ইলিশের বাজারে এবার উল্টোরথ। পয়লা বৈশাখ ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু ইলিশের দাম কমছে। বড় বাজারে এক কেজি আকারের একটি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ৯০০ টাকায়, অবশ্য হিমাগারের ইলিশ।

প্রতিবছর পয়লা বৈশাখের আগে কেজি ওজনের একটি ইলিশ অন্তত দেড় হাজার টাকায় বিকোয়। কখনো কখনো দুই হাজারও। এবার ইলিশের চাহিদা নেই। নববর্ষ উদযাপন বরবাদ করে দিয়েছে করোনাভাইরাস। তাই মন খারাপ ইলিশ ব্যবসায়ীদের।

পয়লা বৈশাখের বাজার ধরতে ফি বছর বিপুল ইলিশ মজুত করেন ব্যবসায়ীরা। এ বছরও রেখেছিলেন। কিন্তু সারা দেশে চলছে সাধারণ ছুটি।

১৪ এপ্রিল বাংলা পঞ্জিকার প্রথম দিন। অর্থাৎ, নতুন বছরের শুরু। এদিন ইলিশ ভাজা দিয়ে পান্তা খাওয়ার যে চল রয়েছে, তাতে ইলিশের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়। যদিও এ সময় সরবরাহ থাকে খুবই কম। কারণ, বছরের এ সময়টায় পাঁচটি অভয়াশ্রমে দুই মাস ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে। ফলে ভরসা হিমাগার।

এবার করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পয়লা বৈশাখের সমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার। সারা দেশে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি চলছে। এটা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সবকিছু খুলবে কি না, তা–ও নিশ্চিত করে বলা যায় না। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তা। ব্যবসায় মন্দা। অনেকের মতো ক্ষতির মুখে ইলিশ ব্যবসায়ীরাও।

কারওয়ান বাজারের ইলিশ বিক্রেতা শুক্কুর আলী গতকাল বুধবার প্রথম আলোকে জানান, তিনি এক কেজি ওজনের ইলিশ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। এর চেয়ে কিছুটা ছোট ইলিশের দাম রাখছেন ৬৭০ টাকা কেজি। আর আধা কেজি ওজনের ইলিশের কেজি ৫০০ টাকার আশপাশে।

শুক্কুর আলী প্রতিবছরই পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ইলিশ হিমাগারে রাখেন। এবার রেখেছিলেন ৫০ লাখ টাকার। ব্যবসা কেমন হবে মুঠোফোনে জানতে চাইলে ওপাশ থেকে উত্তর আসল, ‘ধরা, ধরা, ধরা।’

পয়লা বৈশাখে দুই ধরনের ইলিশ বিক্রি হয়। তাজা ইলিশ আর হিমাগারে রাখা ইলিশ। পয়লা বৈশাখের বাজার ধরতে হিমাগারে ইলিশ রাখা শুরু হয় অক্টোবর থেকে। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এবার ভালো পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়েছে। দামও বেশ কম ছিল। সেই মাছ হিমাগারে রেখে যাঁরা ভালো লাভের আশা করেছিলেন, তাতে বালু ছিটিয়ে দিয়েছে করোনাভাইরাস। আর তাজা ইলিশ যেটা পাওয়া যায়, সেটা হয়তো অবৈধভাবে ধরা।

চাঁদপুরের আবদুল মালেক খন্দকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ইলিশ রেখে দেন। এবার রেখেছিলেন ২০০ মেট্রিক টন। পয়লা বৈশাখের বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে মালেক খন্দকারের মতো ব্যবসায়ীদের মজুতই ভরসা। কিন্তু এবার মাছ নিয়ে চিন্তিত তিনি।

মালেক খন্দকার বলেন, এক কেজি ওজনের একটি মাছ কেনা পড়েছে ৯০০ টাকা। এখন বাজারে দর ৮০০ টাকা। দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। ইলিশ কেনার লোক নেই।

অবশ্য এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মাছ বিক্রি করা যাবে বলে আশা করেন ওই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, হিমাগারে মাছ নষ্ট হবে না। কম দাম হলেও বিক্রি করা যাবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৩৩ হাজার টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে। এক দশকে ইলিশ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে সারা বছরই কমবেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে বাজারে ইলিশের কেজি এখন ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা। এক বছর আগের তুলনায় এখন দাম প্রায় ২৪ শতাংশ কম।

দাম কম হলেও করোনার ভয়ের সঙ্গে নিজের জীবিকা নিয়ে চিন্তিত মানুষের ইলিশ কেনার সময় কই? সাধ্যই বা কতটুকু, যখন ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বন্ধ, চাকরিজীবীরা দুশ্চিন্তায়।
শেওড়াপাড়ার এক দোকানমালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন ১ হাজার টাকায় ইলিশ কেনার চেয়ে টাকাটা পকেটে থাকা জরুরি।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন