েছে। আর একটু ছোট আকারের কিং পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া গেছে।

পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্তে রাজনীতি থাকুক, আর না থাকুক—ঢাকার তেজকুনীপাড়ার বাসিন্দা মো. হেলাল উদ্দিনকে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কম দামের এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে দেড় ঘণ্টার বেশি।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল তাদের ৫০টি দল দেশের ৯৮টি বাজারে অভিযান চালিয়েছে। এতে ১৫২টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় পৌনে ৯ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

টিসিবি দেশের বিভাগীয় শহর ও জেলায় ২৭৬টি জায়গায় কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। গতকাল সংস্থাটির পরিবেশক মনিরুজ্জামান ঢাকার খামারবাড়ি মোড়ে ট্রাক নিয়ে দাঁড়িয়েছিলে সকাল সাড়ে নয়টায়। পেয়েছিলেন মোট ৩০০ কেজি। সকাল থেকেই ক্রেতার ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। এ কারণে টিসিবি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ক্রেতাদের এক কেজি করে দেওয়া শুরু করেন।

বেলা দুইটার দিকে ট্রাকের সামনে ৬০ জনের মতো। তাঁদের একজন বললেন, ‘বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি ৭০ টাকা হয়ে গেছে। টিসিবির কাছ থেকে এক কেজি কিনতে পারলেও ৪০ টাকা সাশ্রয় হবে। বাজারে সবকিছুর দামই তো বাড়তি। না কিনে যাব না।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন