default-image

গাজীপুরের কাশিমপুরের একটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিক ছিলেন বুলবুল আহমেদ। ‌‘ছিলেন’ বলা হলো, কারণ এখন তাঁর চাকরি নেই। গত বছরের ডিসেম্বরের ঘটনা। কারখানার গ্যাস-সংযোগ সারাইয়ের কথা বলে সব শ্রমিককে সাত দিনের ছুটি দেওয়া হয়। সাত দিন পর শ্রমিকেরা কাজে গেলে আরও ১৫ দিন পর যেতে বলা হয়। নির্দিষ্ট সময় পর শ্রমিকেরা কারখানায় যান। কিন্তু তাঁদের আর সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যে কিছু শ্রমিককে বেছে চাকরিতে রাখা হয়, তাঁদের মধ্যে বুলবুল ছিলেন। কিন্তু মার্চ মাসে তিনিও চাকরিচ্যুত হন। এক দফায় ১০ হাজার টাকা পেয়েছেন বুলবুল। তিনি গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলছিলেন, ‌‘স্ত্রী, ছেলেমেয়ে নিয়ে এক দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছি। চাকরি নেই। প্রাপ্য এক লাখের বেশি টাকা, তা-ও দেয়নি।’

বুলবুলের কারখানা বন্ধের কারণ হিসেবে করোনার প্রভাবকে উল্লেখ করা হয়েছিল। বুলবুলের মতো হাজার হাজার শ্রমিক করোনাকালে কর্মহীন হয়েছেন। করোনা সংক্রমণের বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো পেশায় ফিরতে পারেননি অনেকেই। আবার এই সময় কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় শ্রমিকের হতাহতের সংখ্যাও কমেনি। এমন এক সময়ে আজ এসেছে মহান মে দিবস। শ্রমিকের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রামের স্বাক্ষর বহন করা দিন।

বিজ্ঞাপন
করোনার ধাক্কায় দারিদ্র্যের আরও জটিল ফাঁদে পড়ল শ্রমজীবী মানুষেরা। এর প্রভাব তাদের শরীর ও মন সবখানে পড়বে। দুঃখজনকভাবে এসব শ্রমিকের কোনো সংগঠিত কণ্ঠস্বর নেই।
হোসেন জিল্লুর রহমান নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি

করোনাকালে পেশা হারিয়েছেন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। তবে শ্রমিকদের মধ্যে এ সংখ্যা অনেক বেশি। তাঁদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। একাধিক গবেষণায় সে চিত্র পাওয়া গেছে।

করোনাকালের আর্থসামাজিক প্রভাব নিয়ে গত বছর দুবার আর চলতি বছর একবার—মোট তিন দফা জরিপ করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)। এসব জরিপের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত বছরের জুনে পেশাভিত্তিক কাজ হারানোর তালিকায় ওপরে আছেন গৃহশ্রমিকেরা। চলতি বছরের মার্চে সর্বশেষ জরিপেও তাঁদের কাজ হারানোর হার সর্বোচ্চ, ৩২ শতাংশ। এরপরই আছে দক্ষ শ্রমিক এবং বেতনভুক্ত নিম্ন আয়ের মানুষ।

করোনা আসার পর করোনা-পূর্ব আয়ের মুখ আর দেখতে পাচ্ছেন না শ্রমজীবী মানুষ। পিপিআরসি-বিআইজিডির জরিপে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চে গৃহকর্মীদের আয় কোভিড-পূর্ব সময়ের চেয়ে ৬১ শতাংশ কমে গেছে। এরপরই আছে অদক্ষ শ্রমিক। তাঁদের আয় কমেছে ৫০ শতাংশ। পরিবহনশ্রমিক ও রিকশাচালকদের আয়ও ৪৮ শতাংশ কমে গেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গত এপ্রিলে একটি গবেষণা করে। শ্রমিকদের ওপর করোনার প্রভাবসংক্রান্ত এ গবেষণায় বলা হয়, উৎপাদন, নির্মাণ, পরিবহন খাতের শ্রমিকেরা করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি কাজ হারিয়েছেন। আর তাঁরা আছেন উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে। অর্থনীতির ‌‘জিয়নকাঠি’ এসব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত। ওই গবেষণায় আরও বলা হয়, নগরে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের প্রায় ১৮ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এ সংখ্যা ২০১৭ সালের নিরিখে নগর কর্মসংস্থানের ৮ ভাগের বেশি।

শ্রমিক শ্রেণিকে করোনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শ্রেণি বলে মনে করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‌করোনার ধাক্কায় দারিদ্র্যের আরও জটিল ফাঁদে পড়ল শ্রমজীবী মানুষেরা। এর প্রভাব তাদের শরীর ও মন সবখানে পড়বে। দুঃখজনকভাবে এসব শ্রমিকের কোনো সংগঠিত কণ্ঠস্বর নেই। আর এ জন্য সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার বিষয়ে তাদের দাবি তোলার সামাজিক সক্ষমতা তৈরি হয়নি।

বিজ্ঞাপন

করোনার প্রভাব কাটাতে শ্রমিকদের সহায়তা আদায় করতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা ইতিবাচক নয় বলেই মনে করেন বিলসের নির্বাহী পরিচালক নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‌‘তৈরি পোশাকের একাধিক মালিক এমপি-মন্ত্রী আছেন। পরিবহন খাতেরও প্রভাবশালী নেতা আছেন। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি নিয়ে কথা বলার তেমন কেউ নেই।’

করোনাকালেও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে শ্রমিকদের নিহত-আহত হওয়ার ঘটনা কমেনি। বিলসের জরিপ অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৭৯৫ জন শ্রমিক নিহত হন। এ সময় ৩ হাজার ২১৩ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। কোভিড-১৯-এর কারণে দীর্ঘদিন সাধারণ ছুটি থাকার পরও কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি। শুধু ২০২০ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৭২৯ জন শ্রমিক নিহত হন। আহত হন ৪৩৩ জন। চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ২৬৪ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায়। আহতের সংখ্যা ১৩৬।

জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন বলেন, ‌‘মহামারি করোনা আমাদের মধ্যে মানবিকতা বোধের উদয় ঘটাতে পারেনি। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তার অভাব এরই প্রমাণ বহন করে।’

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন