default-image

করোনাঝড় কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। গত জুন থেকে বিক্রি একটু একটু বাড়তে শুরু করলেও জুলাইয়ে ঈদুল আজহায় ভালো ব্যবসা হয়েছে। আগস্টে এসে যে বিক্রি, সেটিকেও আশাব্যঞ্জক মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে করোনার শুরুতে ওয়াশিং মেশিন, ব্লেন্ডার, রুটি মেকার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, চুল কাটার যন্ত্র ইত্যাদি ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। তার মধ্যে ওয়াশিং মেশিনের বিক্রি এতটাই বেড়েছিল যে পণ্যটির স্টকই শেষ হয়ে যায়। ক্রেতারা দোকানে দোকানে ঘুরেও ওয়াশিং মেশিন কিনতে পারেননি।

শীর্ষস্থানীয় ছয়টি ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা আছে তারা সাধারণ ছুটির সময়টাতেও মোটামুটি ভালো ব্যবসা করেছে। অন্যরা ওই সময়ে খুব বেশি ব্যবসা করতে না পারলেও জুন থেকে সবার ব্যবসায় বাড়তে শুরু করে। জুলাইয়ে কোরবানির ঈদের কারণে গতবারের মতোই ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে পণ্য বিক্রির পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক।

বিজ্ঞাপন

ওয়াশিং মেশিনের স্টকে টান

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে মার্চে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর অনেকেই গৃহকর্মীদের ছুটি দিয়ে দেন। তাতে গৃহকর্মীর অনুপস্থিতিতে ঘরের কাপড়চোপড় পরিষ্কারের জন্য বড় ভরসা হয়ে ওঠে ওয়াশিং মেশিন। ফলে হঠাৎ করেই পণ্যটির চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। আবার করোনার কারণে পণ্যটি আমদানিও করা যাচ্ছিল না। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের ওয়াশিং মেশিনের স্টক শেষ হয়ে যায়।

জানতে চাইলে ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক সৈকত আজাদ বলেন, ‘করোনার শুরুর দিকে ওয়াশিং মেশিনের চাহিদা কমপক্ষে ৩০০ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। আমাদের সেভাবে প্রস্তুতি ছিল না। প্রস্তুতি থাকলে বিক্রি আরও বেশি হতো। এখনো এ পণ্যটির চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি।’

ইলেকট্রনিকসের বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাহিদা বেশি থাকায় এখনো বাজারে সনি-র‌্যাংগসসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ওয়াশিং মেশিনের কোনো স্টক নেই। কিছু প্রতিষ্ঠান দ্রুত আমদানি করে চাহিদা সামাল দিচ্ছে।

করোনার শুরুতে ওয়াশিং মেশিনের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। তা ছাড়া কম্পিউটার বিক্রিও ভালো হয়েছে। তবে আগামী মাসগুলোতে ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা কতটা বাড়বে, তা করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
রাজিউর রহমান, সিঙ্গার বাংলাদেশের সিনিয়র ম্যানেজার (মার্কেটিং কমিউনিকেশন)

জানতে চাইলে সিঙ্গার বাংলাদেশের সিনিয়র ম্যানেজার (মার্কেটিং কমিউনিকেশন) রাজিউর রহমান বলেন, করোনার শুরুতে ওয়াশিং মেশিনের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। তা ছাড়া কম্পিউটার বিক্রিও ভালো হয়েছে। তবে আগামী মাসগুলোতে ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা কতটা বাড়বে, তা করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
ইলেকট্রা ইন্টারন্যাশনাল নিজেদের ব্র্যান্ড ইলেকট্রার পাশাপাশি স্যামসাংয়ের টিভি, ফ্রিজ, এসি, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ওয়াশিং মেশিনসহ নানা ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রি করে। করোনাকালে তাদের ওয়াশিং মেশিনের বিক্রি ৫০ শতাংশ ও মাইক্রোওয়েভ ওভেনের বিক্রি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। তা ছাড়া স্মার্ট টিভিরও ভালো বিক্রি হয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে ইলেকট্রা ইন্টারন্যাশনালের উপমহাব্যবস্থাপক মোবারক হোসেন বলেন, ‘জুলাই ও আগস্টে আমাদের যে বিক্রি হয়েছে, তা গত বছরের কাছাকাছি। আশা করছি, সামনের দিনগুলোতে বিক্রি আরও বাড়বে।’

ফ্রিজের বিক্রি মন্দ হয়নি

কোরবানির ঈদ কেন্দ্র সব সময় রেফ্রিজারেটর ও ডিপ ফ্রিজের চাহিদা বাড়ে। তবে এবার করোনার কারণে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকেই ডিপ ফ্রিজের চাহিদা বেড়ে যায়।
ফ্রিজের বাজারে দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটনের হিস্যা ৭০ শতাংশের বেশি। গত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১০ লাখ ফ্রিজ বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও তা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে কিছুটা কম। শুধু ফ্রিজ নয়, ওয়ালটনের টেলিভিশন ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র (এসি) বিক্রিও খারাপ না। গত ছয় মাসে ২ লাখ টেলিভিশন ও ৪২ হাজার এসি বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ঈদুল ফিতর ও আজহায় প্রচুর ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রি হয়। তবে করোনার কারণে চলতি বছর সেই পরিস্থিতি নেই। তবে আশার কথা, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত জুলাই থেকে বিক্রি বাড়ছে।
গোলাম মুর্শেদ, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের অতিরিক্ত এএমডি

জানতে চাইলে ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) গোলাম মুর্শেদ বলেন, ‘ঈদুল ফিতর ও আজহায় প্রচুর ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রি হয়। তবে করোনার কারণে চলতি বছর সেই পরিস্থিতি নেই। তবে আশার কথা, পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গত জুলাই থেকে বিক্রি বাড়ছে। আশা করছি, আগের বছরগুলোর মতো না হলেও চলতি বছর খুব একটা খারাপ যাবে না।’

গোলাম মুর্শেদ আরও বলেন, করোনাকালে ওয়ালটনের অনলাইন বিক্রিতে অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রপ্তানি আদেশও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে আগস্টে বিশ্ববাজার থেকে টেলিভিশনসহ অন্যান্য পণ্যের যে পরিমাণ রপ্তানি আদেশ এসেছিল, তার তুলনায় চলতি বছর ১০ গুণ বেশি আদেশ এসেছে।

বিজ্ঞাপন

এসির বিক্রি বাড়ছে

শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির মধ্যে করোনাভাইরাস বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে—এমন ধারণার কারণে পণ্যটি কিনতে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায় মানুষ। তাতে মার্চ-এপ্রিলে এসি বিক্রি ব্যাপকভাবে কমে যায়। তবে ধীরে ধীরে পণ্যটির বিক্রি আবার বাড়ছে। ট্রান্সকম ইলেকট্রনিকসের সৈকত আজাদ বলেন, মার্চ-এপ্রিল এসি বিক্রির ভরা মৌসুম। করোনায় সেটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জুলাই থেকে এসির চাহিদা আবার একটু একটু করে বাড়ছে।

হতাশ করেনি টিভি

সনি ব্র্যান্ডের সামগ্রী বিক্রি করে র‌্যাংগস ইলেকট্রনিকস (সনি-র‌্যাংগস)। প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক জানে আলম বলেন, ‘মাসে সাধারণত ৭-১০ হাজার সনি টিভি বিক্রি হয়। কিন্তু সর্বশেষ ঈদুল আজহায় ১০ হাজারের বেশি সনি টিভি বিক্রি হয়েছে। করোনার শুরুর প্রথম তিন মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ওয়াশিং মেশিন। সারা বছর আমাদের এ পণ্যটি যে পরিমাণ বিক্রি হয়, তার ৫০ শতাংশই করোনার শুরুতে দেড় থেকে দুই মাসে বিক্রি হয়ে গেছে। বর্তমানে আমাদের স্টকে ওয়াশিং মেশিন নেই।’

দেশীয় ব্র্যান্ড মিনিস্টার ও মাইওয়ান করোনাকালেও অনলাইনে টেলিভিশন, রাইসকুকার, ইলেকট্রিক কেটলি ও এসি বিক্রি করেছে।

জানতে চাইলে মিনিস্টারের হেড অব ব্র্যান্ড অ্যান্ড মিডিয়া সোহেল কিবরিয়া বলেন, ‘করোনা ভয় কাটিয়ে মানুষ বাড়ির বাইরে বের হয়েছে। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরছে। তাতে আমাদের পণ্য বিক্রিও বাড়ছে।’

মন্তব্য করুন