ব্যয় নির্ধারণে যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য আমরা একটি কমিটি করে দিয়েছি। এ কমিটি প্রকল্পের আওতায় স্কিম তৈরি করবে। স্পেসিফিকেশন ঠিক করবে।
মামুন আল রশীদ, সদস্য, পরিকল্পনা কমিশন

বলা হচ্ছে, করোনা মহামারি থেকে উত্তরণে দেশের ৩২৯টি পৌরসভা ও ১০টি সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া একটি প্রকল্পের কথা। এর কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে যতটা তৎপর, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ততটা নন। ‘লোকাল গভর্নমেন্ট কোভিড রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রজেক্ট’ (এলজিসিআরআরপি) শীর্ষক এ প্রকল্প গত ২২ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ হবে ২ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ মিলবে ২ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা। বাকি ১১ কোটি টাকা সরকার বহন করবে। আর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) মামুন আল রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন স্কিম করা হয়নি, কোন খাতে কত টাকা খরচ হবে, কেন ঠিক হয়নি—এসব বিষয় আমরা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছি। তারা বলেছে, এগুলো পরে ঠিক করা হবে। ব্যয় নির্ধারণে যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য আমরা একটি কমিটি করে দিয়েছি। এ কমিটি প্রকল্পের আওতায় স্কিম তৈরি করবে। স্পেসিফিকেশন ঠিক করবে। একই সঙ্গে রাস্তার নকশাও ঠিক করবে।’

এ প্রকল্পের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, এর আওতায় ১০০টি সরকারি হাত ধোয়া স্টেশন বানানোর কথা বললেও এগুলো কোথায় হবে, তা ঠিক করা হয়নি। তা ছাড়া প্রতিটি হাত ধোয়া স্টেশন বানাতে খরচ কত হবে, সেই হিসাবও করা হয়নি। আবার ২০০ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণের উল্লেখ থাকলেও তা কোন কোন পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে হবে, সেটি বলা হয়নি। ৫০টি পৌরসভা বাজার নির্মাণের পরিকল্পনা করা হলেও এসব বাজার কোথায় হবে, সেটির উল্লেখ নেই। একইভাবে প্রকল্প সারপত্রে স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট বা গণশৌচাগার নির্মাণ, সড়কবাতি স্থাপন, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক বিতরণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শৌচাগার ও সড়কবাতির সংখ্যা এবং স্যানিটাইজার ও মাস্কের পরিমাণ বলা হয়নি।

পুরো প্রকল্পের অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, যে কেউ প্রভাব বিস্তার করে তার পছন্দমতো জায়গায় হাত ধোয়া স্টেশন কিংবা রাস্তা বানাতে পারে। আদৌ সেখানে শৌচাগার, রাস্তা, পার্ক, কিচেন মার্কেট (কাঁচাবাজার) নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, তা নিয়ে কোনো সমীক্ষা করা হয়নি।

পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে জেলা সমন্বয় কমিটি (ডিসিসি)। কমিটির চেয়ারপারসন রাখা হয়েছে জেলা প্রশাসককে (ডিসি)। কমিটিতে এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার জেলা পর্যায়ের প্রধান এবং পৌরসভার মেয়র ও প্রকৌশলী, এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কমিটিতে রাখা হয়েছে।

এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সমন্বয় কমিটির কাজ হবে স্কিম বানিয়ে তা অনুমোদন এবং রাস্তা, শৌচাগার ও কিচেনের খরচ প্রাক্কলন এবং স্পেসিপেশকন ঠিক করা ও রাস্তার নকশা নির্ধারণ। তিন মাস পরপর কমিটি সভা করবে।

এ প্রকল্পের আওতায় ৩২৯ পৌরসভার ২ কোটি ও ১০ সিটি করপোরেশনের ১ কোটি মিলিয়ে ৩ কোটি মানুষ সুফল পাবেন বলে এলজিইডির কর্মকর্তাদের দাবি।

শুধু খরচের বাহার

প্রকল্পটির আওতায় এখনো গণশৌচাগার, রাস্তা, ড্রেন, পার্ক, বাজার, কবরস্থান ও শ্মশান নির্মাণ এবং সড়কবাতি স্থাপনের স্কিম ও খরচ চূড়ান্ত না হলেও কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর কিন্তু চূড়ান্ত করে ফেলেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। মোট ৫০ জন কর্মকর্তা বিদেশ ভ্রমণে যাবেন। এর মধ্যে প্রকল্পটি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জড়িত পরিকল্পনা কমিশনের পাঁচজন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চারজন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তা থাকবেন। বাকি ৩৯ জনই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও এলজিইডির কর্মকর্তা। এসব কর্মকর্তা অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণে যাবেন। তাঁদের বিদেশ ভ্রমণে সব মিলিয়ে খরচ হবে তিন কোটি টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় প্রশিক্ষণের নামে অপ্রয়োজনীয় খরচ দেখানো হয়েছে। যেমন এলজিইডি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে নিজস্ব দপ্তরে। অথচ এ জন্যও যাতায়াত ভাতা বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে। আলাদা করে কর্মশালার জন্য ভেন্যু ভাড়া, ডেকোরেশন, ভিডিও ফটোগ্রাফি, বক্তাদের সম্মানী, ব্যাগ দেওয়া বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে।

১০ সিটি করপোরেশন ও ৩২৯ পৌরসভার মোট ১১ হাজার ৪৯০ জন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য আট কোটি টাকা খরচের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের চার হাজার ৮৭৭ জনের প্রশিক্ষণ দিতে খরচ হবে আরও চার কোটি টাকা। এসব খরচকে অপ্রয়োজনীয় বলছে পরিকল্পনা কমিশন।

প্রকল্পের কর্মকর্তাদের জন্য পাঁচটি গাড়ি কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে সোয়া ছয় কোটি টাকা। পরামর্শকদের পেছনে ১২০ কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। এ নিয়েও আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কোভিড-১৯ মহামারি থেকে উত্তরণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়বে। ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নাগরিক সেবা নিশ্চিত হবে। আগামী ২০২৫ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে

বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন