default-image

সরকারি টাকা খরচে কর্মকর্তাদের যতটা আগ্রহ, বিদেশি ঋণের টাকা খরচে ততটাই অনাগ্রহ। উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত ঋণ খরচ হচ্ছে কচ্ছপ গতিতে। তাই তো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার এখনো অলস পড়ে আছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই অর্থ বাংলাদেশের চলতি ২০২০–২১ অর্থবছরের বাজেটের তিন–চতুর্থাংশের মতো। সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সরকারি তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা এবং চীন–ভারতের মতো দ্বিপক্ষীয় অংশীদারদের সঙ্গে প্রতিবছর যে হারে ঋণচুক্তি সই হয়, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টাকা খরচ করতে পারে না বাংলাদেশ। সে জন্য প্রতিবছর উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত ঋণের বড় অংশই ‘পাইপলাইনে’ যোগ হয় অর্থাৎ অব্যবহৃত থেকে যায়।

এ অবস্থায় আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বিদেশি ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৮৯ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন
আমাদের দেশে একটি প্রকল্প অনুমোদনের পর তা শুরু হতেই দু–তিন বছর লেগে যায়। তাহলে টাকা খরচ হবে কীভাবে?
আরাস্তু খান, সাবেক সচিব

ইআরডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, এখন পর্যন্ত উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুত যে পরিমাণ ঋণ পাইপলাইনে জমা হয়ে আছে, তা কমিয়ে আনতে প্রতিবছর ১ হাজার কোটি থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার খরচ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলারের বিদেশি ঋণ খরচ করতে পারছে। বাকি অর্থ পাইপলাইনে অলস পড়ে থাকছে। তাই বৈদেশিক ঋণের প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। কর্মকর্তারা আরও বলেন, খরচ করতে না পারলেও বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ কিন্তু বাড়ছে। এ জন্য প্রতিবছর বাজেটে বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে।

মন্ত্রণালয়গুলো কেন কাঙ্ক্ষিত হারে বৈদেশিক ঋণ ব্যবহার করতে পারে না, তা জানতে চাইলে সাবেক সচিব আরাস্তু খান বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবই মূল কারণ। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে একটি প্রকল্প অনুমোদনের পর তা শুরু হতেই দু–তিন বছর লেগে যায়। তাহলে টাকা খরচ হবে কীভাবে?’ আরাস্তু খান প্রথম আলোকে আরও বলেন, উন্নয়ন সহযোগীদের টাকা খরচ করা কঠিন। সে ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হয়। টাকা কোথায় খরচ হলো, কীভাবে খরচ হলো—এসব দেখাশোনার পরই কেবল তারা টাকা ছাড় করে। সরকারি টাকা খরচে ততটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে না। সহজভাবেই টাকা হাতে পাওয়া যায়। তাই বৈদেশিক ঋণ অব্যবহৃত থেকে যায়।

প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ ঠিকমতো খরচ না হওয়ার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত বিদ্যমান ১৯০ কিলোমিটার সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। ১২ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে এডিবির দেওয়ার কথা সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির এখন পর্যন্ত অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, জমি অধিগ্রহণে জটিলতার কারণে অগ্রগতি হচ্ছে না।

এদিকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, সরকারি টাকার তুলনায় উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ খরচের প্রবণতা কম। চলতি ২০২০–২১ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় জুলাই থেকে মার্চ—৯ মাসে সরকারি টাকা খরচ হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ থেকে খরচ হয়েছে সাড়ে ২৯ হাজার কোটি টাকা।

উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সরকার প্রতিবছর কতটি ঋণচুক্তি সই করছে, আর কী পরিমাণ অর্থ ছাড় হচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে ইআরডির প্রতিবেদনে। তাতে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মোট ৭০৫ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়েছে। ওই বছরে ছাড় হয়েছে ৩৫৬ কোটি ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ হাজার ৭৯৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়। সেই বছর ৩৬২ কোটি ডলার ছাড় হয়। ২০১৭–১৮ অর্থবছর ঋণচুক্তি হয়েছে ১ হাজার ৪৮৯ ডলারের, অর্থ ছাড় হয়েছে ৬৩৬ কোটি ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ঋণচুক্তি সই হয় ৯৯১ কোটি ডলারের, আর ছাড় হয় ৬২৬ কোটি ডলার।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ইআরডির একাধিক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড় করতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। তাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করা হচ্ছে। এমনকি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকও হচ্ছে। ইআরডি নিজেই বড় প্রকল্পগুলোতে নজরদারি করছে। এতে ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটছে। তবে যতটা উন্নতি হওয়া দরকার, ততটা হচ্ছে না। কর্মকর্তারা আরও বলেন, গত পাঁচ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঋণচুক্তি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
বাণিজ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন